বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ নিয়ে মুখোমুখি নগর ভবন-হকার

ঢাকা দক্ষিণ সিটির উদ্যোগে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় উচ্ছেদ করতে গেলে হকার্সরা তাতে বাধা দেয়-সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টনসহ আশপাশের এলাকার সড়ক ও ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পূর্ব ঘোষিত হকার উচ্ছেদ অভিযান গতকাল রোববার থেকে শুরু হয়েছে। ওই সব এলাকার ফুটপাতে দিনের বেলায় বসা হকারদের উচ্ছেদে গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে নিয়ে টানা অভিযান চালিয়েছে ডিএসসিসি। কর্মদিবসে দিনের বেলায় হকার বসতে নিষেধ করা হলেও তা না মানায় এ অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছেন উচ্ছেদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

হকাররা ফুটপাত থেকে উচ্ছেদের এই অভিযানের বিরোধিতা করলেও ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বিকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘হকার উচ্ছেদের ঘোষণা বাস্তবায়নে একচুলও ছাড় দেয়া হবে না। অভিযান অব্যাহত থাকবে। ’ হকার উচ্ছেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে সিটি করপোরেশন। 

এর আগে স্থানীয় কাউন্সিলর, হকার সংগঠনসমূহের নেতা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে গত ১১ জানুয়ারি নগরভবনে এক মতবিনিময় সভা করেন ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। ওই সভার সর্বসম্মতিক্রমে মেয়র ঘোষণা দেন, কর্মদিবসের দিনের বেলায় ফুটপাতে কোনও হকার বসতে পারবে না। গতকাল থেকে এ ঘোষণা কার্যকর করার ঘোষণা ছিল। 

ওই সভার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হকারদের একটি অংশ তাদের অবস্থান নিয়ে বাদ প্রতিবাদ করে আসছিল। কতিপয় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন তাতে সায় দিয়ে বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে চলছিল। গত শনিবার হকারদের পক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করা হয়। তাতে নগর ভবন ঘেরাওর ঘোষণাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলা হয়। এ অবস্থার মধ্যেই মুখোমুখি হয়ে যায় নগর ভবন আর হকাররা। ফলে গতকাল শুরু হওয়া অভিযানের মধ্যে করপোরেশনের যানবাহন ভাংচুর করেছে বিক্ষুব্ধ হকাররা। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিকেলে হকাররা ফের বিক্ষোভ সমাবেশ করে আজ সোমবার নগর ভবন ঘেরাওর ঘোষণা দিয়েছে । 

মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সিটি করপোরেশনের তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই অভিযান শুরু হয়। তারা বায়তুল মোকাররম, দৈনিক বাংলা মোড়, মতিঝিল, দিলকুশা ও পল্টন এলাকায় অভিযান চালান। মতিঝিল থেকে ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে পল্টনের দিকে যায়। বেলা ২টার দিকে পল্টন মোড় এলাকায় হকাররা সিটি করপোরেশনের যানবাহন লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে। এই হামলায় সিটি করপোরেশনের দুটি গাড়ির কাচ ভেঙে গেলেও কেউ আহত হননি। পুলিশ কাউকে আটকও করেনি। অভিযান শেষ করে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ওই এলাকা থেকে চলে যান। উচ্ছেদ অভিযানের সময় পল্টনে আজাদ প্রোডাক্টসের গলিতে ফুটপাতের দোকানও ভেঙে দেয়া হয়। এ সময় ফুটপাতের ওপর দোকানে রাখা ফলমূল নষ্ট হয়। 

ওই ফুটপাতের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মুসলিম অভিযোগ করেন, দিনের বেলায় তার দোকান খোলা ছিল না। তারপরও তা ভেঙে দেয়া হয়েছে। “আমরা তো মেইন রোডে বসি নাই। পাশের গলিতে বইছিলাম। তারপরও বুলডোজার দিয়া আমাগো মালামাল নষ্ট কইরা দিসে। ”

দোকান সরিয়ে নিতে পাঁচ মিনিট সময় চাইলেও সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট তা দেননি বলে অভিযোগ করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাহেব আলী। “মুহূর্তের মইধ্যে সব ভাইঙ্গা দিল। আমাগোরে বলছিল সন্ধ্যার পর দোকান খুলতে। আমরাতো মেয়রের কথা অমান্য করি নাই। তাইলে আমাগো দোকান ভাঙলো ক্যান?”

এর আগে গত ৮ জানুয়ারি নগর ভবনে আরও এক বৈঠক শেষে মেয়র সাঈদ খোকন ঘোষণা দেন, রোববার থেকে সাপ্তাহিক কোনো কর্মদিবসে আর গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় দিনের বেলায় ফুটপাতে হকার বসতে দেয়া হবে না। হকাররা দোকান নিয়ে বসতে পারবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পরে। তবে ছুটির দিনে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। অভিযান শুরুর আগে সকালে গুলিস্তান এলাকার ফুটপাতের দোকান বন্ধ থাকলেও বায়তুল মোকাররম ও জিপিওর সামনের সড়কে ফুটপাতের দোকান খোলা দেখা যায়। 

নিষেধাজ্ঞার পরও কেন দোকান খোলা জানতে চাইলে মিজানুর রহমান নামের এক দোকানি বলেন, “আমরা তিনবেলা খাইতে বসছি। এখন আমাগোরে যদি বলে একবেলা খাইতে, তাহলে ক্যামনে হবে? এইভাবে তো ব্যবসা করা সম্ভব না। ”

মো. হেলাল উদ্দিন নামের আরেক দোকানি বলেন, সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে- তা মতিঝিল বা গুলিস্তান এলাকার জন্য বাস্তবসম্মত নয়। “এইটা অফিস এলাকা। অফিস চলার সময় লোকজন এইখানে কেনাকাটা করে। অফিস ভাঙার পর এইখানে তো কেউ থাকে না। তখন কেনাকাটা করবে কে?”

আরেক দোকানদার ফরিদ আলী বলেন, সিটি করাপেরশন যাই বলুক, ব্যবসা করতে হলে তাদের এভাবেই দোকান চালাতে হবে। “সারাদিনের কাজ আধাবেলায় শেষ করা যায় না। আর এইবার তো আরও কম সময় দেয়া হইছে। আমাদের তো কোনো উপায় নাই। ... তারা উঠাইব, আমরা আবার বসমু। ”

সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা চলে গেলে সেখানে বিক্ষোভ শুরু করেন হকাররা। বাংলাদেশ জাতীয় হকার্স ইউনিয়নের নেতারা সংক্ষিপ্ত সমাবেশও করেন। পুনর্বাসন না করে হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে আজ সোমবার নগর ভবন ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ জাতীয় হকারস ইউনিয়নের উপদেষ্টা মো. হযরত আলী। “হকাররা শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিল। সন্ধ্যার পর দোকান করার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশনের লোকজন কোনো কারণ ছাড়াই তাদের দোকানপাট ভাঙচুর করে। তারা মালামাল লুট করেছে। দোকানদারদের মারপিট করেছে। ম্যাজিস্ট্রেটের পা ধরলেও তিনি শোনেননি।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, “উচ্ছেদের সময় কিছু লোক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। যারা এ কাজ করেছে তাদেরকে ঠিক হকার বলা যাবে না। তারা পাশের গলি থেকে সিটি করপোরেশনের লোকজনকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (পেট্রল) মো. মাজহারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘উচ্ছেদের সময় একটি পক্ষ সমস্যা তৈরি করতে চেয়েছিল। তাদের প্রতিহত করা হয়েছে।’

তবে এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেবাশীষ নাগ। “আমার গাড়িতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা অভিযান শেষ করেছি ঠিক মতোই। আমাদের বহরে অনেকগুলো গাড়ি ছিল। হয়তো পেছনের কোনো গাড়িতে ঢিল ছুড়েছে। ”

গতকাল সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মেয়রের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সকালেই গুলিস্তান, পুরানা পল্টন, জিপিও, মতিঝিল, দিলকুশা এলাকার ফুটপাতে হকার বসে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান শুরু করেন। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মো. নাজমুস শোয়েব। 

উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে মতিঝিল সড়কের দু’ধারে থাকা হকারদের সব স্থাপনা (চৌকি, বাক্স ইত্যাদি) বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে অভিযানের খবর পেয়ে হকাররা আগেই তাদের মালামাল সরিয়ে নিয়ে যান। বেলা ২টায় ২৫ নম্বর দিলকুশায় সাধারণ বীমা সদনের সামনের দেয়াল ভেঙে দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ করেন, এই দেয়ালকে কেন্দ্র করে হকাররা তাদের মালামাল নিয়ে বসে। এই ভবনের পাশে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়েও অনেক হকার বসে। তাই এগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে বলে জানান নাজমুস শোয়েব। 

বেলা আড়াইটায় মতিঝিল জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে নির্মাণাধীন প্যান্ডেল অতিক্রম করার সময় কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান নেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে ফুটপাতের ওই প্যান্ডেল না ভেঙেই দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে চলে যান ভ্রাম্যমাণ আদালত। 

বিকাল পৌনে ৩টায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালান দৈনিক বাংলা-পুরানা পল্টন সড়কে। অভিযানের খেবর পেয়ে হকাররা তাদের বেশিরভাগ মালামাল সরিয়ে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ চত্বরে নিয়ে গেট বন্ধ করে দেয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত এসময় সড়কের একপাশে থাকা হকারদের অবশিষ্ট স্থাপনা ভেঙে দেয়। 

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনে বেশ কয়েকজন হকারের বাঁধার মুখে পড়েন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় এক হকার নেতা রাস্তার ওপর শুয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের পথরোধ করেন। পুলিশ তাকে সরিয়ে দেয়। আরেক হকার এসে বাদানুবাদ শুরু করলে পুলিশ তার ওপর লাঠিচার্জ করে। এতে ওই হকার জ্ঞান হারালে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। 

এ ঘটনার পর পুরানা পল্টন এলাকায় হকাররা উচ্ছেদবিরোধী শ্লোগান দিয়ে মিছিল করে। এক পর্যায়ে তারা সিটি করপোরেশনের বুলডোজার লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়তে থাকে। তখন বুলডোজার দ্রুত স্থান ত্যাগ করে গুলিস্তানের দিকে চলে যায়। এরপর হকাররা পল্টন মোড়ে সড়কে অবস্থান নিয়ে সড়কটি বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে। তবে পুলিশ তাদের হটিয়ে দেয়। 

বিকাল সোয়া ৩টায় পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অফিসের পূর্বপাশে উত্তরা ব্যাংকের (রমনা শাখা) সামনে সমাবেশ করে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন। ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হাশিম কবির হকারদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের নিন্দা জানান। এসময় তিনি আজ সোমবার সকাল ১০টায় নগরভবনের সামনে হকারদের অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই অবস্থান থেকে আমরা মেয়রের কাছে স্মারকলিপি দেবো। 

মতিঝিলে অভিযান : মতিঝিল এলাকায় ফুটপাত হকারমুক্ত করতে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মতিঝিল সিটি সেন্টারের সামনে অভিযান শুরু হয়। বিকাল ৩টা পর্যন্ত অর্ধশতাধিক দোকান উচ্ছেদ করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন ডিএসসিসি’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মো. নাজমুস শোয়েব, মামুন সরদার, আবু সায়্যিদ ও সহকারী সচিব দেবাশীষ নাগ। 

খান মো. নাজমুস শোয়েব বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছিল ফুটপাতে হকাররা যেন কোন দোকান নিয়ে না বসে। বসলে উচ্ছেদ করা হবে। করপোরেশনের ঘোষণা অনুযায়ী এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘গুলিস্তান এলাকায় আমাদের অভিযান পরিচালনা করার কথা ছিল। ওই এলাকার ফুটপাতে কোন দোকান না বসায় মতিঝিল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

ডিএসসিসি’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেবাশীষ নাগ বলেন,‘আমরা অভিযান শুরু করার আগে ব্যবসায়ীদের সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। তারা তাদের মালামাল সরিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু ভাসমান দোকান ও চৌকি সারাননি। আমরা বুলডোজার দিয়ে এসব গুড়িয়ে দিচ্ছি, যেন সিটি করপোরেশনের গাড়ি সরে যাওয়ার পর আবার বসতে না পারে। 

অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে পথচারীরা : হকার উচ্ছেদ অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ। সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা আবুল বাশার বলেন, ‘ব্যবসা করার বিরুদ্ধে কারোরই অবস্থান নেই বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু সেটা ফুটপাত দখল করে কেন হবে? সিটি করপোরেশনের এ কাজের জন্য সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।’

ব্যবসায়ী আবুল হাসনাত চৌধুরী বলেন, ‘ফুটপাতে দোকান থাকলে ঠিকভাবে হাটা যায় না। হাটতে হলে সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ফুটপাতে দোকান না থাকাই ভাল।’

ফুটপাতে খাবার হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমি জানতাম না উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। দোকানে প্রায় ৫ হাজার টাকার খাবার ছিল। সব গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমি গরিব মানুষ। ভাতের এই হোটেল চালিয়ে সংসারের ব্যয় বহন করি। এখন যদি দোকান দিতে না পারি তাহলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’

হকারমুক্ত গুলিস্তানের ফুটপাত : গুলিস্তান ও আশপাশ এলাকার ফুটপাতে গতকাল কোনো হকার বসতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হকাররা সকালে এলেও বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র‌্যাব সদস্য ও ডিএসসিসির ম্যাজিস্ট্রেটদের দেখে পণ্য নিয়ে রাস্তায় বসেননি। ফুটপাতে থাকা তাদের জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে হকাররা তাদের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়ে যান। 

দুপুর দেড়টা পর্যন্ত দেখা যায়, গুলিস্তান এলাকায় হকারদের জটলা। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে মোতায়েন রয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ। অল্প কিছু হকার সকালে গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, গোলাপশাহ মাজার ও আন্ডারপাসের আশপাশে পণ্য নিয়ে আসেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন রয়েছে দেখে তারা আর বসেননি। 

গুলিস্তান গোলাপশাহ মাজারের বিপরীতে ফুলপ্যান্ট নিয়ে এসেছিলেন হকার আব্দুল হক। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি আর বসেননি। তিনি বলেন, ‘নেতা কইছিলেন দোকান নিয়া বসতে। কিন্তু নেতারই তো খবর নাই। নেতা মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে কে ছাড়াবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে দোকান খুলিনি।’

পল্টন ঘুরে দেখা গেছে, সকালে হকাররা পল্টন ও বায়তুল মোকাররমের ফুটপাতে দোকান নিয়ে বসেন। ডিএসসিসির পক্ষ থেকে তাদের ফুটপাতে থাকা জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে তখন দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে অনেক হকার তাদের জিনিসপত্র সরিয়ে ফেললেও অনেকে নির্দেশনা উপেক্ষা করে দোকান নিয়ে বসেছিলেন। দুপুরের দিকে উচ্ছেদ শুরু হলে তারা মালামাল নিয়ে চলে যান। তাদের রেখে যাওয়া চৌকি ও বক্স বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

পল্টনের ফুটপাতের ব্যবসায়ী শিপন শুভ বলেন, ১২ বছর ধরে তারা এ জায়গায় ব্যবসা করছেন। এখন যদি হঠাৎ করে সন্ধ্যার পর বসতে হয়, তাহলে একবেলার খাবারও জুটবে না। সন্ধ্যা ৬টার পর মানুষ কোনো কিছু কিনতে ফুটপাতে আসবেন না। অন্য কোনো জায়গায় আমাদের ব্যবস্থা না করা হলে আমরা কোনোদিনই এ জায়গা ছাড়ব না। তিনি আরো বলেন, এখন কী করে খাব? ভিক্ষা করে খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ডিএসসিসি আমাদের এখান থেকে উঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা করে উচ্ছেদ করার কথা ছিল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। 

অভিযান চলবে: মেয়র

অভিযান শেষে বিকেলে নগর ভবনে সংবাদ সম্মেলনে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, জনদুর্ভোগ লাঘব করতে এ এলাকায় দিনের বেলায় কাউকে বসতে দেয়া হবে না। রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত না করা পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। “সার্বিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। জনগণের পথচলা নির্বিঘœ করতেই আমাদের এ প্রচেষ্টা। এ ব্যাপারে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবস্থান পরিষ্কার, স্পষ্ট এবং কঠোর। গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অভিযান চলবে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের বিষয়ে কাউকে একবিন্দু ছাড়ও দেয়া হবে না। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কারও সঙ্গে আপস করবে না।” হলিডে মার্কেটকে আরও আকর্ষণীয় করার জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাজ করবে বলে জানান মেয়র। “তারা হলিডে মার্কেটে ব্যবসা করতে পারেন। হলিডে মার্কেট জমজমাট করার জন্য আমাদের উদ্যোগ রয়েছে। আমরা তাদের সহায়তা করব। চাই হলিডে মার্কেট সিস্টেমটা দাঁড়াক।”

বাংলাদেশ জাতীয় হকার্স ইউনিয়নের নগর ভবন ঘেরাওয়ের ঘোষণার বিষয়ে মেয়র বলেন, যে যাই করুক, উচ্ছেদ অভিযান থামবে না। “নগরভবন ঘেরাও করে করুক, মেয়রকে ধরে ধরুক। যা খুশি করুক। আমি ফুটপাত, রাস্তা হকারমুক্ত করবই।”

রাতের বেলা বিক্রি কম হয়- হকারদের এ অভিযোগের বিষয়ে মেয়রের দাবি, ওই এলাকায় রাতের বেলায়ও বেচাকেনা হয়। “গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকা সব সময় জমজমাট থাকে। এখান থেকে সারা দেশের মানুষজন যাতায়াত করে। এখানে গভীর রাত পর্যন্ত বেচাকেনা হয়। যারা বলছে এখানে সন্ধ্যার পর বেচাকেনা হয় না, তারা মিথ্যা বলছে।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ