মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ৭ খুন মামলার রায় আজ 

  • তারেক সাঈদ, আরিফ ও এম এম রানার জবানবন্দীতেই বেরিয়ে এসেছে খুনের সম্পৃক্ততা

কামাল উদ্দিন সুমন : নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ। আড়াই বছর ধরে বিচারকার্য চলার পর আজ সোমবার নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন এই রায় ঘোষণা করবেন। এদিকে চাঞ্চল্যকার এ মামলার রায় দেয়াকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে নেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। 

সন্ধ্যার পর থেকে প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মোতায়েন রাখা হয়েছে নিরাপত্তাবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। খুনের রায় কি হয় তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে রয়েছে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের মানুষ। লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আসামীদের জবানবন্দীতে বেরিয়ে এসেছে তাদের সম্পৃক্ততার কথা। 

প্রধান আসামী নূর হোসেনসহ ৩৫ আসামীর সকলের সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করছেন বাদীপক্ষ, বাদীর আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষ। তারা বলছেন, বিচার কাজে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে। সেহেতু প্রত্যাশা আসামীদের সর্বোচ্চ সাজা হবে।

ইতোমধ্যে আইনী সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় ইতোমধ্যে নূর হোসেন, র‌্যাব-১১ এর সাবেক সিইও তারেক সাঈদ, র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর আরিফ, রানাসহ ২৩ আসামী গ্রেফতার রয়েছেন। পলাতক আছেন ১২জন। সাত খুন মামলার বিত্তশালী আসামীদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিহত দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বন্টনের আবেদন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী এড. ওয়াজেদ আলী খোকন।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড : ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ তার পাঁচ সহযোগীকে অপহরণ করা হয়। একই সময় একই স্থান থেকে অপর একটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়ির চালককেও অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিনদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকার তীর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

অপহরণের পর থেকে নজরুলের স্বজন এবং এলাকাবাসী আন্দোলন শুরু করে। আর লাশ উদ্ধারের পর থেকে আন্দোল আরো তীব্র হতে থাকে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন প্রবীণ আইনজীবী চন্দন সরকার নিহত হওয়ায় রাজপথ থেকে আদালত অঙ্গন পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। 

 এই অপহরণ আর সাতজনকে খুন গুমের নেপথ্যে তৎকালীন সিটি কর্পোরেশনের ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিদ্ধিরগঞ্জের ডন নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ র‌্যাবের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি চলে আসে নারায়ণগঞ্জের দিকে। 

অপহরণের নির্দেশদাতা নূর হোসেনের ভারতে পলায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যের জড়িত থাকার মোবাইল কথোপকথন গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর আরো বেশী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। একজন কাউন্সিলরের নির্দেশে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মেয়ের জামাই তারেক সাঈদ তার নি¤œপদস্থ র‌্যাব কর্মকর্তারা খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে এমন বিষয়টি প্রকাশ পায়। 

সাত খুনের ঘটনার সাথে জড়িত আসামীদের সাথে সখ্যতা থাকার অভিযোগে তৎকালীন র‌্যাবের এডিজি কর্নেল জিয়াউল হক, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানসহ হেভিওয়েট অনেককেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্তের কমিটির মুখোমুখি হতে হয়।

এরপর সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেফতার হওয়া, এরপর বাংলাদেশে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারকার্য সম্পন্ন করাকালীন সময়জুড়ে দেশজুড়ে বেশ আলোচিত হয়ে উঠে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি। মামলায় ৩৫ জন আসামীর মধ্যে ২৩ জন গ্রেফতার থাকলেও বাকী ১২ জনকে পলাতক দেখিয়েই সাক্ষ্য ও জেরার পর গত ৩০ নবেম্বর যুক্তিতর্ক শেষ হয়। সাত খুনের ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের হলেও ১২৭ জনকে অভিন্ন সাক্ষী করা হয়। যার মধ্যে ১০৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে, সাত খুনের দুটি মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ হওয়ায় নূর হোসেনসহ সকল আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি প্রত্যাশা করছেন নিহতের পরিবার, মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীসহ নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণ।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি এড. ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার বিত্তশালী আসামীদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিহত দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বন্টনের আবেদন জানিয়েছি। সেই সাথে সকল আসামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত করতে পারায় আদালতের কাছে সকলের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন করেছি। 

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, সাত খুনের মামলার সুষ্ঠু বিচার হবে- এ প্রত্যাশা শুধু নারায়ণগঞ্জবাসীর নয়, সমগ্র দেশবাসীর। আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। গণআস্থা থেকেই আমার প্রত্যাশা, আদালত আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করবেন। 

আর নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, আমরা আদালতে আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছি। আমরা চাই, আদালত আসামীদের মৃত্যুদণ্ড দিবেন। আরেক মামলার বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার পাল বলেন, বিচার শেষে আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ