বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আলোয় আলোকিত ফুটবল

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ২০১৬ সালের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানা রোনালদো। ব্যালন ডি’অর জেতার পর এবার তিনি জিতলেন ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও। এখানেই মিলমেলা হয়েছিল ফুটবলার থেকে শুরু করে কোচ কর্মকর্তাদের। বছরের খুব বেশি সময় এই সুযোগ আসে না- একই ছাদের নিচে বর্তমান আর অতীতের বিশ্বসেরা সব ফুটবল তারকাদের সমাগম। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ছিল তেমনি একটা দিন। আকাশ থেকে যেন সেদিন একঝাঁক তারা নেমে এসেছিল ‘দ্য বেস্ট ফিফা অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে। যে তারার আলোচ্ছটায় রেডিয়াম আর লেজারের কৃত্রিম আলোও যেন হয়ে গিয়েছিল ম্লøান। কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা, লুইস ফিগো, জিদেদিন জিদান, রবার্তো কার্লোস, কাফু থেকে শুরু করে বর্তমানের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, সার্জিও রামোস, টনি ক্রুস অঁতোয়ান গ্রিজম্যান কে ছিলেন না সেই জমকালো অনুষ্ঠানে। আর এমন অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে ছিলেন কেবল একজন-ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। যে অনুষ্ঠানে বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব ‘দ্য বেস্ট’ ট্রফিটি পর্তুগিজ তারকার হাতে তুলে দেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এরপরও এত তারার ভিড়ে একটা অভাব ঠিকই ছিল। যে কারণে সুরটাও যেন ঠিক মিলছিল না, কেটে কেটে যাচ্ছিল। বছরের সেরা খেলোয়াড়কে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে অথচ সেখানে ছিলেন না লিওনেল মেসি! আরো একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আসলে শুধু মেসি নয়, অনুষ্ঠানে ছিলেন না লুইস সুয়ারেজ, নেইমার, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাসহ বার্সেলোনার কেউই। এর পরের দিনই ছিল বার্সার কোপা দেলরের মহাগুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় লেগের ম্যাচ। প্রথম লেগে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের মাঠ থেকে হেরে আসাই ম্যাচের আগের দিন খেলোয়াড়রা এত লম্বা ভ্রমণের ঝক্কি নিতে চাননি। অন্যদের মত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর এই অনুপস্থিতি পিড়া দেয় রোনালদোকেও। চতুর্থ বর্ষসেরা খেতাব জয়ের এই আনন্দ নিজের শুভানুধ্যায়ীদের সাথে ভাগ করে নেয়ার পর তাই প্রিয় প্রতিপক্ষকে স্মরণ করেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। বলেন, লিওনেল মেসি এখানে থাকলে তার ভালো লাগত, ভালো লাগত বার্সেলোনার অন্য খেলোয়াড়রা থাকলেও। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড পেয়ার অব দ্য ইয়ার’ নামে বর্ষসেরা ফুটবলারকে পুরস্কার দিয়ে আসছিল ফিফা। ২০১০ সালে ফরাসি দৈনিক ফ্রেঞ্চ ফুটবল-এর সাথে একীভূত হয়ে টানা ৫ বছর এই পুরস্কার দেয়া হয় ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’ নামে। চলতি বছর আবারো পৃথকভাবে বিশ্বসেরা ফুটবলারকে ভূষিত করার সীদ্ধান্ত নেয় ফরাসি ম্যাগাজিনটি। তারই ফলশ্রুতিতে চলতি বছর থেকে আবারো স্বতন্ত্রভাবে বর্ষসেরা ফুটবলারকে পুরস্কৃত করে বিশ্ব ফুটবলের কর্তাসংস্থা ফিফা। বছরজুড়ে গোল সংখ্যায় বাকি দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেক এগিয়ে লিওনেল মেসি। ক্লাবের হয়ে জিতেছেন লা লিগা শিরোপা। জাতীয় দলকে কোপা আমেরিকার ফাইনালে নিয়ে গেছেন বলতে গেলে একক প্রচেষ্টায়। কিন্তু বছরজুড়ে ফুটবল মাঠে আলো ছড়ালেও চূড়ান্ত ব্যর্থদের কে মনে রাখে! ফাইনালে চিলির কাছে সেই ভাগ্যপ্রসূত হার না হলে এবারের ব্যালন ডি’অর কাব্যটাও হয়তো ভিন্নভাবে লেখা হত! কিন্তু হয়নি। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও তাই ক্লাবের হয়ে এগারোতম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা ও জাতীয় দলের প্রথম ইউরো জয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়াই লড়াইয়ে এগিয়ে রোনালদোই। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এবারের ব্যালন ডি’অর খেতাব জিতেছেন রিয়াল মাদ্রিদের পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এ খবর সকলেরই জানা। সব মিলে চতুর্থবারের মত এই খেতাবে ভূষিত হন ৩১ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। পাঁচবার এই পুরস্কার জিতেছেন আর্জেন্টাইন তারকা মেসি। গেল পাঁচ বছর তারাই হয়েছেন লড়াইয়ে প্রথম ও দ্বিতীয়। এবারো লড়াইটা হলো সময়ের সেরা দুই খেলোয়াড়ের মধ্যেই। ফরাসি স্ট্রাইকার গ্রিজম্যানও তিনজনের তালিকার জায়গা করে নেন নিজের যোগ্যতা বলেই। ইউরো ২০১৬’র সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। দল আসরের ফাইনালে ওঠে তার বদৌলতেই। এছাড়া ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়েও বছরজুড়ে ছিলেন উজ্জ্বল। ক্লাবকে ইউরোপ সেরার লড়াইয়ের ফাইনালেও তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু ইউরোর মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালেও গ্রিজম্যানকে হারতে হয় রোনালদোর কাছে। অনুমিতভাবেই তাই সেরার মুকুট ওঠে রোনালদোর মাথায়। মোট ৩৪.৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি। মেসিও খুব বেশি পিছিয়ে ছিলেন না। রেকর্ড ৫ বারের বর্ষসেরা পান ২৬.৪২ শতাংশ ভোট। তৃতীয় স্থানে থাকা গ্রিজম্যান অবশ্য ছিলেন অনেক পিছিয়ে। ফরাসি স্ট্রাইকার পান মাত্র ৭.৫৩ শতাংশ ভোট। বর্ষসেরা নারী খেলোয়াড় নির্বাচিত হন যুক্তরাষ্ট্রের কার্লি লয়েড। টানা দ্বিতীয় এই খেতাব জয়ের পথে জার্মান মিডফিল্ডার মেলানি বেহরিনগের ও ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মার্তাকে হারান তিনি। এ নিয়ে গত ১৩ বছরে রেকর্ড ১২তম বারের মত তিন জনের এই তালিকায় জায়গা করে নেন মার্তা। এর মধ্যে পাঁচবারের বিজয়ী এই ফরোয়ার্ড। গেল অলিম্পিকে ব্রাজিলের ব্রোঞ্চজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। বর্তমান বিজয়ী লয়েড জাতীয় দলের হয়ে গেল বছর গোল করেন ১৭টি। একই অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয় বর্ষসেরা কোচের নামও। রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপ জেতানো জিনেদিন জিদান এবং পর্তুগালকে ইউরো জেতানো ফার্নান্ডো সান্তোসকে হারিয়ে ‘দ্য বেস্ট ফিফা ফুটবল কোচ’ খেতাব জিতে নেন ক্লাদিও রেনিয়েরি। ২০১৪/১৫ মৌসুমে কোনোরকম অবনমন এড়ানো দল লেস্টার সিটিকে রিতিমত স্বপ্ন এনে দেন হাতের মুঠোয়। তার অধীনেই ‘দ্য ফক্স’ খ্যাত দলটি  নিজেদের ইতিহাসে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতে। চলতি মৌসুমটা অবশ্য খুব ভালো যাচ্ছে না তাদের, তবে প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সুযোগ পেয়ে দুর্দান্ত খেলেই তারা উঠে গেছে আসরের শেষ ষোলয়। নারী বিভাগে এই পুরস্কারটি যায় জার্মানিকে প্রথমবারের মত অলিম্পিক স্বর্ণ এনে দেয়া সিলভিয়া নেইদের দখলে। অনুষ্ঠানে চমক জাগানোর মত বিষয় ছিল আরো একটি- বর্ষসেরা গোল, যাকে ডাকা হয় পুসকাস পুরস্কার নামে। এক্ষেত্রেও সবার মনে লিওনেল মেসির কথায় হয়তো মনে আসবে। একের পর এক চোখ ধাঁধানো অবিশ্বাস্য সব গোল আসে তো রেকর্ড ৫ বারের বর্ষসেরার পা থেকেই। কিন্তু না, তিনি নন। স্প্যানিশ লিগে গোলের রেকর্ড করা লুইস সুয়ারেজ কিংবা রোনালদে, নেইমার অথবা বছরজুড়ে গোলের ফুলঝুরি ছিটানো রবার্ট লেভান্দেভস্কিও নন যার পা থেকে এসেছে ১০১৬ সালের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন গোল। অবাক করা সেই গোলটি ছিল মালায়েশিয়ার মোহাম্মাদ ফাইজ সুবরির। ডি বক্সের বাঁ প্রান্তের প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে সুবরি শট নিয়েছিলেন প্রথম বারে, গোলরক্ষকও সেই লাইনেই এগুচ্ছিলেন। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে বল বাতাসে সুইং করে দ্বিতীয় বারে লেগে জালে জড়াই। এমন এক অনুষ্ঠানে ছিলেন না মেসিরা। তার এমন আচরণে খুশি হতে পারেননি ডিয়েগো ম্যারাডোনা। গ্রিজম্যানও হয়তো হয়েছিলেন আশাহত। পুরস্কার তার হাতে উঠছে না এটা তিনিও জানতেন, তবে ফরাসি স্ট্রাইকারের ইচ্ছা ছিল সময়ের সেরা দুই খেলোয়াড়ের সাথে এক কাতারে দাঁড়ানো, একসাথে নাস্তার টেবিলে বসা। ওদিকে নিজেদের বাঁচা-মরার ম্যাচ থাকলেও তাই এদিন মেসির থাকাটাই সমীচীন ছিল। মাঠের লড়াই ভুলে এভাবে এক টেবিলে বসার ক্ষণ তো আর সবসময় আসে না।
বর্ষসেরা একাদশ (২০১৬)
গোলরক্ষক: ম্যানুয়েল নয়্যর।
ডিফেন্ডার: মার্সেলো, সার্জিও রামোস, দানি আলভেস, জেরার্ড পিকে।
মিডফিল্ডার: টনি ক্রুস, লুকা মড্রিচ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা।
ফরোয়ার্ড: লুইস সুয়ারেজ, লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
ফিফা বর্ষসেরা ২০১৬ বিজয়ীরা-
পুরুষ খেলোয়াড়: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল/রিয়াল মাদ্রিদ)।
নারী খেলোয়াড়: কার্লি লয়েড (যুক্তরাষ্ট্র/হিউস্টন ড্যাশ)।
ফিফা পুরুষ কোচ: ক্লাদিও রেনিয়েরি (ইতালি/লেস্টার সিটি)।
নারী কোচ: সিলভিয়া নেইদ (জার্মানি)।
গোল: মোহাম্মাদ ফাইজ সাবরি (মালায়েশিয়া/পেনাং)।
ফিফা বর্ষসেরা বিজয়ীরা-
১৯৯১: লোথার ম্যাথিউস (জার্মানি/ইন্টার মিলান)
১৯৯২: মার্কো ভন বাস্তেন  (নেদারল্যান্ডস/এসি মিলান)
১৯৯৩: রবার্তো বেজিও (ইতালি/জুভেন্টাস)
১৯৯৪: রোমারিও (ব্রাজিল/বার্সেলোনা)
১৯৯৫: জর্জি ওয়েথ (লাইবেরিয়া/এসি মিলান)
১৯৯৬: রোনালদো (ব্রাজিল/বার্সেলোনা)
১৯৯৭: রোনালদো (ব্রাজিল/ইন্টার মিলান)
১৯৯৮: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স/রিয়াল মাদ্রিদ)
১৯৯৯: রিভালদো (ব্রাজিল/বার্সেলোনা)
২০০০: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০০১: লুইস ফিগো (পর্তুগাল/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০০২: রোনালদো (ব্রাজিল/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০০৩: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০০৪: রোনালদিনহো (ব্রাজিল/বার্সেলোনা)
২০০৫: রোনালদিনহো (ব্রাজিল/বার্সেলোনা)
২০০৬: ফাবিও ক্যানভারো (ইতালি/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০০৭: রিকার্ডো কাকা (ব্রাজিল/এসি মিলান)
২০০৮: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল/ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড)
২০০৯: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা/বার্সেলোনা)
ব্যালন ডি’অর ও ফিফা একীভূত হওয়ার পর
২০১০: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা/বার্সেলোনা)
২০১১: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা/বার্সেলোনা)
২০১২: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা/বার্সেলোনা)
২০১৩: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০১৪: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল/রিয়াল মাদ্রিদ)
২০১৫ : লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা/বার্সেলোনা)
২০১৬ : ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল/রিয়াল মাদ্রিদ)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ