বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রমীলা ফুটবলে আলোকিত নাম সাবিনা

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : বাংলাদেশের পুরুষ ফুটবলে এখন আর আগের সেই দিন নেই। যা কিছু আলো তার সবই এখন মহিলা ফুটবলকে ঘিরে রয়েছে। সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। শিলিগুড়িতে ফাইনালে ভারতের কাছে ১-৩ গোলে হেরে যায়। প্রথমার্ধে ম্যাচ ১-১ ড্র ছিল। দ্বিতীয়ার্ধে ভারত ২ গোলে জিতে যায়। আগের তিন আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। ফাইনালে তারা নিঃসন্দেহে ফেবারিট ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের হারের পেছনে রেফারির ভূমিকাও ছিল তা বললে ভুল হবে না। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের বিপক্ষে যে পেনাল্টি ছিল তা কোনো ভাবে বৈধ নয়। ডি-বক্সের ভিতর নার্গিস স্বাভাবিক ট্র্যাকেল করলেও ভুটানের রেফারি পেনাল্টি ধরেন। স্পট কিকের গোলে পিছিয়ে যাওয়ার পরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সাবিনা ও স্বপ্নারা। পড়ে ভারত আরও একটি গোল করে টানা চতুর্থ বারের মতো শিরোপা নিশ্চিত করে। আগের তিন আসরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ছিল দুই বার সেমিফাইনাল খেলা। এবার প্রথম বারের মতো ফাইনালে উঠে রানার্সআপ। প্রাপ্তি কম নয়, পুরুষরা যেখানে সাফে সেমিতেই উঠতে পারছে না, সেখানে মেয়েরা রানার্স আপ। বলা যায় ফুটবলে আগ্রহটা আছে তাদের ঘিরেই। সাফে রানার্সআপ বাংলাদেশের মেয়েরা ট্রফিসহ বাফুফে সভাপতি ও সাফ চেয়ারম্যান কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাফুফে সভাপতি সাবিনাদের উদ্দেশ্য বলেন, ‘তোমাদের পারফরম্যান্সে আমি খুশি। তবে আরও ভালো খেলতে হবে। মানোন্নয়নে বাফুফে তোমাদের সব রকম সহযোগিতা করবে। আমি আশা করব সাফে ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েরা সেরা দলে পরিণত হবে। বাফুফের চিন্তা আছে শক্তিশালী দেশগুলোর বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের আয়োজন করা। চার বছরের ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছে। এই কর্মসূচিতে মহিলা ফুটবল মানোন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি রয়েছে।’ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা ফুটবলের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সাবিনা খাতুন। বাংলাদেশের নারী ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এই নাম। দেশের প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে বিদেশের কোনো ক্লাবের হয়ে খেলতে গিয়ে আগেই ইতিহাস গড়েছেন তিনি। আর এখন ফুটবল বিশ্বে বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলকে নিয়ে যাচ্ছেন এক অনন্য উচ্চতায়। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক সাবিনা খাতুন প্রতিটি ম্যাচেই উদ্ভাসিত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে প্রতি পক্ষের জালে বল পাঠাচ্ছেন অসংখ্যবার। ঘরোয়া ফুটবল মানে সাবিনার গোল উৎসব। ইতিহাস সৃষ্টি করে বাংলাদেশের প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে বিদেশের কোনো ক্লাবে খেলতে গিয়েছিলেন জাতীয় প্রমীলা দলের এই ফুটবলার। মালদ্বীপস উইমেন্স ফুটসাল ফিয়েস্তা’নামের এই টুর্নামেন্টে রেকর্ড সংখ্যক গোল করেছেন সাবিনা। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৩৭ গোল করেছেন তিনি। টুর্নামেন্টে তার দলের ৬ ম্যাচের সবগুলোতেই ‘কুইন অব দ্য ম্যাচ’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন দেশসেরা এই নারী ফুটবলার। তবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারতেন না সাবিনা খাতুন। সেই আক্ষেপ ঘোচানের মঞ্চ হিসেবে ভারতের শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের সব থেকে বড় টুর্নামেন্টে আগফানিস্তানের জালে গুনে গুনে পাঁচটি গোল করেছিলেন বাংলাদেশের গোল মেশিনখ্যাত এই প্রমীলা স্ট্রাইকার। প্রতি ম্যাচেই তার পা থেকে এসেছে গোলের ফুলঝুরি। দাপটের সঙ্গে তার দলও উঠে যায় ফাইনালে। কিন্তু শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে পারলেন না সাবিনা খাতুন। স্বাগতিক ভারতের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় বাংলাদেশী এই প্রমীলা ফুটবলারের। সাতক্ষীরার মেয়ে সাবিনার অর্জন শুধু মালদ্বীপ পুলিশ দলের হয়ে ফুটসাল খেলতে যাওয়াই নয়। বরং অনেক কিছু প্রমালেরও। একজন বাঙালী নারীর ফুটবল হয়ে ওঠার যেমন তেমনি বাঁধ ভেঙে সেই নারীর ভিনদেশীদের মন জয় করারও। অথচ এক সময় বাংলাদেশের এই মেয়েদেরই ঘর থেকে বেরুনোর অনুমতি ছিল না। মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা শুরুর পরও এই সাবিনার পূর্বসূরিদের ওপরই পড়েছে খড়গ। মিছিল, প্রতিবাদ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। হুমকি এসেছে ‘কতল’-এরও! বাংলাদেশী মুসলিম ঘরের মেয়ে হয়ে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা? এই নারীদের জন্য তাই মাঠ ছিলো নিষিদ্ধ। সেই সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে সাবিনা খাতুন। যুদ্ধে জয় নিয়ে দোর্দন্ত প্রতাপে মাঠ কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন সাবিনা। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই এশিয়ান পর্যায়েও দেখিয়েছেন, প্রমাণ করেছেন নিজের সক্ষমতার। পুরুষের পাশাপাশি প্রমীলারাও যে ক্রীড়াজগতে নিজেদের নাম তৈরি করেছেন, সেটা এখন প্রমানিত। ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর সাতক্ষীরা জেলা সদরের পলাশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সাবিনা খাতুন। তার পিতা মো: সৈয়দ গাজী ও মা মমতাজ বেগম। সাবিনা তাদের চতুর্থ সন্তান। ২০০৯ সালে অস্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে ফুটবলের সাথে সাবিনার সম্পর্ক। সাতক্ষীরা জেলা ফুটবল কোচ আকবরের মাধ্যমেই ফুটবলের হাতেখড়ি হয় তার। স্কুলপর্যায়ে, আন্তঃস্কুল ও আন্তঃজেলা পর্যায়েও। সেখানে ভাল খেলার সুবাদে ডাক পেয়ে যান জাতীয় দলে। ২০০৯ সালে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে সাবিনার। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বর্তমানে জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। সাতক্ষীরার এই তরুণী ২০১৩ সালে ফিফা উইমেন্স কোচিং কোর্স ও একই বছর এএফসি ‘সি’ সার্টিফিকেট কোর্স করেছেন। সাবিনার শখ ভ্রমণ করা। দেশি ফুটবলারদের মধ্যে তার আদর্শ বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ও গোলরক্ষক আমিনুল হক। আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার আদর্শের স্থানটি দখল করে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি ও ব্রাজিলের খ্যাতিমান নারী ফুটবলার মার্তা ডা সিলভা।
ছোটবেলায় পাড়ার মোড়ে অথবা গ্রামের মাঠে ক্রিকেট খেলার সময় আঙুলের কড়ে গুনে রানের হিসেব রাখতে হিমশিম খেতে হয়েছে কম-বেশি সবাইকে। ক্রিকেট মাঠে স্কোরারকে তাই পুরোটা সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে ফুটবলে এতশত হিসেব রাখার বালাই প্রায় নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে ‘প্রায়’ শব্দটা ব্যবহার করতে হলো কারণ মাঠে যদি থাকেন সাবিনা খাতুনের মতো একজন, তবে গোলের হিসেব রাখতে গিয়ে স্কোরার কিংবা সাধারণ দর্শক হাঁপিয়ে উঠবেন বলা চলে। প্রত্যেক ম্যাচে চার-পাঁচ গোল করাকে নিতান্তই সাধারণ (!) বানিয়ে ফেলেছেন বাংলাদেশের গোলমেশিন সাবিনা খাতুন। সাবিনা খাতুন সম্পর্কে প্রথমেই বলতে হয় তার অবিশ্বাস্য গোল করার ক্ষমতা। এক ম্যাচে হ্যাটট্রিক, কিংবা বড়জোর পাঁচ গোল যেখানে অসাধারণ বলা যায় হয় সেখানে ১৬ গোল করার কৃতিত্ব আছে এই ফরোয়ার্ডের। এইতো সেদিন আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাফ উইমেন’স চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একাই করেছেন পাঁচ গোল। ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতোমধ্যে দু’শতাধিকেরও বেশি গোল করা এই ফুটবলার প্রতি ম্যাচে গড়ে দুই থেকে তিনটি করে গোল করেন। সাতক্ষীরার মেয়ে সাবিনার শুরুটা ২০০৯ সালে। সিটিসেল জাতীয় মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর ধারবাহিকভাবে খেলেছেন ঢাকা মহানগর মহিলা ফুটবল লিগে; কেএফসি জাতীয় মহিলা ফুটবলে হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়। ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ ঘরোয়া ফুটবলের শতাধিক গোল করেন সাবিনা, হয়ে যান জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৪ সালে পাকিস্তানে মহিলা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপের বিপক্ষে জয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’গোল করেন সাবিনা। এর মাধ্যমেই মালদ্বীপ ফুটবল কর্তাদের নজরে আসেন তিনি। এরপর দেশের প্রথম প্রমীলা ফুটবলার হিসেবে দেশের বাইরের লিগে খেলার সুযোগ পান সাবিনা। এর আগে কাজি সালাউদ্দিন, কায়সার হামিদ, প্রয়াত মোনেম মুন্না এবং মামুনুল দেশের বাইরে খেলার ডাক পেলেও নারী হিসেবে সাবিনাই প্রথম। তবে প্রথমবারেই বিদেশী লিগে খেলতে গিয়ে সাবিনা যে কৃতিত্ব করেছেন তা বোধহয় রূপকথাকেও হার মানায়। মালদ্বীপে পুলিশ ক্লাবের পক্ষে অভিষেকেই করেছেন চার গোল, পরের ম্যাচে একাই করেছেন ১৬ গোল (৫টি হ্যাটট্রিক!)। এর আগে ঢাকার মাঠে একবার এক ম্যাচে ১৪ গোলের রেকর্ড ছিল এই স্ট্রাইকারের। মালদ্বীপে মোট ছয় ম্যাচে সাবিনা গোল করেছিলেন ৩৭টি এবং এর পাঁচটিতেই ছিলেন ম্যাচসেরা। ঢাকা মোহামেডানসহ ক্লাব পর্যায়ে একের পর এক বিস্ময় উপহার দেয়া এই ফরোয়ার্ড জাতীয় পর্যায়েও সমান উজ্জ্বল। চলতি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচে পাঁচ গোল করেছেন, দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের বিপক্ষেও দলের মূল ভরসার নাম সাবিনা খাতুন।
এসএ গেমস, অলিম্পিক প্রি কোয়ালিফাইং কিংবা এএফসি ওমেন্স এশিয়ান কাপ ২০১৪ বাছাইপর্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচে বরাবরই গোল করেছেন তিনি, অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং নেতৃত্বগুণের কারণে বর্তমান বাংলাদেশ প্রমীলা ফুটবল দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাকে নিয়ে এখন চলছে টানা-টানি। মালদ্বীপে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেবার পর এবার এই গোলকণ্যার দিকে চোখ পড়েছে দুবাইয়ের ক্লাব রোজানিও। ক্লাবটি তাদের আগ্রহের কথা জানিয়ে সাবিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং সাবিনা বিষয়টি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সাবিনা জানান, ‘আমার সঙ্গে দুবাইয়ের একটি ক্লাব যোগাযোগ করেছে। তবে এখানে কিছু শর্ত আছে। আমি পুরো বিষয়টি বাফুফে মহিলা কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। এর আগে কিরণ আপাই আমাকে মালদ্বীপে খেলার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন’।
 ফেব্রুয়ারিতে শুরু হবে দুবাইয়ের ফুটবল টুর্নামেন্টটি। রোজানিও ক্লাবে ইতোমধ্যে পাকিস্তানের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক মাফারাসহ পাঁচ পাকিস্তানি ফুটবলার যোগ দিয়েছেন। ২০১৫ সালে এক এসি মিলান সমর্থক ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায় রোজানিও ক্লাবের সঙ্গে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানের একটি চুক্তি আছে। এখন সময়ই বলে দেবে, সাবিনা আর কতদূর যাবেন।
তবে তার আগে সাবিনার কীর্তিকে নিজের সঙ্গে তুলনা দিলেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। সম্প্রতি সাফজয়ীদের ওয়ালটনের সংবর্ধনা নিতে যখন মঞ্চে উঠে এলেন সাবিনা, পাশে দাঁড়িয়ে সাবিনাকে স্তুতিতে ভাসালেন বাংলাদেশ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি সালাউদ্দিন। বললেন, ‘আমি আর সাবিনা একটা জয়গায় সবচেয়ে উপরে। বাংলাদেশী ফুটবলার হিসেবে কেবল আমরা দু’জনেই বিদেশী লিগে খেলে এসেছি।’ ব্রাজিলের তারকা মার্তাকে আদর্শ মানেন সাবিনা। ‘স্কার্ট পরা পেলে’ হিসেবে পরিচিত মার্তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একটি দেশের নারী ফুটবলের সমার্থক হয়ে গেছেন সাবিনা। ফুটবল ভক্তদের কাছে ‘বাংলার মেসি কন্যা’ নামে পরিচিত এই ফুটবলার নৈপুণ্য দিয়েই তার এই নামটি সার্থক করে তুলছেন। তার পরও মাটিতেই পা রাখছেন সাবিনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ