শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বিবিএস’র মতে জিডিপির প্রাক্কলন সাড়ে ৭ শতাংশ ৪ কারণে অর্জনকে চ্যালেঞ্জ মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক

স্টাফ রিপোর্টার: জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মনে করে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাক্কলন করার কথা। কিন্তু এ বক্তব্যে সাথে এক মত নয় বিশ্বব্যাংক। তাদের মনে চার কারণে এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে বছর শেষে এ বিতর্কের অবসান হবে।

গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের পরিকল্পনা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), রেমিট্যান্স, প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেন।

 তিনি বলেন, আশা করছি চলতি বছর ২৭ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। অর্থবছরের প্রথম ৬ মাস দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৭ সালের অর্থনীতি ২০১৬ সালের অর্থনীতির চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।

চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া এ পূর্বাভাসের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক সব সময় রক্ষণশীল পদ্ধতিতে প্রবৃদ্ধির হিসাব করে থাকে। এ কারণে বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের সঙ্গে বিবিএসের হিসাবের পার্থক্য থাকে। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এতে লুকোচুরির কিছু নেই। আইএমইডি যেমন সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প তদারক করে থাকে, বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হিসাব তৈরির কাজটি তদারক করে।

গত কয়েক বছরের বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস অনেক বেশি, যেটিকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রী। চলতি বছর মন্ত্রণালয়ের অধীন চারটি প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যর কথা জানান পরিকল্পনা মন্ত্রী।

তিনি বলেন, প্রতিবছর সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিধি ও আকার বাড়ছে। এজন্য বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এনএপিডি) শক্তিশালী করা হবে।

তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত জনবলের মাধ্যমে প্রকল্প কাজ তদারকে গতি আনতে আইএমইডিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য সঠিক সময়ে যথাযথ পরিসংখ্যান দরকার। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামোতে বিবিএস এই কাজটি এখনো যথাযথভাবে করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই পুরাতন ফিগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। একারণে বিবিএসকেও শক্তিশালী করা হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বিআইডিএস বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু নানা কারণে এটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়নি। সরকার এখন বিআইডিএসকে সেন্টার অব একসিলেন্স হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে পুনর্গঠন করা হবে।

 দেশের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ইস্যুতে গবেষণার পাশাপাশি এখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাও দেওয়া হবে। একই উদ্দেশ্যে এনএপিডিকওে শক্তিশালী করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

 রেমিট্যান্স বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, হুন্ডিসহ অন্যান্য অপ্রচলিত মাধ্যমে রেম্যিটান্সের অর্থ দেশে ঢুকছে। এজন্য রেমিট্যান্সের প্রবাহ কম মনে হচ্ছে। সরকার অপ্রচলিত পদ্ধতিগুলো বন্ধের উপায় খুঁজছে। প্রচলিত মাধ্যমে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে পরিকল্পনামন্ত্রী এ খাতে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। জিডিপির হিসাবে রেমিট্যান্স ধরা হয় না, তাই এ খাতে প্রবাহ কমলেও প্রবৃদ্ধিতে তা কোন প্রভাব ফেলবে না বলেও মন্ত্রী মনে করেন। 

এদিকে বিশ্ব ব্যাংক মনে করে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও বাহ্যিক চাহিদায় মন্থরগতির মধ্যেও চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা এ সংস্থার অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’- এ তুলে ধরা হয়েছে এই পূর্বাভাস।

প্রায় এক দশক ৬ শতাংশের বৃত্তে ‘আটকে’ থাকার পর গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ‘ঘর’ অতিক্রম করে। চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।

সরকার এবারের বাজেটে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছে। আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিশ্বাস, আগামী দিনগুলোতে প্রবৃদ্ধি আর ৭ শতাংশের নিচে নামবে না।

বিশ্বব্যাংক সরকারের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে না পারলেও আগের প্রক্ষেপণ থেকে সরে এসেছে। ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ এর জুন সংখ্যায় বিশ্ব ব্যাংক বলেছিল, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাবে না। আর ছয় মাস পর জানুয়ারির প্রতিবেদনে যে প্রক্ষেপণ তারা দিয়েছে, তা আগের হিসাব থেকে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে শ¬থগতির কারণে ব্যক্তিখাতে ভোগ ব্যয় ও বিনিয়োগ উভয় খাতেই মন্দা যাচ্ছে। রেমিটেন্স প্রবাহ কমতে থাকায় এবং রপ্তানি খাতের দুর্বলতায় ২০১৭-১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামতে পারে বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব খাতে ভারসাম্য আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এবং আর্থিক ও করপোরেট খাতে স্থিতিশীলতার অবনমন ঘটলে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি আরও শ্লথ হয়ে যেতে পারে। 

বিশ্বব্যাংকের ধারণা, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কম। তবে সরকারের প্রাক্কলনের (৬.২%) চেয়ে কিছুটা বেশি ছয় দশমিক চার শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার (১৬.৫%) চেয়ে কম হয়েছে, যা সরকারি ও বেসরকারি খাতে কম ঋণ চাহিদা নির্দেশ করে। গত ১২ মাসে টাকার দর বেড়েছে এক দশমিক ৪৪ শতাংশ।

রিপোর্টে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা চীনের নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের তেমন ঝুঁকি নেই। এর কারণ, বাংলাদেশের মূলধন হিসাব উন্মুক্ত নয়। বাংলাদেশের আর্থিক বাজারে বিদেশিদের বিনিয়োগ খুবই কম। আর বাংলাদেশের মোট রফতানির মাত্র দুই দশমিক তিন শতাংশ হয় চীনে। রিপোর্টে আরও বলা হয়, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন করে জনশক্তি রফতানি উন্মুক্ত হওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি বাড়বে। যদিও তেলের মূল্য পতন এসব বাজারে শ্রম চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে।

চার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ : বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো আর্থিক খাত। বলা হয়েছে, আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। কেননা তারা রেহাই পাচ্ছে। জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে তার সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে না। সব শেষে আর্থিক খাতে সরকারি ব্যয় ও রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো আরেকটি চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ প্রশসানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ চারটি চ্যালেঞ্জের কারণেই চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ