বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

২০১৮ সালের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও সরবরাহ অনিশ্চিত

কামাল উদ্দিন সুমন : গ্যাস সংকট নিরসনের কথা মাথায় রেখে ২০১৮ সালের মার্চ মাসের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের কথা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে অনেকে ঢাক ঢোল পেঠানো হয়। কিন্তু চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে নির্দিষ্ট সময়ে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং সরবরাহ।
কারণ হিসেবে জানা গেছে, এখনো গ্যাস টার্মিনাল, স্টোরেজ ও পাইপলাইন নির্মাণসহ প্রধান কাজের কিছুই হয়নি। এছাড়া এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ঠিকাদারের সাথে চুক্তি করা হয় ৫ বছর পর। অথচ দেশে তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের লক্ষ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১০ সালে।
সূত্র মতে এর পাঁচ বছর পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছে ২০১৬ সালের মার্চে। টার্মিনাল নির্মাণে আর কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ২০১৮ সালের মধ্যে এ টার্মিনাল নির্মাণ ও এলএনজি সরবরাহ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকতা মনে করেন, এলএনজি সরবরাহ ২০১৮ সালের মধ্যে সম্ভব নয়। সরকার ২০১৮ সালে এলএনজি দেয়ার কথা বললেও, তা আসলে সম্ভব হবে না। কারণ গ্যাস টার্মিনাল, স্টোরেজ ও পাইপলাইন নির্মাণসহ প্রধান কাজের কিছুই এখনো হয়নি।
তবে একথার সাথে একমত নয় পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি সেল) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের মতে, এরই মধ্যে একসিলারেট এনার্জি জিও-ফিজিক্যাল ও টেকনিক্যাল স্টাডি শেষ করেছে। আমাদের সময়সীমা অনুযায়ী কাজ করছে তারা। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এফএসআরইউ প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদন শুরু হবে।
জ্বালানিী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চারটি প্রধান ধাপ রয়েছে। গ্যাস সঞ্চালন প্রক্রিয়া, তরলীকরণ প্রক্রিয়া, স্টোরেজ প্রক্রিয়া এবং বিতরণ-পরিবহন ও রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া। মহেশখালী প্রকল্পে এখন পর্যন্ত এসব কাজ শুরুই হয়নি। সম্প্রতি শুধু জিও-ফিজিক্যাল ও জিও-টেকনিক্যাল স্টাডি শেষ হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, এফএসআরইউ তথা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে তিন বছরের মতো সময় লাগে।
সূত্র জানায়, কয়েক বছর ধরেই শিল্প-কারখানাগুলোয় চলছে গ্যাস সংকট। দেশের শিল্প খাতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানাতেই উৎপাদন ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নতুন শিল্প-কারখানার অনেকগুলোতেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সরকার ঘোষিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোও গ্যাস সংকটে থমকে আছে। এ সংকট সমাধানের জন্য সরকারের ওপর অনেক দিন থেকেই চাপ দিয়ে আসছেন শিল্প মালিকরা।
সূত্র জানায়, গ্যাস সংকট সমাধানের জন্য মহেশখালীতে নির্মীয়মাণ টার্মিনাল থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এলএনজি আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পরে তা বদলে আগামী ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালে এলএনজি চালু হলে এ সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে দাবি করছে জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু বাস্তাবে দেশের প্রথম এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি। ফলে জ্বালানির জন্য শিল্প-কারখানার মালিকদের অপেক্ষা আরো দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ও আবাসিক খাত মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে গ্যাসের বিদ্যমান চাহিদা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। নতুন কোনো গ্যাসকূপের সন্ধান না পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভর এলএনজির ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। এজন্য ২০১০ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করে সরকার। আর গত বছরের ৩১ মার্চ পেট্রোবাংলা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের একসিলারেট এনার্জি লিমিটেডের মধ্যে ১৫ বছরের জন্য প্রাথমিক ‘টার্ম শিট এগ্রিমেন্ট’ হয়। কোম্পানিটির সঙ্গে এ-বিষয়ক চূড়ান্ত চুক্তিটি হয় গত বছরের ১৮ জুলাই।
চুক্তি অনুযায়ী, টার্মিনালটি হবে প্রায় ১ লাখ ৩৮ ঘনমিটার এলএনজি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। আর ১৮ মাস বা দেড় বছরের মধ্যে টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শেষ করা হবে বলে সে সময় জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সূত্র জানায়, প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। কাতার কিংবা অন্য কোনো দেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারদরে এ গ্যাস আনা হবে। এ গ্যাস আনতে টার্মিনাল ভাড়া হিসেবে বছরে প্রায় ৯ কোটি ডলার দিতে হবে বাংলাদেশকে। এর সঙ্গে যোগ হবে ৩ শতাংশ এআইটি ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে আমদানিকৃত গ্যাসের দাম পড়বে বর্তমান বাজারদরে ১৪৮ কোটি ডলার। সব মিলে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম পড়বে গড়ে ৮ ডলার করে।
জাইকার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রথম এ এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে মোট চাহিদার ১৭ শতাংশ পূরণ হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাসের ৪০ শতাংশ, ২০২৮ সালে ৫০ শতাংশ ও ২০৪১ সালে ৭০ শতাংশ এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ