মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মানুষের মনে ভীতি ও আতংক

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়ে চলেছে। হঠাৎ করে এভাবে মানুষ নিখোঁজের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেশের জনগণের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যারা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, তারা স্বেচ্ছায় কোথাও চলে যাচ্ছে, নাকি আত্মগোপন করে থাকছে, নাকি কেউ তাদের তুলে নিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলছে, কেউই তা বলতে পারছে না। গত ক’দিনে এই যে ১০/১২ জন মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেল, তারা কোথায় গেল? রাষ্ট্রের আইন-শৃংখলা বাহিনীও এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারছে না। প্রকাশিত আরো এক উদ্বেগজনক খবর হলো, একই সময়ে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ ঘটনাও বাড়ছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৯ দিনে ১৬ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সারাস দেশের মানুষের মনে ভীতি ও আতংক দেখা দিয়েছে। দেশব্যাপী অপহরণ, গুম, খুন, নিখোঁজ, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন না হলেও মাঝে এসব অপরাধ কিছুটা কমে গিয়েছিল, যা ছিল বড় ধরনের একটা স্বস্তির কারণ। সেই স্বস্তিতে আবার অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, বিগত ৯ বছর ৭ মাসে ৪৫৭ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩৩২ জনের আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি। চলতি ২০১৬ সালের প্রথম ৭ মাসে নিখোঁজ হয়েছে ৬০ জন, যাদের মধ্যে ৩২ জনের আজো পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাকি ২৮ জনের মধ্যে ৭ জনের লাশ পাওয়া গেছে, ৩ জন ফিরে এসেছে এবং ১৮ জনকে আইন-শৃংখলা বাহিনী গ্রেফতার দেখিয়েছে। অধিকাংশ নিখোঁজের ঘটনার ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে যে, তাদের আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। স্বেচ্ছায় নিখোঁজ বা তুলে নিয়ে যাওয়া এমন যা কিছুই হোক না কেন, আইন-শৃংখলা বাহিনীর দায়িত্ব সেসব লোকদের খুঁজে বের করা। সে কাজটি আদৌ হয়েছে বলে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। নিখোঁজ মানুষের পরিবারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে বারবার আবেদন নিবেদন করার পরও তদন্ত করা, এমনকি খুঁজে দেখারও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কথিত বন্দুকযুদ্ধের ব্যাপারেও অভিযোগের অন্ত নেই। প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেয়া হয় তা একই রকম। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা গেছে যে, আইন-শৃংখলা বাহিনী বা আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে পরে বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ জন করে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গত ১১ মাসে নিহত হয়েছে ১৮৪ জন মানুষ। গত বছর একই সময়  নিহত হয় ১৭১ জন এবং ২০১৪ সালে নিহত হয় সর্বমোট ২৫৪ মানুষ। দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে প্রায় পাইকারি হারে নাগরিকদের হত্যা করার ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি সরকারকে তা দ্রুত বন্ধ করার জোর তাগাদা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, বন্দুকযুদ্ধে নাগরিক হত্যার ঘটনা আদৌ কমেছে কী? দেশের নাগরিকদের মধ্যে যে যত বড় অপরাধীই হোক, বিনাবিচারে কোনো নাগরিককে হত্যা করার কোনো অধিকার সংবিধান ও প্রচলিত আইন কাউকেই দেয়নি। এটা আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যা আইনের শাসনের ধস নামাচ্ছে। এ কারণে আইনী প্রতিকার পাওয়ার যাবতীয় সুযোগের দরজা বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে, একই সাথে দেশের গণমানুষের জীবনের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সারা দেশে অপহরণ, নিখোঁজ, হত্যা, খুন, গুম, গ্রেফতার, গণগ্রেফতার, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেমন মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে চলেছে, ঠিক তেমনি তা দেশের মর্যাদাকেও অনেক নিচে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো যখন আমাদের বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ করুণ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে, তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে, মানবাধিকার সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি বারবার জোরালো দাবি জানাতে থাকে, তখন আমাদের জাতীয় মর্যাদা আর সম্মানজনক অবস্থান কি করে থাকে? অবাধ গণতন্ত্র, সুষ্ঠু আইন-শৃংখলা ও নাগরিক নিরাপত্তা, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত। সকল দিকের বিবেচনায় নাগরিক নিরাপত্তা, বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এটা ক্ষমতাসীন সরকারকেই করতে হবে। এখন দেশব্যাপী অপহরণ, নিখোঁজ, হত্যা, গুম নিয়ে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়ে জনগণের মনে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আতংক ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে, তা দূর করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ