বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সুশাসনের অভাবেই এত প্রশ্ন

নির্বিচারে গ্রেফতার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। গত ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত সংগঠনটির ‘ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০১৭’তে এই সমালোচনা করা হয়। উক্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, সংবাদ মাধ্যম ও বেসামরিক লোকজনের ওপর সরকার দমন-পীড়ন চালিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজন আটক, পঙ্গু, হত্যা এবং গুমের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ব্লগার, ধর্ম-নিরপেক্ষ ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ, সমকামী অধিকার কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। অনেকেই জঙ্গি হামলায় নিহত হয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কত সময়, কত প্রতিবেদনই তো দেয়। না দেখে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না।’ উক্ত বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘আমরা এখনও প্রতিবেদনটি দেখিনি। কাজেই না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেশি ছিল। বাংলাদেশেও তাই। তবে যখনই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আমাদের চোখে পড়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড এ্যাডামসকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে গ্রেফতার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অবমাননাকর চর্চার কোনো বিচার নেই। তিনি আরো বলেন, দেশে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সমস্যায় জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য জরুরি, তবে তা করতে হবে মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৬ সালে দেশের দু’টি শীর্ষ সংবাদপত্রের সম্পাদককে একাধিকবার মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে কাজের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিরোধী দলের বহু সদস্য আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে, আর বাকিরা হয় আটক না হয় নিখোঁজ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্টে গ্রেফতার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-সহ যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য মোটেও সম্মানজনক নয়। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে ওইসব কর্মকা- চলতে পারে না। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নেতৃবৃন্দও বিভিন্ন সময় নির্বিচারে গ্রেফতার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারেও তাঁরা বেশ উচ্চকণ্ঠ। তাই ওইসব অভিযোগ উত্থাপনের কারণে এখন সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের জবাব দেয়া সরকারের দায়িত্ব। তবে বিভিন্ন সময়ে আমরা বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার রিপোর্টে নির্বিচার গ্রেফতার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের খবর মুদ্রিত হতে দেখেছি। বাংলাদেশের জনগণ এইসব কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে সবসময়ই তাদের মত প্রকাশ করে এসেছে। আমরা মনে করি, এইসব ক্ষেত্রে সঙ্গত দায়িত্ব পালন সরকারের জন্য এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে কাক্সিক্ষত দায়িত্ব পালনে সরকার কতটা এগিয়ে আসে সেটাই এখন দেখার বিষয়। আসলে সঙ্গত দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন সুশাসন। সুশাসনের অভাবে জনগণের জীবনে যেমন নেমে আসে দুর্ভোগ, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কর্মকাণ্ডও নানা কারণে হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতেই এখন আমাদের বসবাস।
‘চাঁদা না দিলেই নাশকতার মামলা’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে। ১৬ জানুয়ারি মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়, শ্রমিক আন্দোলন ঠেকাতে দায়ের করা মামলাকে পুঁজি করে আশুলিয়া থানা পুলিশ ধুমসে গ্রেফতার বাণিজ্য চালাচ্ছে। ধার্যকৃত চাঁদা না দিলেই নাশকতার মামলায় জড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেয়া হচ্ছে। সেখানে শ্রমিক নেতাদের ধরপাকড় অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পুলিশ ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথিত নাশকতার মৌখিক অভিযোগ তুলছে। তাদের মাথাপিছু ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার্য করে তা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, শিগগিরই এ দাবি পূরণ না হলে নাশকতার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করে কঠিন শায়েস্তা করা হবে। পুলিশের এমন হুমকি-ধমকিতে গার্মেন্ট কারখানাঘেঁষা মহল্লাগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। থানা পুলিশের রাতদিন ছোটাছুটি আর দৌরাত্ম্যের মুখে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। পুরুষশূন্য বাড়িঘরেও রাত-বিরেতে আশুলিয়া থানার পুলিশ চড়াও হচ্ছে। বাড়িতে থাকা বিভিন্ন বয়সী নারীদের নানাভাবে ভীতি প্রদর্শনসহ হয়রানি চালানোরও অভিযাগ পাওয়া গেছে। কথিত নাশকতার অভিযোগ তুলে পুলিশ ইতোমধ্যে গার্মেন্ট-শ্রমিক নেতা, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, অভিনেতাসহ অন্তত ৪০ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে চালানো হয়েছে নিপীড়ন-নির্যাতন।
শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে পুলিশ ২টি ও কারখানা কর্তৃপক্ষ ৮টি মামলা করেছেন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজিএমইএ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ৩১ জনকে নাশকতা সৃষ্টির হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু আশুলিয়া থানা পুলিশ নাশকতা সৃষ্টিকারী হিসেবে ১৫০ জনকে চিহ্নিত করে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। মামলায় উল্লেখ করা ‘অজ্ঞাত’ আসামীদের ফাঁদটি খুব জুৎসইভাবে ব্যবহার করছে আশুলিয়া থানা পুলিশ। প্রতিদিন ভোরে কারখানায় যোগদানকালে এবং রাতে ছুটির পর শ্রমিকরা বেরুলেই পুলিশ তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। দর কষাকষি শেষে লেনদেন সম্পন্ন হলে রাতেই আবার তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে সাধারণ শ্রমিকদের অনেকেই গ্রেফতারের ভয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।
উল্লেখ্য যে, গত ১২ ডিসেম্বর আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল এলাকার ৪/৫টি পোশাক কারখানায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করে। কয়েকদিনের মধ্যে ওই অসন্তোষ শিল্পাঞ্চলের অর্ধশতাধিক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ৫৫টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। তবে আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ ডিসেম্বর থেকেই গার্মেন্টগুলো খুলে দেয়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শ্রমিক অসন্তোষের ব্যাপারে গার্মেন্ট মালিকরা আলোচনা-সমঝোতায় গেলেও পুলিশ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে মাঠে তৎপর রয়েছে। ফলে পুলিশী ধরপাকড়, হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের ধকল থেকে রেহাই পেতে শত শত শ্রমিক আশুলিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। কর্মবিরতি, ভাংচুর বা আন্দোলনে অংশ না নেয়া শ্রমিকরাও কারখানার কাজে অংশ নেয়ার সাহস পাচ্ছেন না। আমরা মনে করি, এমন অবস্থায় গার্মেন্ট শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন। আমরা জানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পুলিশের ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আশুলিয়া থানার পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদন্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ