বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সঙ্কটের দুই চেহারা

সমাজে ও রাজনীতিতে যখন সঙ্কট নেমে আসে তখন দুটি পরস্পর-বিরোধী পরিস্থিতি দেখা যায়। সঙ্কটের দুইটি চেহারা ভেসে আসে। একদিকে সঙ্কটে আপতিত মানুষের প্রতি জুলুম আর অন্যদিকে সঙ্কট থেকে ফায়দা হাসিলকারীদের নগ্ন উন্মত্ততা ও উল্লাস। একদিকে দাপট ও চাপ আর অন্যদিকে পক্ষপাত ও ফায়দা লুণ্ঠন। ইতিহাসের পর্বে পর্বে এবং এখনো সঙ্কটের কবলে একপক্ষকে নিষ্পেষিত হতে দেখি। আর আরেক পক্ষকে ফুলে-ফেঁপে ওঠতে দেখা যায়। এটাই চলছে ঐতিহাসিকভাবে। ইতিহাসের দিকে তাকালেও সেটাই দেখা যায়।
১৮৫৭। সিপাহি বিদ্রোহে গোটা দেশ উত্তাল, দিল্লিতে দাঙ্গার আগুন ছড়িয়েছে হু হু করে। কারফিউ চলছে। নিজের উঠোনে বসে মনখারাপের প্রহর গুনছেন  মির্জা আসাদুল্লাহ গালিব, কবি। এ কোন দিল্লি? এ কেমন ভারতবর্ষ? যাও বা সংসারে সামান্য টাকা এল, প্রিয় শহরটা ছারখার হয়ে গেল চোখের সামনে। লুটপাট, হত্যা, নির্যাতন চলছেই। ইংরেজ সৈন্যরা প্রকাশ্যে গুলী করে মারছে মুঘল রাজপ্রাসাদের শিশু, বৃদ্ধ, নারীদের। চরম অরাজকতায় ছেয়ে গেল দিল্লি এবং পুরো দেশ।
সিপাহি বিদ্রোহ  মির্জার কাছ থেকে কেড়ে নিল অনেক কিছু। বেখেয়ালে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়া ভাই ইউসুফ নিহত হলেন ব্রিটিশ পেয়াদার গুলীতে। সারাজীবনের বন্ধু হাজি মীরকে হত্যা করে গাছে টাঙিয়ে দিল হিন্দুরা, জ্বালিয়ে দিল তাঁর বইয়ের দোকান। অগুনতি বইয়ের সঙ্গে চিরকালের মতো ছাই হয়ে গেল  মির্জার বহু শের ও কবিতা, যা হাজি নিজের হাতে লিখে রাখতেন রোজ। লখনউ-এর নবাব, সুকবি ওয়াজিদ আলি শাহকে গৃহবন্দি করে রাখা হল কলকাতার মেটিয়াব্রুজে। দিল্লি ছাড়তে বাধ্য হলেন বাহাদুর শাহ জাফর, শেষমেশ তাঁর করুণ মৃত্যু হল।
আরো একবার কলম তুলে নিলেন  মির্জা। লিখলেন, ‘হুই মুদ্দত কে গালিব মর গয়া পর ইয়াদ আতা হ্যায় / উও হর এক বাত পর কহেনা কে ইউঁ হোতা তো ক্যা হোতা...’ সম্ভবত তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, আর এক বছর পর দিল্লির গলি কাসিম-এর দীর্ঘশ্বাস সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামবে তাঁর জানাজা। পুরো দেশ শশ্মানে পরিণত হবে। প্রতিষ্ঠিতরা নিপীড়ত হবেন। সম্মান, জীবন, সম্পদ ভূলুণ্ঠিত হবে।  এই হলো সঙ্কটের একদিক। অন্যদিকে দেখা যায়, সঙ্কট থেকে ফায়দা নিয়ে আরেক দল ভোগ-বিলাস ও উন্মত্ততায় মত্ত। নিজের ভাগ্য বদলের জন্য তৎপর। রক্ত ও মৃত্যু কিংবা জাতীয় বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করছে না।
১৮৫৭ সালেই দিল্লি ও ভারতবর্ষ যখন ইংরেজের নগ্ন হামলায় রক্তাক্ত এবং দেশপ্রেমিক বিপ্লবীরা হয় ফাঁসিতে নয় কারাগারে কিংবা গুলীতে আক্রান্ত, তখন কলকাতায় উৎসব হচ্ছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানানো হচ্ছে। ইংরেজের জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছে। মুসলমান শাসনের অবসানে হর্ষ ও আনন্দ ধ্বনিত হচ্ছে। এমনটিই হয়েছিল ১৭৫৭ সালের সঙ্কটে। দেশপ্রেমিক স¤্রাট সিরাজের মৃতদেহ পথে ফেলে জগৎশেঠ, রায়বল্লভরা উল্লাস করেছে। পূজা দিয়েছে দখলদার হায়েনা ইংরেজদের মঙ্গল কামনা করে। রামমোহন রায় মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে রাজা উপাধি নিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে ফারসি ভাষা বদল করে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য দেন-দরবার করেছেন। যার ফলে আরবি-ফারসি শিক্ষিত মুসলমান শ্রেণি বেকার হয়ে যায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগররা ফোর্ট উইলিয়ামে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা চালু করে স্বজাতিতে শিক্ষিত ও সরকারি চাকরির উপযুক্ত করেছে। যদুনাথ সরকারের মতো ঐতিহাসিক সাফাই গেয়েছেন যে, ভারতে ইংরেজরা আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে। বাংলার নবজাগরণের নামে হিন্দু  নবজাগরণ ও ভারতীয় পুনরুজ্জীবনবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
পুরো ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সঙ্কটের ফলে একদল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরেক দল লালে-লাল হয়ে গেছে। পাকিস্তান আমলেও দেখা গেছে, আমলা ও সেনাপতিদের সৃষ্ট সমস্যার ফায়দা লুটেছে একদল ফেরেববাজ। মোসাহেবী করে ধন, দৌলত, মাল কামাই করেছে একদল সুবিধাবাদী। আর আদর্শ নিয়ে যারা চলেছেন, তাদেরকে পদে পদে নিগৃহীত হতে হয়েছে। আদশের্র প্রশ্নে লড়াইকারীরা আক্রান্ত হয়েছে আর ধান্ধাবাজরা রঙ বদলিয়েই বহাল তবিয়তে রয়ে যায়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট। যুদ্ধোত্তর একটি সমাজ বিপর্যস্ত হয় বহুবিধ সমস্যা ও সঙ্কটে। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়। সে সময়েও লুটপাট, বাড়ি দখল করে একদল পাষ- লালে লাল হয়েছিল। মানুষের কষ্ট, সমস্যা, সঙ্কট তাদেরকে দমাতে পারে নি; জাগাতে পারে নি মানবিকতার বোধ। পাকিস্তান আমলের বাইশ পরিবারের মতো শত শত নব্য, লুটেরা ধনী চারপাশে গিজগিজ করতে থাকে। পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে খাবলে খেয়ে নাস্তানাবুদ করার সেই প্রেক্ষাপটেও দেখা যায় বহু দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী ও সাচ্চা মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন; বিপন্ন হয়েছেন; কষ্ট করেছেন।
অতএব সমস্যা বা সঙ্কটের দুটি চেহারা থাকবেই। সেটা অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানে যেমন রয়েছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। একটি সঙ্কট বা সমস্যার প্রতিফল অবশ্যই দ্বিমাত্রিক। কারো জন্য পূর্ণিমা আর কারো জন্য অমাবশ্যা। কারো পৌষ মাস আর কারো সর্বনাশ।
আবার  এ কথাও সত্য যে, সঙ্কট যদি রূপান্তরিত হয় বা বদলে যায়, তবে সুবিধাবাদীরা অসুবিধায় পড়ে। অসুবিধায় থাকা লোকজন সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে। এটাও ঠিক যে, কিয়ামত পর্যন্ত একজন বা একপক্ষ কেবল সুবিধাই পেয়ে যাবে আর আরেক পক্ষ অসুবিধাই ভোগ করবে, এমনিও আশা করা যায় না। ইতিহাসেও এমনটি কখনোই হয় না। পরিস্থিতির বিন্যাস বদলে গেলে বা রাজনৈতিক দাবার চাল উল্টে গেলে খেলা আরেকভাবে শুরু হয়। নিচে চাপা থাকারা তখন উপরে চলে আসে। উপরের গোষ্ঠি নিচে চলে যায়। কেউ কেউ মারাও পড়ে। জেল-হাজতে পচে। উদাহরণ স্বরূপ ইরাকের সাদ্দাম এবং লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা বলা যায়। এই দুই শাসক কখনোই ভাবে নি যে, তাদেরকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হতে হবে। তারা ভেবেছিল, আমৃত্যু তারা ক্ষমতায় থাকবে। সব ব্যবস্থাও পাকা করা হয়েছিল। প্রতিপক্ষকে মেরে, কেটে সাফ করে দেওয়া হয়েছিল। পুরো পরিস্থিতিই ছিল তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। বছরের পর বছর সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে এবং প্রতিপক্ষকে অসুবিধায় রেখেও সাদ্দাম বা গাদ্দাফি বাঁচতে পারে নি। নির্মমভাবে ধ্বংস হয়েছে। তাদের পরিবার-পরিজন তছনছ হয়ে গেছে। দল ও অনুচরবর্গ পালিয়ে গেছে। ইরাকে সাদ্দাম এবং লিবিয়ায় গাদ্দাফির লেশ মাত্রও নেই।
অতএব সঙ্কটের দুটি দিকই জ্বলন্ত সত্যি। একটি সুবিধাগত দিক এবং আরেকটি অসুবিধাগত দিক। প্রশ্ন হলো, কোন দিকটি কখন কার ভাগ্যে আসবে, সেটা আগাম জানা যায় না। এবং কোনো দিকই চিরস্থায়ীভাবে কারো ভাগ্যে থাকে না। আলো ও আঁধারের মতো, কালো ও সাদার মতো দুটি দিকই পাশাপাশি আছে। সুবিধাজনক দিকের মানুষেরা যেমন অসুবিধার দিকে আসতে পারে; তেমনি অসুবিধার মধ্যে যারা আছে, তারাও সুবিধাজনক পর্যায়ে চলে আসতে পারে। কারোরই চির আনন্দিত এবং কারোরই চির হতাশ হওয়ার সুযোগ এক্ষেত্রে নেই। কারণ, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
এতোসব কথা কেন বলা হলো ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসাবে? বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে উপরের আলোচনার সম্পর্ক কি? উত্তর হিসাবে অধিক না বলাই ভালো। কারা সুবিধার পাহাড়ে চড়ে বসছে এবং কাদেরকে অসুবিধার গভীর খাদে ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেটাও উল্লেখের দরকার পড়ে না। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সকলেই ওয়াকিবহাল। কে কেমন পরিস্থিতিতে রয়েছে, সেটাও সকলেরই জানা। গত কয়দিন আগে অতিক্রান্ত ১/১১-এর পর কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, তার মূল্যায়ন করা হলে পুরো বিষয়টিই সবার সামনে স্পষ্ট হবে। ১/১১ বাংলাদেশে একটি সঙ্কট নিয়ে এসেছে। সঙ্কট দূর করার কথা বললেও সঙ্কট শেষ হয় নি। গণতন্ত্র, নির্বাচন, সুশাসন, আইন-শৃঙ্খলাসহ সর্বক্ষেত্রে প্রকটিত সে সঙ্কটের চিহ্ন সকলেরই চোখে পড়ছে। কারা সুবিধা পাচ্ছে আর কারা বিপন্ন হচ্ছে, সেটাও লুকানো কোনো বিষয় নয়। পরিস্থিতির বেশ কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও অবস্থা মোটেও বদলায় নি। চমৎকার একটি মূল্যায়ন করেছেন বাংলাদেশের প্রবীণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমদ। বলেছেন: “রাজনীতি ১/১১-এর পথ ধরেই চলছে।” তাঁর বক্তব্য সামনে রাখলে সঙ্কটের বিদ্যমান দুইটি চেহারা দেখতে আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ