বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

প্রতিনিয়ত লোকসানের মুখে বন্ধ হওয়ার উপক্রম

এইচ এম আকতার: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক জীবনমান উন্নয়নে ২০১২ সালে ১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সীমান্ত হাট। স্থানীয়দের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিপণনের জন্য স্থাপিত হলেও প্রতিনিয়ত লোকসানের মুখে তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। সীমান্ত হাটের জন্য ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। তিন বছরমেয়াদি এমওইউর মেয়াদ পেরিয়ে গেছে ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর । এরপর থেকে চুক্তি ছাড়াই চলছে দুই দেশের মধ্যকার চারটি বর্ডার হাট। প্রধানমন্ত্রীর আগামী মাসে ভারত সফরের সময় স্মারক পুনঃস্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে হাট চালুর পর থেকে কয়েক দফা প্রচার চালানো হলেও নানা জটিলতায় তাতে জনগণের সাড়া মেলেনি। ফলে সেখানে পণ্য কেনাবেচা হয় অনেক কম। বরং বর্ডার হাটগুলোর পরিচালনা ব্যয় এর লেনদেনের চেয়ে বেশি। এতে হাটগুলো পরিচালনা থেকে লোকসান গুনছে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায়ও বর্ডার হাটের মেয়াদ বাড়াতে আবারও এমওইউ সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিন বছরের জন্য বর্ডার হাট স্থাপনে এমওইউ সই হয়। এতে বলা হয়, দুই দেশের সরকারের সম্মতিতে এর মেয়াদ বৃদ্ধি বা সংশোধন করা যাবে। পরে ২০১২ সালের ১৫ মে এমওইউর কয়েকটি ধারা সংশোধন করা হয়। তবে মেয়াদ বৃদ্ধির শর্তে পরিবর্তন আনা হয়নি। এতে প্রায় তিন বছর তিন মাস আগেই বর্ডার হাট সংশ্লিষ্ট এমওইউটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
গত আগস্টের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা কমিটির  বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে।  বৈঠকে জানানো হয়, চারটি বর্ডার হাট বর্তমানে চলমান। আরও দুটি নতুন বর্ডার হাট স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া ত্রিপুরা ও মেঘালয় সীমান্তে আরও চারটি বর্ডার হাট স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বর্ডার হাটের এমওইউর মেয়াদ ২০১৩ সালের অক্টোবরে শেষ হয়ে গেছে। এটি সংশোধনে ২০১৫ সালের অক্টোবরে খসড়া এমওইউ ভারতে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে এখনও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি বর্ডার হাটের এমওইউ সংশোধন প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে ভারত। গত ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা কমিটির  বৈঠকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। এতে বলা হয়, ভারত সরকার বর্ডার হাটের সংশোধিত এমওইউ অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর আগামী মাসে ভারত সফরের সময় এটি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, এমওইউর মেয়াদ শেষ হলেও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চারটি বর্ডার হাট চালু রয়েছে। এটিকে জনপ্রিয় করতে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য সংশোধিত এমওইউ অনুমোদন করেছে দুই দেশের সরকার। আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এটি সই হবে।
তিনি আরও বলেন, এমওইউটি বার বার সইয়ে জটিলতা এড়াতে নতুন চুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় নবায়ন সংক্রান্ত ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ের পর দুই দেশের অনুমোদনের ভিত্তিতে এর মেয়াদ বাড়বে। এছাড়া বর্ডার হাটে লেনদেন বাড়ানো ও জনপ্রিয় করতে আরও কিছু ধারা যুক্ত হবে।
উল্লেখ্য, কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার বালিয়ামারী ও ভারতের পশ্চিম গারো হিলের কালাইয়েরচর এলাকায় প্রথম বর্ডার হাট স্থাপন করা হয়। এরপর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলোরা ও ভারতের পূর্ব খাসি হিলের বালাত সীমান্তে, ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পূর্ব মধগ্রাম-ছয়ঘরিয়ার মধ্যবর্তী ও ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার শ্রীনগর সীমান্তে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তারাপুর ও ভারতের পশ্চিম ত্রিপুরার কমলাসাগর সীমান্তে বসানো হয় বর্ডার হাট।
তথ্যমতে, বর্ডার হাটকে আরও কার্যকর করতে কয়েকটি বিধান সংশোধিত এমওইউতে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য ক্রয়ের সীমা বাড়ানো। ২০১০ সালের এমওইউ অনুযায়ী প্রত্যেক ক্রেতা সর্বোচ্চ ৫০ ডলারের পণ্য কিনতে পারতেন। ২০১২ সালের সংশোধিত এমওইউতে তা বাড়িয়ে ১০০ ডলার করা হয়। এটিকে ২০০ ডলারে উন্নীত করার শর্ত রাখা হয়েছে নতুন এমওইউতে। এছাড়া বর্ডার হাটে বর্তমানে দুই দেশের অধিবাসীরা  তৈরি পোশাক, মেলামাইন ক্রোকারিজ, ফলের জুস ও টয়লেট্রিজ জাতীয় শিল্পপণ্য ছাড়াও স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন কৃষিজাত পণ্য, তাজা ও শুঁটকি মাছ, ডেইরি বা পোলট্রি পণ্য, কাঠ ও বেতের তৈরি পণ্য এবং হস্তশিল্পজাত পণ্য কেনাবেচা করতে পারবেন। নতুন চুক্তিতেও এসব পণ্য কেনাবেচার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কিছু পণ্য যুক্ত হবে এ তালিকায়।
সীমান্ত হাটে বর্তমানে প্রতি দেশের ২৫ জন করে বিক্রেতা পণ্য বিক্রি করতে পারেন। এই সংখ্যাও বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করা হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে বর্ডার হাটের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের লোকজন কেনাবেচায় অংশ নিতে পারেন। নতুন এমওইউতে এটি বাড়িয়ে ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের লোকজনকে কেনাবেচার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে ৪ জানুয়ারির  বৈঠকে আরও জানানো হয়, বর্তমানে বর্ডার হাটে লেনদেনের পরিমাণ এর পরিচালনা ব্যয়ের চেয়েও অনেক কম। তাই বর্ডার হাটে লেনদেন কীভাবে বাড়ানো যায়, এর পরিচালনাকে কীভাবে আরও দক্ষ করা যায় এবং আমদানি করা পণ্য বেচাকেনার ব্যবস্থা করা যায় কি-না, সে বিষয়টি তদারকি করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্ডার হাটের বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এজন্য হাটে লেনদেনের পরিমাণ অনেক কম। তবে মুনাফার জন্য বর্ডার হাট পরিচালনা করা হয় না। বর্ডার হাটকে জনপ্রিয় করতে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এমওইউতে এগুলো যুক্ত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ