মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পাটকাঠি নয় হীরার কাঠি

পাট এক সময় সোনালি আঁশ বলে খ্যাত ছিল। এ পাট বিদেশে রফতানি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতো আমাদের দেশ। কিন্তু পাটের সেই জৌলুস অনেকটাই এখন ম্লান হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক বা সিনথেটিকের দৌরাত্ম্যে পাট প্রায় মৃয়মান বলা যায়। তবে বিদেশে পাট এখনও মর্যাদার আসন দখল করে আছে। পলিথিনের ব্যবহার সীমিত হবার কারণে পাট ও পাটজাত পণ্য তথা ব্যাগ, বস্তা প্রভৃতির কদর কিছুটা বেড়েছে। বিশেষত ধান, চাল, গম, কলাই বা ডাল, ভুট্টা প্রভৃতি খাদ্যপণ্য সংরক্ষণে পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক করায় বেড়েছে এর গুরুত্ব। প্রকৃতপক্ষে পাট এমন একটি তন্তু যা পরিবেশবান্ধব এবং পচনশীল। মাটির সঙ্গে মিশে এটি মাটি বা পরিবেশে কোনও ক্ষতি তো করেই না, বরং মাটি এবং পরিবেশকে জীবনের জন্য আরও সহায়ক করে তোলে। পক্ষান্তরে পাটের পরিবর্তে পলিথিন, প্লাস্টিক বা সিনথেটিক ব্যবহার করলে পরিবেশ যেমন বিরূপ হয়ে পড়ে, তেমনই তা মানুষ এবং অন্য সকল জীবের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিজ্ঞানীরা পরিবেশ ও জীবনের স্বার্থে কৃত্রিম তন্তু, পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছিলেন এবং পাটের মতো প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে এর প্রতি সকলের সুদৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। সুখের বিষয় হচ্ছে যে, সিনথেটিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ পরিবেশ বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে কৃত্রিম তন্তু তথা সিনথেটিকের ব্যবহার কমিয়ে পাট, তুলা প্রভৃতির ব্যবহার বাড়াতে জোর দিয়ে আসছিলেন। বিশ্বের অনেক দেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আহ্বানের প্রতি পুরোপুরি সাড়া দিতে সক্ষম না হলেও বাংলাদেশসহ বহু দেশই প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সায় দিয়ে এগিয়ে এসেছে। এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
পাটের উপজাত হচ্ছে পাটখড়ি বা পাটকাঠি। এটি এদেশের গ্রামে গ্রামে গুরুত্বহীনভাবে পড়ে থেকেছে। রান্নাবান্নার কাজ ছাড়া এর ব্যবহার তেমন হতো না। তাও শুধু পাটখড়ি দিয়ে চুলো জ্বালানো যেত না। বাঁশ, ধানের তুষ, কাঠখড় না হলে তেমন সুবিধা করতে পারতেন না গৃহিণীরা। তাই অনেকটা অবহেলায় পাটখড়ি বিনষ্ট হয়ে যেত পুকুর বা ঝিলের পাড়ে। তবে পাটখড়ির সেদিন আর নেই। এখন এ পাটখড়ি সোনার দামেই বিক্রি হচ্ছে। বলা যায়, এই পাটখড়ি বা কাঠিই সোনালি আঁশ পাটের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে চমক সৃষ্টি করেছে ইতোমধ্যে। বিশেষ চুল্লিতে পাটখড়ি পুড়িয়ে প্রস্তুত হচ্ছে কার্বন বা চারকোল। এ কার্বন বিদেশে রফতানি হচ্ছে। কার্বন পাউডার বা চারকোল কিনে নিচ্ছে চীনসহ কয়েকটি দেশ। তারা পাটখড়ির কার্বন থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতসবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধনপণ্য, মোবাইলের ব্যাটারি, দাঁতমাজার ওষুধ, ক্ষেতের সারসহ বহু রকমের পণ্য তৈরি করছে। শুধু চীন নয়, পাটকাঠির কার্বনের চাহিদা তৈরি হয়েছে মেক্সিকো, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল, তাইওয়ান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতেও। ইউরোপে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্লান্টেও রয়েছে পাটখড়ি কার্বনের ব্যাপক ব্যবহার। তাই আমাদের দেশে পাটখড়ি থেকে চারকোল বানাবার কারখানার চাহিদা বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ২৫টির মতো কারখানা গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাটখড়ির কার্বন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। এই চারকোল দেশের রফতানি বাণিজ্যে আশুসম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে চলেছে। উল্লেখ্য, বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি ১০/১২ ঘণ্টা জ্বালানোর পর চুল্লির মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়, যাতে ভেতরে অক্সিজেন না প্রবেশ করে। এভাবে ৪ দিন রেখে তা ক্রাসিং করে প্যাকেটজাত করবার পর রফতানি করা হয়। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১ জানুয়ারি ২০১৭।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো জানায়, গত ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে পাটখড়ির চারকোল রফতানি করে ৫৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে। বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির মতে, এ খাতে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকা। শিগগিরই তা বেড়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। পাট অধিদফতর জানায়, দেশে বছরে পাটখড়ি উৎপন্ন হয় ৩০ লাখ টন। এর অর্ধেকও যদি কার্বন তৈরি করা যায়, তাহলে দেশে বছরে উৎপাদন দাঁড়াবে ২ লাখ ৫০ হাজার টন। এ খাতে বছরে রফতানি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে ৩২ কোটি ২৫ লাখ ডলারের। আর সরকার এ খাতে রাজস্ব পাবে ৪০ কোটি টাকার মতো। অন্যদিকে এ খাতে কর্মসংস্থান হবে প্রত্যক্ষভাবে ২০ হাজার ও পরোক্ষভাবে ২০ লাখ মানুষের। কাজেই পাটের চেয়ে পাটখড়ি কম কীসে? ঐ যে কথায় বলে না, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো মানিকরতন।’ পাটখড়ি শুধু খড়ি বা লাকড়ি নয়। এর দাম অনেক। এর ছাই বা চারকোল বিদেশে কালোহীরক হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। পাটখড়ির ছাই শুধু ছাই নয়। হীরার পাউডার। এ হীরকচূর্ণের খবর আমাদের ক’জনেরইবা জানা, বলুন? পাটের ফেলনা  উপজাত পাটখড়ি আর ফেলে দেবেন না। অযথা চুলোয় পুড়িয়ে ধ্বংস করবেন না। এমনকি ফেলনা দামেও কাউকে দেবেন না। এর মূল্য অনেক। পাটের চেয়েও অধিক মূল্যে এখন পাটখড়ি বিক্রির দিন এসে গেছে। প্রয়োজনে চারকোল কারখানার লোকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অধিক মূল্যে পাটকাঠি কিনবে। এ পাটকাঠি এখন ফেলনা নয়। খেলনাও নয়। মনে রাখবেন, পাঠকাঠি এখন হীরার কাঠি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ