মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নওয়াব সলিমুল্লাহ : জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা

ইব্রাহিম রহমান : যুগস্রষ্টা নওয়াব সলিমুল্লাহ যুগ যুগ জন্মায় না, শতবর্ষে একবার জন্মায়। আমেরিকার স্বাধীনতার জনক জর্জ ওয়াশিংটন, গণতন্ত্রের প্রাণপুরুষ আব্রাহাম লিংকন, মানবাধিকারের জন্য জীবন উৎসর্গকারী মার্টিন লুথার কিং, ইমাম গাজ্জালী (রহ.), জালালুদ্দিন রুমী (রহ.), আল্লামা ইকবাল, কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী, মহাত্মা গান্ধী এরা যুগ স্রষ্টা, ইতিহাসের বরপুত্র। পূর্ব বাংলার মানুষের অন্তরের নওয়াব, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ তেমনি ইতিহাসের একজন বরপুত্র। আমাদের ভাগ্যবান পূর্ব পুরুষরা তাকে দেখেছেন, আমাদের প্রজন্ম তার অবদানের সুবিধাভোগী হয়েও তাকে নিয়ে আমরা একবার ভাবি না, চিন্তাও করি না। বর্তমান জমানায় তাঁর কথা চিন্তা করাও যেন পাপ, মহাঅপরাধ।
ঊনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে বৃটিশ ভারতে পিছিয়ে পড়া পূর্ব বাংলার অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহর অবদানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা এ প্রজন্মের অজানা। সুবিধাভোগী হয়েও আজ আমরা আধুনিক বাংলাদেশ ও তার বিনির্মাণে নওয়াব সলিমুল্লাহর অবদানের কথা আমরা জানারও চেষ্টা করি না। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (যা বর্তমানে বুয়েট নামে খ্যাত), সলিমুল্লাহ এতিমখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেল, ঢাকা শহরের পানি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ছাড়াও বাংলার অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে। তিনি ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জায়গায় মসজিদ, মাদ্রাসা, হোস্টেল, হাসপাতাল ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। পূর্ব বাংলার কৃষি-উৎপাদন, হস্তশিল্প সম্প্রসারণে নিজ খরচে ঢাকায় কৃষিপণ্য ও হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে গেছেন।
স্যার সলিমুল্লাহর পূর্ব পুরুষ খাজা আবদুল হাকিম মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের আমলে কাশ্মীরের গভর্নর ছিলেন। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ যখন ভারত আক্রমণ করেন তখন খাজা আবদুল হাকিম সিলেট অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। নওয়াব সলিমুল্লাহর নিকটতম পূর্ব পুরুষ খাজা আলিমুল্লাহ ঢাকায় বসবাস করতেন। নিজের শ্রম ও অধ্যবসায় গুণে তিনি ব্যবসায় প্রচুর সাফল্য লাভ করেন। ঢাকা তাদের ব্যবসার অনুকূল বিধায় তারা ঢাকায় স্থায়ীভাবে ব্যবসা শুরু ও ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান। খাজা আলিমুল্লাহ সুমী মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি তার দরদি নজর ছিল। তিনি হোসেনী দালানের ব্যবস্থাপনা ও পবিত্র মোহররমের অনুষ্ঠানাদিতে অর্থ সাহায্য করতেন। খাজা আবদুল গনি ছিলেন খাজা আলিমুল্লাহর সুযোগ্য সন্তান। তিনি পাশাপাশি সুন্নী মুসলিমদের পৃষ্ঠপোষকতা করে বস্তুতপক্ষে সুন্নী মুসলিমদের একচ্ছত্র নেতা হয়ে যান।
১৮৭৫ সালে বৃটিশ সরকার খাজা আবদুল গনিকে নওয়াব খেতাবে ভূষিত করেন। দুই বছর পর অর্থাৎ ১৮৭৭ সালে পরিবারের প্রথম সন্তানের জন্য নওয়াব খেতাব নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ১৮৬৪ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠার পর নওয়াব আবদুল গনি ও তার ছেলে নওয়াব আহসান উল্লাহ মিউনিসিপ্যালিটির সাথে জড়িত হন। তারা উভয়েই ঢাকা শহরের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। ঢাকা শহরে পঞ্চায়েত প্রথা নওয়াব পরিবারের উদ্ভাবন। ছোটখাট বিচার, শালিস ছিল পঞ্চায়েতের কাজ যা আজও বহাল।
নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ ১৮৭১ সালের ৭ জুন আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নওয়াব খাজা আহসান উল্লাহ ও মাতা ছিলেন বেগম ওয়াহিদুন্নেসা। তার দাতা নওয়াব খাজা আবদুল গনির নামেই ঢাকা সচিবালয়ের দক্ষিণ পাশের রাস্তা। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সলিমুল্লাহ ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে উর্দু, আরবী, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষা শেখেন। ১৮৯৩ সালে বৃটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি গ্রহণ করলেও দুই বছরের মাথায় তা ছেড়ে দিয়ে তিনি ময়মনসিংহে ব্যবসা শুরু করেন।
১৯০১ সালে পিতা খাজা আহসান উল্লাহর মৃত্যুর পর আহসান মঞ্জিলে ফিরে এসে পুরো জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কলকাতাকে রাজধানী করে পূর্ববাংলা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা মিলে গঠিত ছিল তখন বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রদেশ। এর মধ্যে পূর্ববাংলা ছিল সবচেয়ে পিছিয়ে পরা উপেক্ষিত এলাকা। এ অঞ্চলের মুসলিমদের ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পূর্ববাংলা ও আসাম সমবায়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের জন্য। ১৯০৩ সালে শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। ঐ সময় তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সপক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে সহযোগীদের নিয়ে সারা পূর্ববাংলা চষে বেড়ান। তার ডাকে ১৯০৪ সালের ১১ জানুয়ারী আহসান মঞ্জিলে পূর্ব বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এক সভা হয়। ওই সভায় তিনি বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার কিছু বিষয়ে বিরোধিতা করে তার দৃঢ় মতামত ব্যক্ত করেন। এক মাস পর বড় লাট লর্ড কার্জন ঢাকা এসে নওয়াব সলিমুল্লাহর আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখানে বড়লাট বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার সকল বিষয় আলোচনা করে এক সমঝোতায় পৌঁছান। সেই সমঝোতা অনুযায়ী ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। দীর্ঘদিন পর ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়। ঢাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। ১৯০৫-১১ সময়ের মধ্যে স্কুল কলেজে ভর্তির হার ৩৫% শতাংশ বৃদ্ধি পায়। নতুন প্রদেশে ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করে। ১৯০৬ সালে আঞ্চলিক সওদাগররা চট্টগ্রাম-রেঙ্গুন জাহাজ সার্ভিস চালু করেন। ঐ সময় পূর্ববাংলার জনগণের জন্য প্রত্যেকটি সফলতা ছিল একেকটি মাইলফলক। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে নতুন রাজধানীতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
বঙ্গভঙ্গ আদেশ কার্যকরের দিনই নওয়াব সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে ঢাকার নর্থব্রুক হলে মুসলিম নেতাদের সভায় ‘মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন’ নামে মুসলমানদের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি হয়। শুরু হয় নওয়াব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গঠনের পালা। নওয়াব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে  উদ্যোগে ১৯০৬ সালের ২৭-৩০ ডিসেম্বর নওয়াবের শাহবাগের বাগানবাড়িতে সর্বভারতীয় মুসলিম নেতাদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে সারা ভারত থেকে ৮ হাজার ডেলিগেট যোগদান করেন। নওয়াব সলিমুল্লাহ ঐ সম্মেলনের অভ্যর্থনা ও প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। জাস্টিস শরীফ উদ্দিন কোলকাতা হাইকোর্ট সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। নওয়াব ভিকারুল মুলকের সভাপতিত্বে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক অধিবেশন। নওয়াব সলিমুল্লাহর প্রস্তাবে এবং হাকিম আফজাল খানের সমর্থনে মহামান্য আগা খানকে মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। নওয়াব সলিমুল্লাহ ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। নওয়াব মোহসিন-উল-মুলক ও নওয়াব ভিকারুল মুলক যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনে মোট ৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়। সকল খরচ বহন করেন নওয়াব সলিমুল্লাহ নিজে। ১৯০৯ সালে ২১ মার্চ হিন্দু মুসলিম নেতাদের একত্র করে ‘ইম্পেরিয়েল লীগ অফ ইস্ট বেঙ্গল এ্যান্ড আসাম’ নামে একটি শক্তিশালী সামাজিক সংস্থা গঠন করেন তিনি।
নতুন প্রদেশ ঘোষণার পর পূর্ব বাংলার অবহেলিত ও উপেক্ষিত মুসলিম জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে জোতদার, জমিদার মহাজন, কলকাতাবাসী ডাক্তার, উকিল, মোক্তারসহ আত্মকেন্দ্রিক পেশাজীবীদের কায়েমী স্বার্থে আঘাত লাগে। এসব ক্ষমতাশালী এলিট শ্রেণীর লোকেরা বঙ্গভঙ্গকে মেনে নিতে পারেননি। তাদের প্ররোচনায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সারা প্রদেশ জুড়ে সন্ত্রাসী আন্দোলন শুরু হয়। নওয়াব সলিমুল্লাহকে শত্রু ঘোষণা করে কুমিল্লায় গুলী করে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঢাকার পথে ট্রেন লাইনচ্যুত করা হয়। অবহেলিত মুসলিম স্বার্থ বিরোধী গোষ্ঠী বঙ্গভঙ্গ আদেশ বাতিলের জন্য প্রচ- আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যোগ দেন। 
প্রবল আন্দোলনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বৃটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লীর দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা প্রদান করেন। এই ঘোষণা কার্যকর হয় ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল। এই সুযোগে ভারতের রাজধানীও কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তর করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে নওয়াব সলিমুল্লাহ আশাহত হয়ে পড়েন। প্রতিবাদে তিনি বৃটিশ সরকার দেয়া জিসিআইই ব্যাজ ছুড়ে ফেলে দেন এবং পূর্ববাংলার অবহেলিত মুসলিমদের উন্নয়নে আট দফা দাবি পেশ করেন। এইসব দাবির মধ্যে ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়, হাইকোর্ট, কেন্দ্রীয় সরকারের একজন শিক্ষা অফিসার। বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্টের জন্য তিনি রমনা এলাকায় জমি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। এই দাবিসমূহ পূরণের জন্য তিনি বড় লাটের উদ্দেশ্যে ১৭ ও ২০ ডিসেম্বর দুটি চিঠি লিখেন। চিঠি দুটির কপি এখনও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। মূলত নওয়াব সলিমুল্লাহর চাপেই বৃটিশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়।
দুঃখের বিষয় এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুর পর টাঙ্গাইলের জমিদার নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীসহ কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির উদ্যোগে বহু বিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের ২১ জুলাই।
নওয়াব সলিমুল্লাহর কাছ থেকে পূর্ব বাংলার মুসলিমদের অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগের বিষয়, ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তার কলকাতার বাড়িতে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন তার বয়স ছিল ৪৪ বছর। ধারণা করা হয়, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী অথবা বৃটিশ সরকার তাকে গুলি অথবা বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। তার লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সীলগালা করা কফিনে বৃটিশ সৈন্যদের কড়া প্রহরায় নদীপথে ঢাকায় এনে বেগম বাজারে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সড়ক বা রেলযোগে লাশ আনতে সাহস পায়নি বৃটিশ সরকার।
তার লাশের কফিন ঢাকায় আনা হলে হাজার হাজার লোক নেতার লাশ দেখতে চাইলেও দেখতে দেয়া হয়নি। এমন কি তার নিকট আত্মীয়দের শেষ দেখার জন্যও লাশ খোলা হয়নি। দাফনের পরও ৬ মাস কবরস্থানে সৈন্যদের প্রহরা ছিল। বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল পরবর্তী কোন সরকারই তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে কোন প্রকার তদন্তের ব্যবস্থা করেনি। নওয়াব সলিমুল্লাহর স্বপ্নের পূরণ ১৯৪৭ সালের পূর্ব পাকিস্তান অবশেষে আজকের বাংলাদেশ।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক, নওয়াব সলিমুল্লাহ মেমোরিয়েল কমিটির উপদেষ্টা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ