বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ভূমিকম্প : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

আখতার হামিদ খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ভবনের মালিক বা অর্থ যোগানদাতার খরচ বাঁচানোর অনুরোধে যেন একজন ডিজাইনার প্রয়োজনের চেয়ে কম সাইজের কলাম বা বিম অথবা অপর্যাপ্ত পরিমাণ রিইনফোর্সমেন্ট ব্যবহার না করেন, সে দিকটা খেয়াল রাখতে হবে। যুক্তিসঙ্গতভাবে এবং কারিগরি জ্ঞান-এর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যপম যতটা সম্ভব সাশ্রয়ী ডিজাইন করা উচিত। এক্ষেত্রে ডিজাইনজনিত নিরাপত্তাও অনেকটা নিশ্চিত হতে পারে। আমরা যারা ভবন-এর মালিক তাদেরও মানসিকতা পরিবর্তন হওয়া দরকার। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম রড ব্যবহার করা হয়, ঢালাইয়ের কাজে কম সিমেন্ট দিয়ে খরচ কমিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন অথবা ছোট সাইজের কলাম দেয়ার পক্ষপাতী। অথচ অপরদিকে তারা বিল্ডিং এর ফিনিসিং ম্যাটেরিয়াল যেমন টাইলস, কমোড, বেসিন, বাথরুম ফিটিংস ইত্যাদিতে খরচ করতে কোনো কার্পণ্য করেন না এমনকি ইটালি, ফ্রান্স বা স্পেন-এর বেশি মূল্যের ফিনিসিং ম্যাটেরিয়াল লাগিয়ে ব্যক্তিগত তুষ্টি ও তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা অর্জন করার চেষ্টা করেন। ১৫ তলা একটি ভবনের মূল কাঠামো যার ওপর বিল্ডিং এবং এতে বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নির্ভরশীল সেই অংশের নির্মাণব্যয় পুরো ভবনের নির্মাণব্যয়ের সর্বোচ্চ ৪০-৪২ শতাংশ। আরো উল্লেখ্য, যে রড কম দেয়ার জন্য এত চেষ্টা সমগ্র কাঠামো নির্মাণে সেই রড-এর বিপরীতে খরচ হয় মোট খরচের মাত্র ১৬ শতাংশ। আবার ডিটেইলিং করার সময় ডিজাইনার-এর কনস্ট্রাকশন মেথড-এর ওপর পর্যাপ্ত বাস্তব জ্ঞান থাকাও অতি জরুরি। নির্ভুল এনালাইসিস এবং ডিজাইন সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ডিটেইলিং এর অভাবে নির্মাণ কাজ বাধাগ্রস্ত হয় এবং রড বাঁধায় ক্ষেত্রবিশেষে এমন ভুল থেকে যেতে পারে যা ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। ভূমিকম্পের বিরুদ্ধে নিরাপদ বহুতল ভবন নির্মাণে অবশ্যই নির্দিষ্টভাবে ভূমিকম্পের জন্যই প্রযোজ্য ডিটেইলিং অনুসরণ করতে হবে। এজন্য বিম কলাম জয়েন্টকে অধিকতর মজবুত করা দরকার। এবং তা করতে বিম কলাম জয়েন্টে এবং এর নিকটবর্তী অংশে অধিক ঘন ঘন করে টাই বা রিং দেয়া দরকার। এই টাই বা রিং এর দুই প্রান্ত অবশ্যই ১৩৫০ কোণে বাঁকিয়ে দিতে হবে;’ যা ভূমিকম্পে টাই বা রিং খুলে না যাওয়া নিশ্চিত করবে। এখনও বহু নির্মাণকাজে এই টাই বা রিং এর প্রান্ত ৯০০ কোণে রেখে দেয়া হয় যা খুব বিপদজনক। বীম-কলাম জয়েন্টে আরেকটি ব্যাপার খেয়াল রাখতে হয় তা হল, এখানে সাধারণত রড খুব ঘন ঘন হওয়ায় কংক্রিট ঠিকমতো কমপেকশন করা কষ্টসাধ্য। তাই ডিটেইলিং করার সময় জয়েন্টে যতদূর সম্ভব রডের আধিক্য পরিহার করতে হবে। এখানে বলে রাখা ভালো একটি বিল্ডিং এর কাঠামোগত ডিজাইন যিনি করছেন তার শিক্ষাগত এবং পেশাগত যোগ্যতা এবং সেই সাথে নির্মাণকাজে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি একজন ডিজাইনারকে হতে হবে নীতিগতভাবে দৃঢ়চেতা একজন ব্যক্তিত্ব যিনি কোনো প্রলোভন বা ভয় এর কারণে পেশার সাথে আপোষ করে বিল্ডিং এ বসবাসকারীদের অমূল্য জীবন হুমকির মধ্যে ঠেলে দিবেন না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে ডিজাইনারকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হয়েছে এবং ডিজাইনজনিত ত্রুটির কারণে কোনো বিল্ডিং ধসে পড়লে ডিজাইনারকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
লোড এনালাইসিস, ডিজাইন ও ডিটেইলিং এর পর যা বাকি থাকে তা হল নির্মাণকাজ। একমাত্র মানসম্পন্ন নির্মাণই পারে একটি সঠিকভাবে ডিজাইন করা ইমারতকে নিরাপদ আবাস হিসাবে গড়ে তুলতে। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত তদারকি। তবে উপরের সবকটি উপাদান উপস্থিত থাকার পরও মানসম্পন্ন নির্মাণ সম্ভব না-ও হতে পারে যদি দক্ষ ও পর্যাপ্ত কর্মীবাহিনী না থাকে। জাপানী ম্যানেজমেন্টের ভাষায় একজন মানসম্পন্ন কর্মীই পারে মানসম্পন্ন কাজ করতে। সহজভাবে জাপানী ম্যানেজমেন্টের মূলমন্ত্র হল অপারেশন লেভেলে যারা কাজ করে অর্থাৎ নির্মাণ সাইটের ক্ষেত্রে যারা লেবার তারা যদি শ্রমের পাশাপাশি তাদের মেধার যথোপযুক্ত ব্যবহার করার সুযোগ পায় তবে তার নিজ কাজের মর্যাদা উপলব্ধি করে নিজ দায়িত্বে মানসম্পন্ন কাজ উপহার দিতে পারে। নির্মাণকাজে প্রচলিতভাবে যেসকল ভুলগুলো হয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হল কলাম ঢালাইয়ে যথেষ্ট গুরুত্বের অভাব। সাধারণত দেখা যায় ছাদ ঢালাইয়ের আগে এবং ঢালাই চলাকালীন ব্যাপক তদারকি হয়, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার উপস্থিত থেকে ছাদ ঢালাই পরিচালনা করেন। কিন্তু কলাম ঢালাই হয় অত্যন্ত উপেক্ষিতভাবে। হয়তো পুরো কাজটিই ফোরম্যান ও মিস্ত্রির তত্ত্বাবধানে হয়ে যায়। অথচ কলাম হল একটি বহুতল ইমারতে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর কারণ হল একটি কলাম তার উপরের সকল তলার লোড বহন করে যা বিম বা স্ল্যাব-এর ক্ষেত্রে ভিন্ন। বিম বা স্ল্যাব কেবল সেই তলার নির্দিষ্ট এরিয়ার লোড বহন করে। একটি বিল্ডিং এর যেকোনো একটি কলামের একটি দুর্বল অংশ একটি সমগ্র ইমারতের ধ্বসে পরার কারণ হিসাবে যথেষ্ট। আর তাই বিল্ডিং এর কলাম ঢালাই কোনোভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ তো নয়ই বরং এটাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। কংক্রিটের ভেতরের লোহার খাঁচাকে মানবদেহের কঙ্কালের সাথে যদি তুলনা করা হয় তবে বলা যায়, কঙ্কাল যেমন মাংসপেশির সাহায্য ছাড়া নিজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না তেমনি দুর্বল কংক্রিটের ভেতরে থাকা লোহার খাঁচাও অর্থহীন।
তাছাড়া কলাম ঢালাইয়ে আরো যেসব ব্যাপার খুব গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হয় তা হল কলামকে পুরোপুরি খাড়া রাখা, কংক্রিট মিক্সিং-এ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি বা বালি ব্যবহার না করা, এবং কোনো অবস্থাতেই হ্যান্ড মিক্সড কংক্রিট ব্যবহার না করা। কোনো কারণে বৃষ্টি চলাকালীন সময়ে যদি ঢালাই করতেই হয় তবে পলিথিন দিয়ে ঢেকে নেয়া উচিত। যথাযথভাবে ডিজাইন ও নির্মাণ করা বহুতল ভবন ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তাই বহুতল ভবন নির্মাণ উৎসাহিত করা দরকার। এর প্রধান কারণ মেগাসিটি ঢাকায় আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য বহুতল ইমারত নির্মাণ ছাড়া গত্যন্তর নেই। ‘মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ ২০০৮ বাস্তবায়ন জাতীয় ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যা ভবিষ্যতে ঢাকার আবাসন ব্যবস্থাকে একটি পরিবেশবান্ধব রূপ দিতে সক্ষম হবে। এই নতুন ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড আইনি প্রয়োগের আওতায় আসায় ভূমিকম্পরোধী বহুতল ইমারত নির্মাণ নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। অতি সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প দেশের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘটিত ভূমিকম্পের ফলে বার্মা হয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আড়াআড়ি যে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে এতে বিশেষজ্ঞমহল বেশ শংকিত এই ভেবে যে বড় ধরনের যেকোনো ভূমিকম্প বাংলাদেশে অত্যাসন্ন। এই লেখার শুরুতে যা বলেছিলাম তা দিয়েই শেষ করছি। বড় ভূমিকম্পের ফলে যদি ঢাকার শতকরা ২০ ভাগ ভবনও ধসে পড়ে তবে সবকিছু বাদ দিলেও কেবল সরু/ রাস্তাঘাট এর কারণেই উদ্ধারকাজ কতটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আম বলি ভূমিকম্প হলে যারা মারা যাবেন তারাই বরং বেঁচে যাবেন। যারা বেঁচে থাকবেন তারাই পড়বেন চরম বিপদে। কারণ তাদের উদ্ধার করার উপায়ই কারো থাকবে না। ফলে দিনের পর দিন না খেয়ে থেকে মরা মানুষের পাশে পচা দুর্গন্ধে তাদের ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। অনেকে বলে থাকেন কবে কোন আমলে ঢাকায় ভূমিকম্প হয়েছে সেটা কে দেখেছে? আমাদের আমলে তো নয়ই এমনকি বাপদাদার আমলেও কোনো ভূমিকম্প হয়নি। অতএব ভূমিকম্প হবেই এমন কথা বলা যায় না। এ প্রসঙ্গে আমি বলব ভূমিকম্প হোক সেটা আমরা নিশ্চয়ই কামনা করি না। তবে যদি হয়ে যায় তাহলে কী হবে? আমাদের ধর্মে মৃত্যু, কবর, হাসর, মিজান, পুলসেরাত, দোযখ, বেহেস্ত সম্পর্কে যেসব কথা বলা আছে তা যদি সবই মিথ্যা হয়ে যায় তাহলে তো কারোরই কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু যদি তা সত্য হয়ে পড়ে তাহলে কী হবে? তাছাড়া নিকট ভবিষ্যতে আমাদের দেশে ভূমিকম্প না হলেও আসামে যদি হয় তাহলে তার প্রতিক্রিয়া যে ঢাকাতে বা অন্যান্য শহরে ভয়াবহ হবে না সেই নিশ্চয়তা কোথায়? ভূমিকম্পের তো পাসপোর্ট বা ভিসার প্রয়োজন নেই দেশের সীমানা অতিক্রমের জন্য। এ ধরনের ভুল ধারণা যদি বিশেষত কোনো রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের মধ্যে থেকে থাকে তবে তা খুবই চিন্তার বিষয়।
অতএব ভূমিকম্প হবে কি হবে না, হলে কবে হবে সেই বিতর্কে না গিয়ে বরং হলে কী হবে সেটা ভাবাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আর তাই মধুবাজার, সেন্ট্রাল রোড-এর মতো কোনো কোনো এলাকাবাসী ইদানীং নিজ এলাকার রাস্তা প্রশস্ত করতে সীমানা দেয়াল সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ইলেক্ট্রিক পোলগুলো সরাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের গড়িমসির জন্য হয়তো রাস্তার প্রশস্ততা কার্যকর হল না। তাই জনগণের পাশাপাশি সরকারকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
পরিশেষে ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে করণীয় সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিয়ে আমার লেখা শেষ করব।
ভূমিকম্প বিষয়ক সাবধানতা : ভূমিকম্প সময়কালীন করণীয়
* ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি না করে যতটা সম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখা।
* এ্যাপার্টমেন্টের নীচতলায় সকল গ্যাসলাইনের সুইচ এবং ইলেকট্রিসিটির মেইন সুইচ বন্ধ করা। লিফ্টে কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে লিফটের সুইচ বন্ধ করা। এ সকল কাজের জন্য এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর কেয়ারটেকার, দারোয়ান এবং গাড়ির ড্রাইভারসহ যারা এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর নীচতলায় অধিকাংশ সময় অবস্থান করে তাদের হাতে-কলমে কার্যকর প্রশিক্ষণ দেওয়া।
* প্রত্যেক ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের নিজ নিজ ফ্ল্যাটের গ্যাসের চুলা এবং ইলেকট্রিসিটির মেইন সুইচ বন্ধ করা। মেইন সুইচ ফ্ল্যাটের ভিতর না থাকলে সকল ইলেক্ট্রিক্যাল সরঞ্জাম যেমন টিভি, ফ্রিজ বন্ধ করা।
* মাথার উপর বালিশ চাপা দিয়ে অতিদ্রুত ডাইনিং টেবিলের নীচে আশ্রয় নেওয়া। ভূমিকম্পের প্রাথমিক ধাক্কা কাটানোর পরেই সকলে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সিঁড়িঘরে জমায়েত হওয়া। তা সম্ভব না হলে টেবিলের নীচেই অবস্থান করা। মনে রাখতে হবে ভূমিকম্পের পরে দ্বিতীয় ধাক্কা (আফটার শক্) আরো সঠিক জোরালো হয়।
* প্রত্যেকের নিজ নিজ মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখা। সঙ্গত কারণেই ফোনে পর্যাপ্ত চার্জ থাকা জরুরি। সেই সাথে চার্জ আছে এমন টর্চলাইট হাতে রাখা।
* বিল্ডিং এর নীচের ফ্লোরে অবস্থানরত বাসিন্দারা যারা ৫-১০ সেকেন্ডের মধ্যে বিল্ডিং এর বাইরে যেতে পারবেন তাদের খোলা জায়গায় বা মাঠে বের হয়ে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে অবস্থান নেয়া। বের হওয়া সম্ভব না হলে বিল্ডিং এর সেই সব মজবুত জায়গা, যেমন মজবুত কলাম এবং কাছাকাছি অবস্থানরত কংক্রিটের দেয়ালের আশেপাশে থাকার চেষ্টা করা। দরজা, জানালা, বারান্দা এবং ভেন্টিলেটার থেকে দূরে থাকা। তাছাড়া ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি থেকেও দূরে থাকা।
* উপরের দিকের ফ্লোরগুলোর বাসিন্দারা নীচে নামার সম্ভাবনা হলে ছাদে আশ্রয় নেওয়া। পরবর্তীতে উদ্ধারকর্মীরা যেন তাদেরকে সেখান থেকে সহজে উদ্ধার করতে পারে।
* কোনোক্রমেই লিফট ব্যবহার না করা। ভাঙা বা জরাজীর্ণ দরজা বা জরাজীর্ণ সিঁড়িঘর থেকে দূরে থাকা।
* সম্ভব হলে দ্রুত জুতা পরে নেওয়া যেন পা আঘাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
ভূমিকম্প পরক্ষণে করণীয়
* জরুরি সাহায্যের জন্য পথ রাখা
* পানি নষ্ট না করা
* ফার্স্ট এইড ব্যবহার করা
* পরবর্তী ভূমিকম্প এবং শক-এর জন্য প্রস্তুত থাকা
ভূমিকম্প পূর্ববর্তী সাবধানতা :
* প্রয়োজনে অতিদ্রুত যাতে সাহায্য পাওয়া যায় সেজন্য প্রত্যেক বাসার ভেতরে একটি Fire Extinguisher (অগ্নিনির্বাপক) রাখা।
* Fire Extinguisher (অগ্নিনির্বাপক) গুলোতে নিয়মিত Refill করে রাখা এবং এগুলোর ব্যবহার বিল্ডিং এর ছোট বড় সকলেই এমনকি কাজের লোকেরও জানা থাকা।
* এজন্য Fire drill (অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ) এর প্রয়োজন করা খুব কার্যকর।
* জেনারেটরের জন্য দরকারী ডিজেল প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত না করা। এই ডিজেল দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাছাড়া ডিজেলের কারণে সৃষ্ট আগুন নেভানোর জন্য কয়েক বালতি বালি সু-শৃঙ্খলভাবে নীচতলায় জেনারেটর রুম-এর নিকটবর্তী স্থানে রাখা।
ভূমিকম্প ও ভবন নির্মাণ : যা হবার কথা নয় : কতকাল কতযুগ ধরে মানুষ ভূমিকম্প নিয়ে ভাবছে। ভূমিকম্প মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষের ধারণা ভূমিকম্প মানে ধ্বংস, কেননা এটা প্রাকৃতিক এক বিপর্যয়। আমরা নিশ্চয় বুলেট-প্রুফ জ্যাকেট এর কথা জানি এবং তার কার্যকারিতা সম্পর্কেও আমরা জানি অর্থাৎ আমি মূলত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথাটি বোঝাতে চাচ্ছি। ঠিক তেমনি ভূমিকম্প-প্রতিরোধক স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব, যা মানবসভ্যতাকে রক্ষা করবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সেটা কী করে সম্ভব। প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশে অনেক পন্ডিত ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন এতকাল ভূমিকম্প-প্রতিরোধক ভবন নির্মাণ করা হয়নি? কিছু সংখ্যক ভবন ছাড়া, বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে? আরও একটি প্রশ্ন, ভবন নির্মাতারা কেনই-বা এতটা উদাসীন এক্ষেত্রে? কারা এর জন্য দায়ী? আমি নিশ্চত করে বলতে পারি, বাংলাদেশের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন এ্যাক্ট ১৯৫২ নন আর্থকোয়েক প্রুফড ভবন বা অন্যান্য ত্রুটিপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের জন্য পুরোপুরি দায়ী, যা দেশটিকে এখন ধ্বংসের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে; যেটা পারমাণবিক যুদ্ধের চেয়েও বেশি বাড়িয়ে তুলবে মানুষের ভোগান্তি। কারণ এতে ভূমিকম্প সেফটি সংক্রান্ত কোনো নির্মা বিধিমালা নেই। এমনকি কোনো সতর্কবাণীও নেই। ১৯৩৫ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করার জন্য আর্থকোয়েক জোনেশন ম্যাপ প্রণয়ন করে।
পরবর্তীকালে ১৯৫২ এ্যাক্ট-কে অনুসরণ করে অন্যান্য বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৭-এ ভূমিকম্প ব্যাপারে সতর্কবাণী রয়েছে, তবে বিস্তারিতভাবে কিছু লেখা না থাকতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটি বোঝা একদম মুশকিল। সাধারণ মানুষেকে এ ব্যাপারটা সহজভাবে বোঝাতে না পারলে তাদের মধ্যে সঠিকভাবে আর্থকোয়েক পাবলিক এ্যাওয়ারনেস গড়ে উঠবে না। সে কারণে আর্থকোয়েক প্রুফ বিল্ডিং নির্মাণের প্রবণতা শূন্যের ঘরে থাকছে। এই বিধিমালাতে জনসাধারণের অবগতির জন্য বলা হয়নি যে-
১। ওপেন গ্রাউন্ড ফ্লোর কার পার্কিং স্পেইস রেখে বা অন্য কোনো তলাতে এই ধরনের ওপেন ফ্লোর স্পেইস রেখে ভবন নির্মাণ করা যাবে না, যাকে বলা হয় সফ্ট স্টেরি কন্ডিশন; এ জাতীয় ভবনগুলোর ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের সময় খুব ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সিসমিক ইনারসিয়াল স্ট্রাকচারাল ফেইলইউর হবে।
২। বিধিমালাতে জনসাধারণের অবগতির জন্য উল্লেখ নেই যে ভবনটি সিমেট্রিকাল হতে হবে লং এবং সর্ট এক্সিস বরাবর; যাতে করে ভবনটি ভূমিকম্পের সময় ঘুরে না যায় যাকে বলা হয় টরশনাল ফেইলেউর। এটা এড়াতে হলে ভবনের কলাম গ্রিডকে প্রথমে সিমেট্রিকাল করে সাজাতে হবে তারপর আরকিটেকচারাল প্লান করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে প্রথম করা হচ্ছে আরকিটেকচারাল প্লান তারপর করা হচ্ছে কলাম গ্রিড প্লান যা ভবনটিকে করে ফেলবে সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ।
৩। ২০০৭ এর ইমারত বিধিমালাতে জনসাধারণকে এটাও বলা হয়নি যে গতানুগতিক ৯০ ডিগ্রি স্টিরাপ হুক এর পরিবর্তে ৪৫ ডিগ্রি স্টিরাপ হুক ব্যবহার করতে হবে কলাম এবং বিমে, যা ভিতরের কংক্রিটকে সহজভাবে ধরে রাখতে পারবে।
৪। এই বিধিমালাতে জনসাধারণকে এটাও বলা হয়নি আর্থকোয়েক প্রতিরোধক ভবনে শিয়ার ওয়াল এর প্রয়োজন কেন; এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্পের সময় ভবনটিকে মারাত্মক ক্ষতির হাত থেকে কীভাবে এটাকে ব্যবহার করতে হবে।
আমি এখানে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি উপরে বর্ণিত (১-৪) সিসমিক টেকনিক্যাল ইনফরমেশনগুলো সাধারণ জ্ঞানেরই মধ্যে পরে যা বাধ্যতামূলক হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং এটা আর্থকোয়েক পাবলিক মানুষ উপরিউক্ত বিষয়গুলো মোটেই জানে না। এমনকি অনেক স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং আর্কিটেক্টও এই বিষয়গুলো বোঝে না। বর্তমানে ননসিসমিক রেজিস্টিভ ভবন নির্মাণের এটাই একমাত্র কারণ। বর্তমাণে ডিপ্লোমা এবং গ্রাজুয়েট লেভেলের পাঠ্যপুস্তকে উপরোক্ত বিষয়গুলো সংযোজন করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রতিরোধক ভবন নির্মাণের দিকে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
এবার আসা যাক একটি মৌলিক বিষয়ের দিকে; বর্তমানে সিসমিক হেলথ কন্ডিশন অফ বাংলাদেশ খুব খারাপ এবং অবনতির দিকে যাচ্ছে; এর মূল কারণ ভারত মহাসাগরে সুমাত্রার নিকট ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪ সালে ৯.৩ মাত্রার অতিকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় যার কারণে বিশাল আকারের সুনামির সৃষ্টি হয়েছিল। যা পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর সমগ্র মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভূমিকম্পের স্থায়িত্বকাল ছিল দশ মিনিট যা ল-ভ- করে দেয় এই অঞ্চলের সিসমিক ইকুয়েলিব্রিয়াম কন্ডিশন এবং এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরেও এসে পড়ে। বাংলাদেশে এই ভূমিকম্পের প্রভাবে অনেক ডরমেন্ট ফল্ট লাইন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মানে হচ্ছে  যেখানে রেকর্ডেড ইতিহাসে ভূমিকম্পের এপিসেন্টার ছিল না এখন সেখানে সেটা অবস্থান করছে। আবার এটাও ঠিক যে কিছু কিছু রেগুলোর ফল্টলাইন আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। উদাহরণ স্বরূপ মধুপুর ফল্টলাইন, চট্টগ্রামের অনেক ফল্টলাইন ইত্যাদির কথা বলা যায়। অন্যদিকে ডাউকি ফল্ট লাইন ধীরে ধীরে সেগমেন্টেড হয়ে যাচ্ছে ভেরিএ্যবেল নর্থ-ইস্ট গতির জন্য ফল্টলাইন বরাবর। হয়তো এটা ডরমেন্ট হয়ে যাবে। অতএব এখন আসল কথাতে আসা যাক, সেটা হচ্ছে ভূমিকম্পের প্রকৃতি বর্তমানে ভিন্নরূপ ধারণ করেছে বাংলাদেশের মধ্যে। যার কারণে বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কালে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্প হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ যশোর শহর (৫ আগস্ট, ২০০৬), রাজশাহী শহর (৫ জুলাই, ২০০৮), ময়মনসিংহ শহরের নিকট পরপর দুটি ভূমিকম্প (২৬ জুলাই, ২০০৮) এবং মধুপুর ফল্টলাইনে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সালে বিকেল ৫-১৫ মিনিট থেকে মাত্র ১২টা পর্যন্ত ৮-১০ বার ভূমিকম্প হয়েছে। দিনাজপুরের ভূমিকম্প (২০ মে, ২০০৮) এবং কুমিল্লা দক্ষিণে চৌদ্দগ্রামের ভূমিকম্প যা ৩ কি.মি. ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে। আবার রাখাইন ফল্টলাইনের কারণে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল এবং খুলনার সিসমিক হেজারড অনেক বেড়ে গিয়েছে। রাখাইন, ফল্টলাইনে ৭.৫ থেকে ৮.৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেটা ১৭৬২ সালের মতো সুনামি সৃষ্টি করতে পারে। তাই এপিসেন্টার থেকে দূরত্বভেদে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল এবং খুলনা অঞ্চলে ভূমিকম্পের তীব্রতা হতে পারে ৯ থেকে ৭ মাত্রা এম.এম.আই. স্কেলে। তাহলে ভূমিকম্প প্রতিরোধক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পিজিএ-এর মান একদম পাল্টে যাচ্ছে। যার সঙ্গে বিএনবিসি ৯৩ এবং সিসমিক জোনেশন ম্যাপের কোনো মিল নাই। তাহলে কী করতে হবে এখন? মধুপুর ফল্টলাইন প্রায় ১০০ কি.মি. লম্বা এখানে ৬.৫ থেকে ৭.৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হতে পারে যা ১৫০ কি.মি. রেডিআস-এর মধ্যে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। ঢাকা শহরের আধুনিক ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ৭ এমএমআই স্কেল ধরে বিএনবিসি ৯৩ কোড অনুসরণ করে। বলে রাখা ভালো যে জিওমেট্রিক করোলারি অনুযায়ী একটিভ বা ডরমেন্ট ফল্টলাইন রয়েছে তা এখন পুরোপুরিভাবে এ্যাকটিভ অবস্থাতে আছে। যা বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটাতে পারে, যা বিএনবিসি ৯৩ কোডের সিসমিক চেপ্টারের সঙ্গে মোটেই মিলছে না। এই সমস্ত অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্পগুলোকে কোয়েক মাইন হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে যা অনেকটা ল্যান্ডমাইনের মতো; যেগুলো সিসমিক ইকুইলিবেরিয়াম কন্ডিশন নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সিসমিক এক্সটার্নাল ফোর্স বা এস্ট্রেস ট্রান্সফার এর কারণে এক্সপোড করতে পারে যার বহিঃপ্রকাশ লোকাল বা রিজিওনাল ভূমিকম্প। বাংলাদেশে যেহেতু এখানে-সেখানে অবস্থিত কোয়েকমাইন এবং রেগুলার ফল্টলাইনের ওপর এদেশ বসে আছে, ফলে যে কোনো সময়ে যে কোনো মাত্রায় সক্রিয় হতে পারে। সেকারণে ফাউন্ডেশনের সয়েল কন্ডিশনের ওপর নির্ভরশীল ভূমিকম্পের ইনটেনসিটি ধরে ডিজাইন করতে হবে। এ ব্যাপারে আমি বলব যেহেতু আর্থকোয়েক ফিজিক্স প্রোব্যবেলেস্টিক সেহেতু মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি অনুযায়ী অপ্রত্যাশিত মেক্সিমাস ইনটেনসিটি ধরতে হবে যার মাত্রা হচ্ছে ভরাট জমি বা যেখানে আল্টিমেট বেয়ারিং ক্যাপাসিটি চার টন অর্থাৎ চার হাজার কেজি প্রতি বর্গফুট- সেখানে ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ইনটেনসিটি এমএমআই স্কেলে ৯ এবং চারের অধিক ছয় টন থেকে আল্টিমেট বেয়ারিং ক্যাপাসিটি অর্থাৎ ছয় হাজার কেজি প্রতি বর্গফুট সেখানে ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ইনটেনসিটি এমএমআই স্কেলে ৮ ধরে ভূমিকম্প প্রতিরোধক ভবন নির্মাণ করতে হবে। পরিশেষে আমি বলব এই সমস্ত কারণের জন্য বিএমবিসি ৯৩ কোডে বর্ণিত সিসমিক পিজিও মান এবং জোনেশন ম্যাপ বাতিল বলে ঘোষণা করতে হবে। বর্তমানের স্থাপনাগুলো যুগযুগ ধরে টিকে থাকবে, যেমনটা রয়েছে চীনের মহাপ্রাচীর, মিশরের পিরামিড এবং আগ্রার তাজমাহল। এটা করলে বাংলাদেশের নতুন ভবনগুলো সম্ভাব্য সব ধরনের ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারবে এবং যে ভবনগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসাবে নির্মাণ করা হয়নি তা রেটরোফিট করতে হবে যার ফলে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে দেশ, সম্পদ, জান এবং মাল।
ভূমিকম্পের আশু বিপদ ও পরিবেশসম্মত বসবাস : দেশের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সরকারের কাছে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি রোধে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করার বিষয়ে রুল জারি করেছে। একই সাথে উক্ত সরঞ্জামসমূহের তালিকা হাইকোর্ট সমীপে পেশ করতে নির্দেশ দিয়েছে। আবেদনের বিষয়টি কেউ কেউ অভিনব ভাবতে পারেন; তবে এটাও তো সত্যি, সম্প্রতি দেশে সংঘটিত বেশ কটি ভূমিকম্প মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তদুপরি পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে নিকট অতীতে বেশকটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। তাতে জীবন ও সম্পদের প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আধুনিক যোগাযোগ ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে বিশ্বের যে কোনো স্থানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাবলী ঘটলে দ্রুতই তা সবার নজরে আসছে। তাছাড়া আমাদের মানুষ জানতে পারছে অতীতের বিপর্যয়কর বিভিন্ন ভূমিকম্প ও তার প্রভাবসম্পর্কিত বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা, লেখালেখিতে ভূতত্ত্ববিদ, প্রকৌশলীসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সাথে সম্পর্কিত অনেক বিশেষজ্ঞ ও ব্যবস্থাপকগণ নিয়মিতই আমাদের দেশে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির বড়মাপের ভূমিকম্পের জন্য সময় হয়ে গেছে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন। মহানগরী ঢাকাসহ দেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোতে মাঝারী মাপের ভূমিকম্প সংঘটিত হলে কী ভয়াবহ পরিণত হতে পারে তা নিয়ে বিভিন্ন প্রাক্কলন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থা নিয়ে আশংকা প্রবল। এ সাথে দেশের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ-সম্পর্কিত বিধিবিধান ও বিল্ডিং কোড মেনে না চলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার বেহাল দশা মানুষকে আরও বেশি ভাবিত করেছে।
ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকার কয়েকটি বহুতল ভবনের অকস্মাৎ ধসে পড়া বা হেলে যাওয়া, ভবনের ভিতরে আটকে পড়া মানুষের করুণ ও মর্মান্তিক অপমৃত্যু, স্বজনদের আহাজারির জবাবে উদ্ধার সরঞ্জাম ও উদ্ধার তৎপরতার অপ্রতুলতা ও সমন্বয়হীন আসহায়ত্ব মানুষের শংকাকে আরও বাড়িয়েছে। সংগতভাবেই মানুষ জিজ্ঞাসা করে একটি ভবন ভেঙে পড়লেই যদি আমাদের এত ধকল ও অসামর্থ্য স্পষ্ট হলে ওঠে, তাহলে দৈব দুর্বিপাকে মাঝারী বা প্রবল কোনো ভূমিকম্প সংঘটিত হলে আমাদের কী হবে?
অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, বাসস্থান, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও শিল্প কারখানা নির্মাণে আমাদের কার্যকর কোনো উন্নয়ন কৌশল নেই। ফলে কোনো কিছু কারখানায় আগুন লাগলে অসহায়ভাবে দগ্ধ হয় ঐ কারখানা ও তার সন্নিহিত বাসাবাড়ির মানুষ। আবার শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের বর্জ্য অনায়াসে দূষিত করে আমাদের স্কুল, হাসপাতাল, আবাসস্থলের পরিবেশ। রাস্তাঘাট এমনিতেই আমাদের শহরগুলোতে সীমিত; এরই মধ্যে বিদ্যুৎ পানি, গ্যাস সংযোগ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জোড়াতালি দিয়ে নগরজীবন কোনোরকমে চলছে। রাস্তায় পথ চলতে চলতে তাই হঠাৎ দেখা যায রাস্তার নীচে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বা ত্রুটিপূর্ণ সুয়েজ লাইন ভেঙে অচলাবস্থা তৈরি হয় প্রায় নিয়মিত। হঠাৎ কোনো গ্যাস পাইপলাইন ফুটো হয়ে প্রধান সড়কে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আগুন। বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলন্ত ট্রান্সফরমারে কাক বা বাদুর বসে বিকট শব্দে নিয়মিত বিস্ফোরণ ঘটায়, যার পরিণতিতে সন্নিহিত এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে অন্ধকার হয়ে পড়ে। মহানগরীর মাত্র কয়েকটি ফ্লাইওভার, ওভারব্রিজ রাস্তায় গাড়ির চাপ কমানোর বদলে প্রায়শ শহরে বিরক্তিকর যানজট লাগিয়ে রাখে। এ রকম শহরে যানজট কমানোর বদলে প্রায়শ শহরে বিরক্তিকর যানজট লাগিয়ে রাখে। এ রকম শহর বা জনপদের বাসিন্দারা ভূমিকম্পের আঘাতে দেশে কী অচলাবস্থা দেখবে তা নিয়ে আতংকিত বোধ করলে তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। এ কথা সত্যি, আমাদের সম্পদ সীমিত এবং তার চেয়েও সীমিত যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহারের সামর্থ্য ও সংস্কৃতি। প্রচুর সম্পদশালী দেশগুলোই ভূমিকম্পের মতো ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রস্তুতির জন্য ব্যাপক সম্পদ বরাদ্দ রাখতে পারে না। তদুপরি আমাদের সাধারণ প্রবণতার কারণেই সামান্য সম্পদ নিয়ে এক ধরনের কাড়াকাড়ি লেগেই থাকে। ফলে ভূমিকম্পের মতো অনির্দিষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যা ভূমিকম্পের আঘাত এলে তা থেকে উদ্ধারের আয়োজন প্রায়শই তাই আলোচনার মধ্যেই সীমিত থাকে।
সাধারণভাবে বলা হয়, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ‘স্ট্রাকচারাল ও নন-স্ট্রাকচারাল’ প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে স্ট্রাকচারাল প্রশমন ব্যবস্থা বলতে প্রধানত নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবার ঝুঁকির মুখে যা কিছু ভৌতিক স্থাপনা রয়েছে সেগুলোর উন্নয়ন, সুনির্দিষ্ট আইন ও কোড মেনে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে যে অঞ্চলগুলো রয়েছে সেখানে আশ্রয়স্থল নির্মাণ, পূর্তবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের মাঝে ভূমিকম্প ঝুঁকি ও তা প্রশমন বা ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করবার জন্য করণীয় সম্পর্কে সচেতনা, স্পষ্টতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজকর্মে সমন্বয় সাধন ও সামর্থ্য সৃষ্টি করা প্রয়োজনীয়।
অপর দিকে নন-স্ট্রাকচারাল প্রশমন ব্যবস্থার অধীনে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেনতা সৃষ্টি, প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের উন্নয়ন ও কমিউনিটিকে সাথে নিয়ে ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট নীতি ও কর্মকৌশলকে বোঝানো হয়।
ভূমিকম্পের পূর্ণাঙ্গ ও আগাম নির্ভুল পূর্বাভাস দেবার মতো প্রস্তুতি এখনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের দেয়নি। তবে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভৌতিক নির্মাণকাজ সমন্বিতভাবে করা, সুনির্দিষ্ট বিল্ডিং কোড মেনে চলা ও গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় দুর্ঘটনা প্রশমন ও দ্রুত দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ