মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ছয় বছরেও সম্পত্তি ফিরে  পাননি মুন সিনেমার মালিক

নাজমুল আহসান রাজু : যে মুন সিনেমা হলের জমি ফিরে পেতে করা মামলায় সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলো সে মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি গত ছয় বছরেও ফেরত পাওয়া যায়নি। সম্পত্তি ফিরে পেতে পুনরায় আইনি লড়াই করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। জমি ফিরে পেতে করা আদালত অবমাননা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মুন সিনেমা হলের জমি এবং যে স্থাপনা ছিল, তার মূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। একজন প্রকৌশলী দিয়ে এই মূল্য নির্ধারণ করে ছয় সপ্তাহের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে সরকারের এটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গতকাল রোববার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন-বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। এ সংক্রান্ত আদালত অবমাননার মামলা আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ৫ নম্বর ক্রমিকে ছিল। 

পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পাশাপাশি আদালতের রায়ের ৯০ দিনের মধ্যে পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকার মুন সিনেমা হল মূল মালিককে ফেরত দেয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু ছয় বছরেও সর্বোচ্চ আদালতের এ রায় বাস্তাবায়ন করা হয়নি। মুন সিনেমা হলের জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন।

২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটি এম ফজলে কবির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখেন। পাশাপাশি মুন সিনেমা হল ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডকে ফেরত দিতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন। ২০১১ সালের মার্চ মাসে এ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায় সরকার। ওই রায়ে মুন সিনেমা হল ফেরতে সরকারকে তিন মাস সময় দেয়া হয়। রায়ের পর পরই এর আলোকে ২০১১ সালের জুন মাসে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। কিন্তু রায়ের পর ছয় বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও মুন সিনেমা হল বুঝে পানিন মালিক। 

জানা গেছে, পুরাতন ঢাকার ওয়াইজঘাটের মুন সিনেমা হলের জায়গায় তৈরি হয়েছে মুন কমপ্লেক্স। একদিকে মুন কমপ্লেক্স নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডেভেলপার কোম্পানি বাবুলী কন্সট্রাকশন লিমিটেডের পাওনা বুঝিয়ে না দেয়ায় দায়িত্ব হস্তান্তর না করা। 

২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে মাকসুদুল আলম সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেন। এতে বলা হয়, আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই সম্পত্তি হস্তাস্তরে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন বিবাদীরা। ওই সম্পত্তির বর্তমান ভোগদখলকারীদের সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। এর পেছনে খোঁড়া সব যুক্তি উপস্থাপন করেছেন বিবাদীরা, যা গুরুতর আদালত অবমাননার শামিল। ফলে রিটকারী সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলার ফল ভোগ করতে পারছেন না। 

জানা যায়, ১৯৬৪ সালে ১১, ওয়াইজঘাট ঠিকানায় মুন সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর আইনি দর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নিয়ে কিছু লোক ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ওই সিনেমা হলের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির এক আদেশ অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ওই সম্পত্তিটি দখলে নিয়ে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সরকার সম্পত্তিটি মুক্তিযোদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে হস্তান্তর করে। এই মুন সিনেমা হল ফেরতের দাবিতে হাইকোর্টে প্রথম রিট হয় ১৯৭৬ সালে।

হাইকোর্ট ১৯৭৭ সালের ১৫ জুন মুন সিনেমা হলকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে জারি করা প্রাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। সিনেমা হলটি ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলে ১৯৯৭ সালের ৭ অক্টোবর মার্শাল ল’ রেগুলেশন জারির মাধ্যমে পরিত্যক্ত সম্পত্তির সম্পূরক বিধান জারি করা হয়। ওই বিধানে হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিল করা হয়। এরপর বেশ কয়েকবার মুন সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ তার সম্পত্তি ফেরত চেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু মার্শাল ল’ রেগুলেশনের সম্পূরক বিধানের কারণে ব্যর্থ হয়।

পরে মার্শাল ল’ রেগুলেশন প্রত্যাহারের দাবিতে কোম্পানিটি ১৯৯৪ সালে হাইকোর্টে আবারও রিট মামলা দায়ের করেন। ১৯৯৪ সালের ৭ জুন হাইকোর্ট এই আবেদনটি খারিজ করে রায় দেন। পরে ২০০০ সালে ৫ম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং মুন সিনেমা হল ফেরতের দাবিতে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করা হয়। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট মুন সিনেমা হলের জায়গায় মুন কমপ্লেক্স তৈরির জন্য ডেভেলপার কোম্পানি বাবুলী কন্সট্রাকশন লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী বাবুলী কন্সট্রাকশন লিমিটেড ৭ তলা ভবন নির্মাণের পর তা সেলামী মূল্যে বিক্রির পর ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করবে। এরপর ট্রাস্ট সেখান থেকে ভাড়া আদায় করবে। চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৭ তলা ভবনের বিশাল কমপ্লেক্স তৈরি করেছে। এই কমপ্লেক্সে প্রায় ১১শ দোকান রয়েছে। 

২০০৫ সালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিএনপি সরকার আপিল করলেও ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, আইনজীবী মুন্সী আহসানুল করিমসহ কয়েকজন মিলে তিনটি পৃথক আবেদন করেছিলেন। তাদের আবেদনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ২০১০ সালে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ২০১১ সালে ওই রায় সরকার পুনর্বিবেচনার আবেদন জানালে কিছুটা সংশোধনসাপেক্ষে আপিল বিভাগ তা বহাল রাখেন এবং মুন সিনেমা হল ফেরত দিতে তিন মাস সময় বেঁধে দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ