মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে করার নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার : নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধি গেজেট প্রকাশে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করেছেন আপিল বিভাগ। এসময়ের মধ্যে বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধির গেজেট জারি করে আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এটর্নি জেনারেলকে।

গেজেট প্রকাশে সরকার আরো এক মাস সময় চাইলে গতকাল রোববার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্ব আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ দিন নির্ধারণ করেন।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে সকাল ৯টায় পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করে আদালতে শুনানিতে হাজির হওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। কিন্তু গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গেজেট না নিয়েই আপিল বিভাগে হাজির হন। আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে তিনি গেজেট জারির জন্য আরো এক মাস মৌখিকভাবে সময় প্রার্থনা করেন। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আমরা আপনার মুখে হাসি দেখতে পাচ্ছি। এই হাসি আনন্দের নাকি কষ্টের? আমাদের মনে হয়, এটি কষ্টের হাসি।

আদালত বলেন, আপনি মৌখিকভাবে সময় প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু কোনো লিখিত আবেদন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আবেদনে কী লিখব, বুঝতে পারছি না। আদালত বলেন, সরকার আপনাকে কী উপদেশ দিয়েছে, সেটা তো আমরা বলতে পারব না। আর মৌখিকভাবে যে সময় চেয়েছেন, এটি মঞ্জুর করা যাবে না। লিখিত সময় আবেদন নিয়ে আসুন। আমরা বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট বিষয়ে কোনো ছাড় দেব না। এরপর বিরতির পর সকাল সাড়ে ১১টায় এটর্নি জেনারেল লিখিতভাবে সময় আবেদন আদালতে দাখিল করেন। পরে আদালত সময় আবেদন মঞ্জুর করে পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

পরে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, গেজেট প্রকাশের বিষয়ে আইনমন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে একটু সমঝোতা হলেই সমস্যা কেটে যাবে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি মালা তৈরি নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অচলাবস্থা কিভাবে কাটানো যায় সে জন্যেই আদালতের কাছে আমি আরও চার সপ্তাহের সময় আবেদন করেছিলাম, আদালত তিন সপ্তাহের সময় দিয়েছেন। আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি এটি আবার কার্য তালিকায় আসবে।

সময় আবেদনের কারণ কি উল্লেখ করা হয়েছে জানতে চাইলে এটর্নি জেনারেল বলেন, অচলাবস্থা নিরসনে এই সময় আবেদন করা হয়েছে। আমি বলেছি সমস্যা সমাধানের (রিজলভ দ্য প্রবলেম) জন্য আবেদনটি করা হয়েছে। এই অচালবস্থা নিরসনে গেজেট প্রকাশই কি একমাত্র সমাধান এমন প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, গেজেট তো প্রকাশ করতেই হবে। তার কারণ আমাদের দেশে চাকরির বিষয়ে সমস্ত বিভাগে রুলস-রেগুলেশন আছে। সেখানে নিম্ন আদালতের বিচারকদের থাকবে না, যেখানে মাসদার হোসেন মামলার পরে বিচার বিভাগের অফিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি আলাদা হয়ে গেছে। এ অবস্থায় তাদের জন্য আলাদা রুলস তো লাগবেই। তাদের জন্য আলাদা গেজেট করতে হবে।

এটি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে চান এবং এই দুই চাওয়ার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেই পার্থক্য কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সেটিই এখন আমাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পার্থক্যটা হলো, আইন মন্ত্রণালয় যেভাবে চেয়েছিলেন আমাদের সুপ্রিম কোর্ট তাতে কিছু যোগ করেছিলেন। সেই সংযুক্তিতে (অ্যাডিশনে) নিম্ন আদলতের বিচারকদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা তাদের চাকরির বিভিন্ন বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান রাখা হয়েছে এবং এটি বিস্তারিত বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে বলা যাবে না। চাওয়ার এই পার্থক্যের কারণে নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে কোনো টানাপোড়েনের সৃষ্টি হবে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, না, কোনো টানাপোড়েন সৃষ্টি হবে না। আইন মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে এ বিষয়ে একটু সমঝোতা হলেই তা কেটে যাবে।

বিচারকদের চাকরি ও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ করতে কয়েকবার সময় দেয়ার পরও সরকার গেজেট প্রকাশ না করায় গত ৮ ডিসেম্বর দুই সচিবকে ১২ ডিসেম্বর তলব করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। দুই সচিব হাজির হয়ে আদালতে জানান, নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধির গেজেট আকারে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। পরে শুনানি শেষে গেজেট প্রকাশের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেয় আপিল বিভাগ। এর ধারাবহিকতায় বিষয়টির ওপর শুনানি হয় গতকাল।

১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মাসদার হোসেন মামলার চূড়ান্ত রায়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করতে নির্দেশ দেন। ওই রায়ে আপিল বিভাগ বিসিএস (বিচার) ক্যাডারকে সংবিধান পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করে। একইসঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করা হয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত।

রায়ের পর ২০০৭ সালের ১ নবেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। আপিল বিভাগের নির্দেশনার পর গত বছরের ৭ মে আইন মন্ত্রণালয় নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়। সরকারের খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ হওয়ায় তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী বলে গত ২৮ আগস্ট শুনানিতে মন্তব্য করেন আপিল বিভাগ। এরপর ওই খসড়া সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। একইসঙ্গে তা চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন আকারে আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয় আইন মন্ত্রণালয়কে। এরপর দফায় দফায় সময় চাওয়া হলেও গেজেট আর প্রকাশ হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ