বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

খাদ্য হিসেবে আলু

আমাদের দেশে আলু এক সময় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আজকাল নানারকম খাদ্যপণ্য প্রস্তুত হয় এ দিয়ে। যেমন: চিপ্স, ফ্রেঞ্চফ্রাই, ক্রেকার্স, চানাচুর, চিপসি, ক্রিপসি প্রভৃতি। আর আলু থেকে প্রস্তুত এসব মুখরোচক খাদ্য বহুমূল্যে বিক্রি হয়। উল্লেখ্য, মাত্র ৫০ গ্রাম আলুর চিপস বা ক্রেকার্সের মূল্য পড়ে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ টাকা। আলুর বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের স্বাদের জন্য অবশ্য সামান্য ঝাল-মসলা, লবণ, কালার ফুড মেশানো হয়ে থাকে। আলু দিয়ে নুডল্স, রুটি, ফুচকাও তৈরি করা যায়। বেসনের পরিবর্তে আলু থেকে তৈরি আটা ব্যবহার করে চানাচুর প্রস্তুত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে আলুর নানা রকম খাদ্য তৈরি হয়। আলুর তৈরি মুখরোচক খাদ্য মানুষ অনেক মূল্য দিয়ে কেনে এবং তৃপ্তিসহকারে খায়। ইউরোপের ৫০টির অধিক দেশে আলু প্রধান খাদ্য পণ্যরূপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে শতাব্দের পর শতাব্দ থেকে। উল্লেখ্য, চাল, গম, ভুট্টায় যে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা-শ্বেতসার থাকে তা আলুতেও রয়েছে। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, যা চাল বা গমের আটায় নেই। তাই খাদ্যমানের দিক থেকে চাল বা গমের চেয়ে আলু অধিকতর পুষ্টিগুণসম্পন্ন। এছাড়া আলুর পাতলা খোসা বা চামড়া আধুনিক চিকিৎসার কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে জানা গেছে। কাজেই আলু আমাদের দেশে অতিসহজে এবং অধিক পরিমাণে উৎপন্ন হলেও এর যে দ্রব্যগুণ এবং খাদ্যমান কত গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। ফলে সোনার আলু আমাদের কাছে আজও অবহেলিত এবং উপেক্ষিত কৃষিপণ্য।
উত্তরের জেলা কৃষিপ্রধান ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার হাটপাড়া থেকে মুহাম্মদ মুনির তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, সেখানে কৃষকরা এখন জমি থেকে আলু তুলছেন। আলুর ফলনও বেশ ভালো। তবে তা বিক্রি করতে হচ্ছে প্রায় পানির দামে। কেজি মাত্র ৩ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে করনাই, জাবরহাট, বৈরচুনা, চন্দরিয়া প্রভৃতি হাটে। অথচ বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকদের মজুরিসহ আলুর উৎপাদন খরচই পড়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২টাকা কেজিপ্রতি। দিনাজপুরের হাট-বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি মাত্র ৫ টাকা। তাই অনেক কৃষক জমি থেকে আর আলু তুলতেই চাচ্ছেন না। ফলে অনেকের আলু এখন ক্ষেতেই পচে যাবার জোগাড়। জমি থেকে শ্রমিক দিয়ে আলু তোলার যে খরচ তাও বাজারে আলু বিক্রি করে পাওয়া যায় না। এমন অবস্থা হলে কৃষকরা আলু ক্ষেত থেকে কেন তুলবেন? অতীতেও উত্তরাঞ্চলের আলুচাষীরা আলু মহাসড়কে ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন। উপযুক্ত দাম দিয়ে আলু না কেনার ব্যবস্থা হলে এবারও হয়তো দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের চাষীদের আলু মহাসড়কে ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের আয়োজন ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না। তাই সময় থাকতেই উপযুক্ত মূল্য দিয়ে আলু ক্রয় করে তা হিমাগারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি ও খাদ্য বিভাগ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলুচাষীদের রক্ষা করতে পারে বলে অভিজ্ঞদের ধারণা।
আলু যেহেতু খাদ্যমানের দিক থেকে ভাত ও রুটির চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। এর ফলন ধান ও গমের চেয়ে যেমন বেশি, তেমন উৎপাদন পদ্ধতিও সহজ। তবে ধান, গম পচনশীল নয়। আলু সহজেই পচে যায়। তাই জমি থেকে তোলার কয়েকদিন পরেই আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে আলু জমি থেকে তুলেই সিদ্ধ করে বা আগুনে পুড়িয়ে খাওয়া যায়। উল্লেখ্য, ভাত ও রুটির প্রস্তুতপ্রণালী দীর্ঘ। ধান, গম জমি থেকে আহরণ করে ভাত রান্না বা রুটি প্রস্তুতের প্রণালী বেশ সময়সাপেক্ষ। কিন্তু আলু জমি থেকে তুলেই সিদ্ধ করে বা পুড়িয়ে খাওয়া যায়। এমনকি লবণ-মরিচও লাগে না আলু খেতে। বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ আলু সেদ্ধ খেয়ে সারাজীবন পার করে দেয়। আলু উৎপাদনও হয় অনেক। বিঘায় ৫০ থেকে ১০০ মণ পর্যন্ত উৎপাদন হয় খুব সহজে। অতএব আলু আমরা খাই না কেন? ভাত বা রুটির প্রতি আমাদের এতো মোহের কোনও কারণ নেই। সকালের নাস্তা কিংবা বিকেলের স্নাক্স আলুচিপ্স, চটপটি কিংবা পটেটো মিক্সড দিয়ে অনায়াসেই সারতে পারি। আলুর স্যুপও হয় খুব সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। বিদেশে রফতানি করেও সোনার দামে বিক্রি করা যায় সোনারং আমাদের এই আলু। কাজেই ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুরসহ দেশের চাষীদের আলু ন্যায্যমূল্যে কিনে নিয়ে তা হিমাগারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক অতি শিগগিরই। অন্যথায় চাষীরা আলুচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আলু আমদানি করতে হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ