মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মুক্ত মতামত বন্ধ হলে মানুষ বাঁচবে কিভাবে?

জিবলু রহমান : [তিন]
গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের নিকট সরকারের দায়বদ্ধতা থাকলে সরকার এভাবে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো বন্ধ করতে পারত না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে গায়ের জোরে গণমাধ্যমের উপর দলন-পীড়ন শুধু দুঃখজনকই নয় বরং এর সাথে জড়িত সাংবাদিকদেরকেও মানবেতর জীবন যাপনের দিকে ঠেলে দেয়া হলো। অবশ্য আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই গণমাধ্যমের উপর জুলুম-নিপীড়ন চালায়। এই সরকার ইতিমধ্যেই চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন মাত্র ৪টি পত্রিকা রেখে বাকি সকল পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে শত শত সাংবাদিককে পথে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। আসলে আওয়ামী লীগ সরকার এসব কর্মকান্ড চালিয়ে দেশে একদলীয় শাসনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যাদেরকে বাধা মনে করা হচ্ছে তাদেরকেই সরিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং তাদের উপর জুলুম-অত্যাচার চালানো হচ্ছে। সরকারের এহেন আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার অনতিবিলম্বে ৩৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেছেন, ৪ আগষ্ট সরকার আকস্মিকভাবে বহু অনলাইন পত্রিকা বন্ধ করে দেয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। সরকারের এমন আচরণ গণমাধ্যমের জন্য হুমকি। পেশাজীবী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে ভীতসন্ত্রস্ত করার জন্যই এ কাজ করা হয়েছে। নেতৃদ্বয় অবিলম্বে সকল অনলাইন পত্রিকার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান। (সূত্রঃ দৈনিক দিনকাল ৬ আগষ্ট ২০১৬)
 ২০১৪ সালে সরকার তাড়াহুড়ো করে কেন অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সম্পাদকরা। অনলাইনের জন্য প্রণীত খসড়া নীতিমালায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি। উল্টো নিয়ন্ত্রণ আরোপের সকল চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
‘জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা-২০১৫’ এর খসড়ার ওপর সর্বসাধারণের মতামত আহ্বান করে ২০১৫ সালের ২১ জুলাই খসড়াটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ১২ আগস্টের মধ্যে মতামত পাঠানোর সময়সীমা বিভিন্ন সংস্থা ও সাধারণের অনুরোধে পরবর্তীতে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে মন্ত্রণালয়। প্রাপ্ত মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে মতামত দানকারী সংস্থা ও ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ১ ডিসেম্বর ২০১৫ তথ্য মন্ত্রণালয়ে ‘জাতীয় অনলাইন নীতিমালা-২০১৫’ এর খসড়ার ওপর অংশীজনদের মতামত নেয়ার জন্য তথ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ এবং নোয়াব নেতারা অনলাইন নীতিমালা নিয়ে তাদের বক্তব্য দেন। অনলাইন নীতিমালার যে খসড়াটি দেখেছি তার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণমূলক। এর মধ্যে (অনলাইন গণমাধ্যমের) স্বাধীনতার একটি হরফও নেই। আপনারা বলেছেন, এর মাধ্যমে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো সরকারের সহযোগিতা পাবে। কিন্তু নীতিমালায় সাহয্যের একটি অক্ষরও দেখা যায় না’ এ মন্তব্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের।
নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে আপনাদের (সরকারের) কী ক্ষতি হয়েছে। আপনারা (নিবন্ধন) নিয়ে কেন তাড়াহুড়ো করছেন তা আমরা বুঝতে পারছি না।’ সম্পাদকদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এটি একটি প্রাথমিক প্রক্রিয়া। অংশীজনদের মূল্যবান মতামত নেয়া হয়েছে। এ সব পরামর্শের আলোকেই জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। প্রয়োজনে আবারও আপনাদের সঙ্গে বৈঠকে বসা হবে।’
বিশ্বব্যাপী সাইবার ক্রাইমের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরাও এর বাইরে নই। অনলাইন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের জন্যই এটা দরকার। আজকে শেখ হাসিনার সরকার আছে, তাই কিছু হচ্ছে না। এরপর অন্য সরকার এলে তো অত্যাচার হতে পারে’ যোগ করেন মন্ত্রী। মতিউর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘আগে থেকেই আমরা শুনে এসেছি সম্প্রচার কমিশন এবং সম্প্রচার আইন হওয়ার পর অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধন হবে। এ সব হওয়ার আগে অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের উদ্যোগ দরকার ছিল না। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যে অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের আহ্বান জানানো হয়েছে এটা ঠিক হয়নি বলে মনে করি।’ নীতিমালা-আইন করে সরকার ভাল করে, আবার অনেক সময় খারাপও হয়। তাই তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। আগে নীতিমালা ও আইন করেন, এরপর অনলাইন নিবন্ধনের উদ্যোগ নিন। আইন না করে নিবন্ধন প্রক্রিয়াটাকে ঝুকিপূর্ণ মনে হচ্ছে’ যোগ করেন মতিউর রহমান। প্রথম আলো সম্পাদক আরও বলেন, ‘আপনারা আইন প্রণয়ন করবেন বলে উপকার করার কথা বলছেন। কিন্তু আমরা যারা আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছি তাদের কেন নতুন করে নিবন্ধন নিতে হবে তা বোধগম্য নয়।’
আপনারা বলছেন বিশ্বের কোথাও অনলাইন নীতিমালা নেই। আমরা এটা করে বিশ্বকে কী দেখাতে চাই? বিশ্বকে দেখানোর মতো আরও অনেক কিছু আছে উল্লেখ করে নোয়াব সভাপতি বলেন, ‘তাই আমি মনে করি নীতিমালা করার আগে দেয়া নিবন্ধনের আদেশ বাতিল করা উচিত। আর অনলাইন গণমাধ্যম যদি ক্ষতিকর কিছু করে তা ধরার জন্য যথেষ্ট আইন রাষ্ট্রের আছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা প্রয়োগও করা হচ্ছে। তাই অনলাইন নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। অনলাইন গণমাধ্যমকে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার মত দিয়ে বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে নিবন্ধিত পত্রিকা এবং টেলিভিশনের অনলাইন ভার্সনের জন্য আলাদা করে নিবন্ধন রাখার প্রয়োজন নেই।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘আমরা সরকারের আইন মেনেই আমাদের প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছি। অনলাইন ভার্সনেও আমাদের দায়িত্ব স্বীকার করছি। তাই এই ক্ষেত্রে নতুন করে নিবন্ধন দরকার নেই। এই বিষয়ে আরও কয়েকটি বৈঠক হওয়া দরকার। নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা থাকলে প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের গলা টিপে ধরা হবে।’
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার তার বক্তৃতায় বলেন, ‘শৃঙ্খলার দরকার আছে কিন্তু শৃঙ্খলিত করা যাবে না। ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কী লাভ হলো? এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে অনলাইন সংক্রান্ত আইন-নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ সম্পাদকদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের জন্য যে তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে তা আরও বাড়ানো যাবে। এখন অনলাইন গণমাধ্যমে টেলিভিশনও চালু হয়েছে। তাই এই বিষয়গুলোতে আলাদা নীতিমালা ও আইন প্রয়োজনের কথা অনেকেই বলছেন।
তবে আইন বা নীতিমালার মাধ্যমে গণমাধ্যম শৃঙ্খলিত হয়ে যাবে-সে ধরনের কিছু মাথায় রাখার দরকার নেই। অনলাইন বিষয়ে আইন, নীতিমালা যাই হোক না কেন তার সবকিছু আপনাদের (অংশীজনদের) মতামত নিয়েই করা হবে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক শাহ আলমগীর প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং সমকাল সম্পাদকের প্রস্তাব করা পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের প্রয়োজনহীনতার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। শাহ আলমগীর তার বক্তব্যে বলেন, ছাপা পত্রিকা এবং টেলিভিশনের জন্য প্রণীত আইন কোনোভাবেই অনলাইন ভার্সনের জন্য প্রযোজ্য নয়। এর জন্য হয় ছাপাখানা আইন সংশোধন করতে হবে, না-হয় নতুন আইন কাঠামোর মধ্যে সকল অনলাইন গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মোঃ জহিরুল হক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, আইটি বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা খসড়া প্রণয়ন কমিটির প্রধান মোস্তাফা জব্বার ও পিআইবির মহাপরিচালক শাহ আলমগীরসহ বিভিন্ন অনলাইন এজেন্সির নেতৃবৃন্দ। তবে বাংলাদেশের মূলধারার অনলাইন হিসেবে পরিচিত কোনো অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদকদের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। (সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম ৩ ডিসেম্বর ২০১৫)
বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই ধারায় সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর সূত্র ধরে বাক-স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের অন্তরায় এই ধারাটি বাতিলের দাবি প্রায় সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।
২০১৩ সালে করা এই আইনের ৫৭ ধারাটির অপব্যবহার ও প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞরা এটাকে অসাংবিধানিক অভিহিত করে তা সংশোধনের দাবি তুলেছেন। তাঁরা বলেছেন, ধারাটি সুস্পষ্ট না হওয়ায় এর অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ হচ্ছে। ২০১৩ সালে আইনটি হলেও এত দিন এর বিধি তৈরি করা হয়নি। তা ছাড়া আইনের এই ধারাটি এতটাই অস্পষ্ট যে এই আইনে যখন-তখন যাকে-তাকে ধরা যায়।
২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট প্রবীর সিকদারকে একমাত্র আসামি করে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে মামলা হয়। মামলাটি করেন জেলা পূজা উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা স্বপন পাল। স্বপন পাল জেলা জজ কোর্টের একজন এপিপি। মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, প্রবীর সিকদার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ১০ আগস্ট বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে ‘আমার জীবন শঙ্কা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামে জনসমক্ষে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেন। তার নিচে তিনি (প্রবীর সিকদার) তার মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন হিসেবে তিনজনের নাম উল্লেখ করেন। এর মধ্যে ১ নম্বরে বাংলাদেশ সরকারের এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম রয়েছে। এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, ‘এই পোস্টটি পড়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে প্রবীর সিকদার ইচ্ছাকৃতভাবে গণমানুষের প্রিয় নেতা মাননীয় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্পর্কে মিথ্যা-অসত্য লেখা লিখে তার নিজস্ব ফেসবুকে পোস্ট করে মাননীয় মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। উক্ত লেখাটি জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে উসকানি প্রদান করে শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। এর ফলে মাননীয় মন্ত্রীর মানহানি ঘটেছে; যা একটি ফৌজদারি অপরাধ।
১৬ আগস্ট রাতেই প্রবীর সিকদারকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় আনা হয়। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরদিন আদালতে প্রবীর সিকদারের রিমান্ডের আবেদনের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ১৯ আগস্ট প্রবীর সিকদারকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। নিজের গায়েব হওয়ার আশঙ্কা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বাঁচার আবেদন করেছিলেন সাংবাদিক প্রবীর সিকদার। প্রবীর সিকদার তার ফেসবুক পেজে ২১ এপ্রিল ২০১৬ এ সম্পর্কিত একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাকে বাঁচান! শিরোনামের এই স্ট্যাটাসে প্রবীর সিকদার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা, আপনি অবিলম্বে আমাকে বাঁচান। আমি আমার মামলা নিয়ে কোনো ধরনের দয়া ভিক্ষা চাইছি না। ফরিদপুরে দায়ের করা ৫৭ ধারার মামলা ও তার চার্জশিট নিয়ে আমি মোটেই বিচলিত নই। আইন ও বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করলে আমি নিশ্চিত, আইনি লড়াই করেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলায় আমি টিকে থাকব, থাকবই। আমাকে যেন আর কেউ মিথ্যা মামলায় হয়রানি করতে না পারে, কিংবা ভুয়া গোয়েন্দা পরিচয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তুলে নিয়ে আমাকে গায়েব করে ফেলতে না পারে, সেটা আপনি নিশ্চিত করবেন, প্লিজ। ওই স্ট্যাটাসে প্রবীর সিকদার বলেন, আমার এই শঙ্কার কারণ, ফরিদপুরে আমার পক্ষে আইনি লড়াই করছেন মাত্র একজন আইনজীবী। গত তিন দিন ধরে আমার মামলার চার্জশিটের নকল তুলতে পারছেন না ওই আইনজীবী। এই কষ্টের কথা আমি আপনি ছাড়া আর কাকেই বা বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
এ ব্যাপারে প্রবীর সিকদার বলেন, আমি ওই স্ট্যাটাস দিয়েছি। আগে প্রাণনাশের আশঙ্কায় আমি জিডি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে সময় জিডি নেয়া হয়নি। এখনো প্রশাসনকে বলে কী লাভ? আমার পক্ষে একজন আইনজীবী দাঁড়িয়েছেন। আইনি লড়াই লড়ছেন। তিনিও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। তাই আমার শঙ্কা যে আমাকে কেউ গায়েব করতে পারে। সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ১৯ এপ্রিল ২০১৬ এ মামলার ধার্য তারিখে জেলার ১ নম্বর আমলি আদালতে অভিযোগপত্র উপস্থাপন করা হয়। অতিরিক্ত বিচারিক হাকিম মোঃ মাসুদ আলী তাৎক্ষণিকভাবে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেন। (সূত্রঃ দৈনিক দিনকাল ২৩ এপ্রিল ২০১৬)
স্মরণ করা যাক, প্রবীর সিকদারের ফেসবুক স্ট্যাটাসের প্রেক্ষাপট এবং তাতে তাঁর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও চরম হতাশার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে ৫৭ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে, যদিও ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজে তা দায়ের করেননি। তারপর এই পেশাদার সাংবাদিককে কর্মরত অবস্থায় তাঁর কার্যালয় থেকে আটক করা হয় এবং এক পা-হীন একজন মানুষকে হাতকড়া পরিয়ে সেদিনই মধ্যরাতে ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদপুরে, যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরদিন আদালতে পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করলে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা দরকার, ৫৭ ধারার অধীন অপরাধ আমলযোগ্য বা কগনিজেবল ও অজামিনযোগ্য। অর্থাৎ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রবীর সিকদারের জামিন পাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু চাঞ্চল্যকর নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়েছে; এমনকি, যে পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন বলে আবেদন করেছিল, তারাই পরদিন আদালতে বলল, তাঁকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন নেই।
আসলে, প্রবীর সিকদারের পুলিশি রিমান্ডের আবেদন করা এবং সে আবেদন মঞ্জুর হওয়ারই কোনো যুক্তি ছিল না। তিনি ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস প্রকাশ করেছেন, তাতেই তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট ছিল। অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী তিনি যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে তা ফেসবুকে প্রকাশিত বক্তব্য। সেটা তো প্রকাশ্যই, গোপনে সংঘটিত কোনো অপরাধ নয়। তাহলে তাঁকে ১০ দিনের পুলিশি রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ কী করতে চেয়েছিল আর কী যুক্তিতেই বা তাঁর তিন দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছিল (নির্যাতনের শিকার হয়ে এক পা হারানো একজন ‘ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড’ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও)?
উপরন্তু, অভিযুক্তের অপরাধ আদালতে সত্য বলে প্রমাণিত হলে ৫৭ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী প্রবীর সিকদারের সর্বনিম্ন সাজা হতো সাত বছরের কারাদণ্ড, তার কম নয়! কারণ, এর কম সাজা দেওয়ার সুযোগ এই আইনে নেই। (মামলাটি এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি, সুতরাং সে আশঙ্কা এখনো বহাল)। অর্থাৎ, নিজের জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বেগ প্রকাশ করার ‘অপরাধে’ একজন নাগরিককে জীবনের সাতটি বছর কাটাতে হবে কারান্তরালে!
তাহলে এটা কেমন আইন? যথার্থই বলা হচ্ছে যে এটা একটা কালাকানুন। এই সমস্ত কিছু বিবেচনায় নিলে কয়েকবার জানানো সম্পাদক পরিষদের দাবি সম্পূর্ণভাবে যুক্তিসংগতঃ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করতে হবে। এ ধারায় আর কোনো মামলা দায়ের হওয়ার আগেই এটা বাতিল করা দরকার।
কিন্তু বাতিল করলেই বিপদ দূর হবে না, সমস্যার সমাধানও হবে না। কারণ, ৫৭ ধারায় উল্লেখিত অপরাধগুলো এ সমাজে সংঘটিত হবে, সেগুলোর সুষ্ঠু বিচার করার জন্য আইন-বিধান থাকা অবশ্য প্রয়োজন। খবর বেরিয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, সাইবার নিরাপত্তা ও এ-সংক্রান্ত অপরাধ বিচারের জন্য সাইবার/ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে একটা নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে, সেটিতে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বর্ণিত অপরাধগুলো অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রথমত বলা দরকার, একই ধরনের অপরাধ বিচারের জন্য একাধিক আইন থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করার পক্ষে যুক্তিটা এভাবে দৃঢ়তর হচ্ছে। কিন্তু এমন যদি হয় যে আইসিটি আইন থেকে ৫৭ ধারা বাতিল করে, সেটি হুবহু একই রূপে নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তাহলে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের কোনো অর্থ থাকবে না। কারণ, নতুন আইনেও সেই একই বিপদ থেকে যাবে।
[চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ