রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

গণতন্ত্র বিনাশের মাস

আশিকুল হামিদ : আগের এক নিবন্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে খ্রিস্টীয় বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এবারের নিবন্ধে আনবো প্রথম মাস জানুয়ারিকে। কারণ, ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভের মাস মার্চ এবং বিজয় অর্জনের মাস ডিসেম্বরের সঙ্গে ‘স্মরণীয়’ মাসের তালিকায় জানুয়ারিও ঢুকে পড়েছে। পাঠকদের মধ্যে যারা বর্তমান সরকারের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণ শুনেছেন, তারা হয়তো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের নামে পরিচালিত কর্মকাণ্ডকে প্রথমে আনতে চাইবেন। অন্যদিকে তারও আগে কিন্তু আরেকটি তারিখও রয়েছে। সেটা কয়েক বছর ধরে নীরবে পেরিয়ে যাওয়া ১১ জানুয়ারি, যাকে তথাকথিত ১/১১ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি গণতন্ত্রবিনাশী ও সংবিধানবিরোধী ভয়ঙ্কর এক অভ্যুত্থানের জন্য কলংকিত হয়ে আছে। সে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। সেই ১১ জানুয়ারি এখন নীরবে পেরিয়ে যায়, এর কুশীলবদের নিয়েও তেমন কোনো উচ্চবাচ্য হয় না। দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী কোনো কোনো মহলের পক্ষ থেকে অবশ্য নাম ধরে ধরে জেনারেল মইন উ আহমেদ এবং ফখরুদ্দিন আহমদসহ দখলদার সরকারের সকল উপদেষ্টাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি ওঠে। রাষ্ট্রদ্রোহিতার এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করার দাবি জানানো হয়। এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, ওই অসাংবিধানিক সরকারকে আওয়ামী লীগ ও তার জোটের সঙ্গীরাই ‘নিয়ে’ এসেছিল। তাদের উদ্দেশ্যও যে পূরণ হয়েছে- অর্থাৎ আওয়ামী লীগ যে ক্ষমতায় যেতে পেরেছে, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন দেশপ্রেমিক মহলগুলো। কিন্তু এটুকুই সব নয়। আজও পর্যন্ত ১/১১-এর কুশীলবদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তেমন সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রথম থেকেই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দলটির পক্ষ থেকে কোনোবারই টুঁ শব্দটি করা হয় না। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ এই অভিযোগ অনেক আগেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, উদ্দিন সাহেবরা আসলেও বিশেষ কিছু এজেণ্ডা বাস্তবায়ন করতেই ক্ষমতা দখল করেছিলেন। একথাও গোপন থাকেনি যে, লগি-বৈঠার নৃশংসতা থেকে জরুরি অবস্থা জারি করা পর্যন্ত সবই করা হয়েছিল সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে। ১/১১-কে অনিবার্য করার আসল কারণও লুকিয়ে রাখা যায়নি। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে (২০০১-২০০৬) বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ হরতালের আড়ালে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালানোর বাইরে কোনো ব্যাপারেই জাতির স্বার্থে সামান্য অবদান রাখতে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। নিজেদের এবং বন্ধুরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার জরিপেও দেখা গিয়েছিল, আওয়ামী লীগ অন্তত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। মূলত এই হতাশা থেকেই ২০০৬ সালের অক্টোবরে শুরু হয়েছিল লগি-বৈঠার তাণ্ডব, যা শেষ পর্যন্ত ১/১১-এর অজুহাত তৈরি করেছিল। এটা যে সুপরিকল্পিত এক আয়োজন ছিল সে ব্যাপারে প্রকাশ্যে জানান দিয়ে বলা হয়েছে, সেটা ছিল তাদের ‘আন্দোলনের ফসল’। ব-ল আলোচিত ‘রোডম্যাপ’ও ছিল সে পরিকল্পনার অংশ। এর ভিত্তিতেই ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘ডিজিটাল’ নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতায় বসানো হয়েছে আওয়ামী লীগকে। এরপর এসেছে ‘ঋণ’ পরিশোধ করার পালা। এজন্যই প্রধান খলনায়ক জেনারেল মইন উ আহমেদ এখনো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাচ্ছেন, প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদ বিদেশে পাড়ি জমাতে পেরেছেন। অন্য উপদেষ্টারাও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ব-ল আলোচিত ‘ডিল’ও সেভাবেই হয়েছিল।
লগি-বৈঠার তা-ব থেকে ‘ডিজিটাল’ নির্বাচন পর্যন্ত ‘রোডম্যাপ’-এর বাস্তবায়নে প্রধান নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন জেনারেল মইন উ আহমেদ। বলা হয়, তার ‘খুঁটিও’ এমন এক দেশের রাজধানীতে ‘পোঁতা’ রয়েছে, যে দেশটির ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সাধ্য নেই সরকারের। অথচ ন্যূনতম দেশপ্রেম এবং উদ্দেশ্যের মধ্যে সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা থাকলেও জেনারেল মইন উ’কে গ্রেফতার করা এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সরকারের দায়িত্ব ছিল। কারণ, দু’বছরের বেশি সময় ধরে মইন উ দেশ ও জাতিকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ইচ্ছাধীন রেখেছিলেন। অস্ত্রের মুখে রাষ্ট্রপতিকে বাধ্য করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন তিনি। ফখরুদ্দিন আহমদকে সামনে রাখলেও বন্দুকের সঙ্গে ক্ষমতার চাবিও সব সময় মইন উ’র হাতেই থেকেছে। প্রকাশিত হয়েছে তার নানা অপকর্মের ফিরিস্তি। দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে মইন উ ও তার সহচররা দেশে ‘ব্ল্যাকমেইলিং’-এর রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। ক্ষুদে ব্যবসায়ী থেকে বড় ব্যবসায়ী পর্যন্ত কাউকেই রেহাই দেননি তারা।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধান নেতা-নেত্রীদের ‘জেলের ভাত’ খাইয়েছিলেন মইন উ ও তার সঙ্গীরা। দুই নেত্রীকে, বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে ‘মইনাস’ করতে চেয়েছিলেন। নেতাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন। অনেককে দিয়ে জোর করে মিথ্যা বলিয়েছেন। মামলার পর মামলা চাপিয়ে নেতা-নেত্রীদের ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলেন। রাজনীতিকদের অসম্মানিতও করেছেন তিনি যথেচ্ছভাবে। সবই করেছেন তিনি সামরিক স্বৈরশাসকদের স্টাইলে। সবশেষে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময়ও তাকে অত্যন্ত নেতিবাচক ও ক্ষতিকর অবস্থানে দেখা গেছে। বিপন্ন সেনা অফিসারদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা না করে তিনি গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘যমুনা’য় উঠেছিলেন। অথচ একাধিক সাবেক সেনাপ্রধান এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঘাতকরা সেনাবাহিনীর সামনে ১০ মিনিটও দাঁড়াতে পারতো না। এত সেনা অফিসারকে হত্যা করতে পারতো না। কিন্তু একশ’ ভাগ নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও মইন উ সেনাবাহিনীকে অভিযান চালাতে দেননি। মইন উ’র এই ভূমিকার কারণে ঘাতকরা ‘কাজ সেরে’ পালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। কিন্তু এত সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রথম থেকে মইন উ’র ব্যাপারে ‘অন্য রকম’ মনে হয়েছে। এর কারণও নি-য়ই উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না।
১/১১-এর পর অন্য একটি কারণেও ‘স্মরণীয়’ হয়ে আছে জানুয়ারি। সে কারণটি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত এবং এখনো পর্যন্ত নিন্দিত, বিতর্কিত ও প্রত্যাখ্যাত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আড়ালে নিজেদের জেদ পূরণের উদ্দেশ্যে প্রহসনের এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। ‘স্বাধীন’ নির্বাচন কমিশনও সরকারের হুকুম তামিল করেছিল লজ্জা-শরমের মাথা চিবিয়ে খেয়ে। কিন্তু সংবিধানের দোহাই দেয়া হলেও ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত প্রধান দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক দলই এতে অংশ নেয়নি। সে কারণে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়ার ধুম পড়ে গিয়েছিল। একটি ‘ফুল’ বা সম্পূর্ণ এবং একটি ‘হাফ’ সেঞ্চুরি হাঁকানোর মাধ্যমে ১৫৫ জন নির্বাচন না করেও ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন। বাকি ১৪৫টি আসনের প্রার্থীদের সংখ্যা ও পরিচিতি নিয়েও কম হাস্য-কৌতুকের সৃষ্টি হয়নি। কারণ, যে ৩৯০ জন ফাঁকা ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন আওয়ামী লীগের। কয়েকজন ছিলেন আওয়ামী মহাজোটের। যারা দলের মনোনয়ন পাননি তারা দাঁড়িয়েছিলেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে। জিতে যাওয়ার পর বিদ্রোহীদের প্রায় সকলকেই ঘরের ছেলের মতো দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল। তারাও ফিরে যেতে পেরে ধন্য ও কৃতার্থ হয়েছিলেন। এভাবেই সংসদে আওয়ামী লীগ আবারও দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন দখল করেছে। পার্থক্য হলো, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল শেখ হাসিনার ‘আন্দোলনের ফসল’ হিসেবে পরিচিত জেনারেল মইন ও ফখরুদ্দিনদের অবৈধ ও অসাংবিধানিক সরকার। অন্যদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সরকারি তথা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেরাই ক্ষমতায় ফিরে আসার সব ব্যবস্থা করেছিলেন আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনরা। তাদের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেছিল অথর্ব, মেরুদণ্ডহীন ও সেবাদাস হিসেবে চিহ্নিত নির্বাচন কমিশন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনায় ও প্রচারণায় ঘাটতি না থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসাসহ বিভিন্ন নেতিবাচক সম্ভাবনার কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ওই নির্বাচন বর্জন করে ভোট না দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছিল। স্মরণ করা দরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান যুক্ত করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনার মাধ্যমে সংকটের শুরু করেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করেছে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ছাড় দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং শেখ হাসিনা ওই সরকারের প্রধান হতে পারবেন না। জাতিসংঘের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং গণচীনও সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহবান জানিয়েছিল। এজন্য প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছিল। অন্যদিকে সংলাপের নামে একের পর এক নাটক সাজিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর প্রচেষ্টাকেও তারা সফল হতে দেননি।
সমঝোতার ধারেকাছে যাওয়ার পরিবর্তে এভাবেই একতরফা নির্বাচনের পথে পা বাড়িয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটও তাই ঘনীভূত হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে পালিত অবরোধে অচল হয়ে পড়েছিল সারাদেশ। আগের বছর ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত অবরোধ এবং নির্বাচন বাতিলের দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার অন্তত ১২২ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছিল। দমন-নির্যাতন এবং হত্যা ও গ্রেফতারের অভিযান চালানো হয়েছিল নির্বাচনের পরও বেশ কিছুদিন পর্যন্ত। সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে তার বাসভবনে অবরুদ্ধ করেছিল। দলের নেতা-কর্মীরা দূরে থাকুন, পুলিশ এমনকি বিদেশি সাংবাদিকদের পর্যন্ত বিরোধী দলের নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়নি। খালেদা জিয়া নিজেও বাইরে আসতে পারেননি। ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি উপলক্ষে নয়া পল্টনস্থ বিএনপি অফিসে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তাকে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অসম্মানিত হতে হয়েছিল। অমন অবস্থার মধ্যেও ৩ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে বেগম খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট না দেয়ার এবং প্রহসনের নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। ১৮ দলীয় জোট ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছিল। সে হরতালের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৫ জানুয়ারির ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচন। সর্বনিম্ন পরিমাণ ভোটার উপস্থিতির রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছিল সেদিন।
দশম সংসদ নির্বাচনের নামে ৫ জানুয়ারি প্রহসনের পাশাপাশি যে প্রাণঘাতী কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছিল তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল। ওই সময় পর্যন্ত বিদ্যমান নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল শুধু নয়, পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে নির্বাচন বাতিল করার এবং সব দলের অংশগ্রহণে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দেশের সবস্থানে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের অনুপস্থিতিতেই প্রমাণিত হয়েছে, জনগণ একদলীয় এ নির্বাচনকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রশাসন এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীগুলোকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করে আয়োজিত এ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করা হলেও জনগণ ক্ষমতাসীনদের ‘না’ বলে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে তাদের পরাজয় ঘটেছে। একই কারণে জনগণের প্রত্যাখ্যাত সরকারও অবৈধ বলে মন্তব্য করেছিল বিএনপি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপিও একই ধরনের বক্তব্য রেখেছিল। নির্বাচনের পরদিন, ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতারাও নির্বাচনটিকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় কলংক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ভাষণে ও বিবৃতিতে প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি সেদিন থেকেই একযোগে নতুন পর্যায়ে শুরু হয়েছিল অবরোধ। ১৮ দলীয় জোটের ডাকে দ্বিতীয় দফায় ৪৮ ঘণ্টার হরতালেও অচল হয়ে পড়েছিল সারাদেশ। সবার মুখেই তখন ছিল এক কথা- সরকার নির্বাচনের নামে জনগণের সঙ্গে তামাশা করেছে। ধ্বংস করেছে গণতন্ত্রকেও। সাংবিধানিক ধারাবাহিকত বজায় রাখার দোহাই দিয়ে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামে সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীনরা যা করেছিলেন দেশের মতো বিদেশে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ কোনো দেশই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বৈধতা দেয়নি। এসবের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছিল, দেশের ভেতরে তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থা নির্বাচনটিকে গ্রহণ করেনি। এমন প্রতিক্রিয়া সরকারের জন্য শুধু নয়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও মোটেই শুভ ছিল না। কথাটা ক্ষমতাসীনরাও যে বোঝেননি তা নয়। কিন্তু নিজেদের জেদ পূরণের উদ্দেশ্যেই তারা ভোটারবিহীন এ নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। জেদও তারা বুঝে-শুনেই করেছিলেন। কারণ, সব জরিপ ও অনুসন্ধানেই জানা গিয়েছিল, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ কোনো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে ক্ষমতায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
তাছাড়া, ক্ষমতাসীনরা নিজেরা অন্তত জানতেন, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তারা জেতেননি। সেবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল শেখ হাসিনার ‘আন্দোলনের ফসল’ হিসেবে পরিচিত জেনারেল মইন ও ফখরুদ্দিনদের অবৈধ ও অসাংবিধানিক সরকার। ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশ বিশেষের ইচ্ছা ও দাবি পূরণ এবং স্বার্থ উদ্ধার করে দেয়ার বাইরে জনগণের জন্য সরকার এমন কোনো কাজই করেনি, যার কারণে ভোটার জনগণ আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনবে। পাশাপাশি ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বাত্মক দলীয়করণ। প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত এমন কোনো একটি ক্ষেত্রের কথা বলা যাবে না, যেখানে দলবাজি না করা হয়েছে। দুর্নীতিতেও অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছেন ক্ষমতাসীনরা। পদ্মাসেতু ও শেয়ারবাজারের মতো বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি ছিল অবিশ্বাস্য পরিমাণে ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত অর্থ-সম্পদ বেড়ে যাওয়ার তথ্য-পরিসংখ্যান। জনগণ জেনে স্তম্ভিত হয়েছিল যে, মাত্র পাঁচ বছরেই কারো কারো অর্থ-সম্পদের পরিমাণ বেড়েছিল এমনকি পাঁচ হাজার গুণ পর্যন্ত! সরকার সবচেয়ে বেশি নিন্দিত হয়েছিল দমন-নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য। বিরোধী দলকে দেশের কোথাও কোনো মিছিল-সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে পুলিশ র‌্যাব এবং বিজিবি। সঙ্গে থেকেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা। নির্বাচনপূর্ব কয়েকদিনেও পুরো দেশকে মৃত্যুপুরি বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। যৌথ অভিযানের নামে সরকার বিরোধী দেেলর নেতা-কর্মীদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই শত শতজনকে গ্রেফতার করেছে। মেরেও ফেলা হয়েছে অনেককে। এভাবে সব মিলিয়েই দেশে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল সরকার। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনগণকে ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছে নেয়া সম্ভব হয়নি। জনগণ বরং ১৮ দলীয় জোটের ডাকে সাড়া দিয়ে তামাশার নির্বাচন বর্জন করেছিল।
আজ এ পর্যন্তই। শেষ করার আগে পাঠকদের জানিয়ে রাখা দরকার, জানুয়ারি মাসের ইতহাসে আরো দুটি বিশেষ ঘটনা রয়েছে। একটি সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদারের হত্যাকাণ্ড এবং দ্বিতীয়টি বাকশাল গঠনের মাধ্যমে জাতির ওপর একদলীয় শাসন চাপিয়ে দেয়া। এ দুটি বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ