রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

জিম্বাবুয়ের পর এবার পাকিস্তান যাচ্ছে ক্যারিবীয়রা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের শেষ টেস্টেও পরাজিত হয়েছে পাকিস্তান। এ ম্যাচের হারের ফলে তাদেরকে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা নিয়েই সিরিজটি শেষ করতে হলো। ম্যাচটিতে অজিদের দেওয়া ৪৬৫ রানের জবাবে ২৪৪ রানেই সব উইকেট হারিয়ে বসে পাকিস্তান। ফলে মিসবাহ্-উল-হকের দল ২২০ রানের হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে।এ নিয়ে টানা চারবার মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশের লজ্জায় পড়তে হলো পাকিস্তানকে। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুম থেকে শুরু করে তিন ম্যাচের সিরিজে টানা চতুর্থবারের মতো সবকটি ম্যাচেই হারের তিক্ততা পেল পাকিস্তান। টেস্টে একের পর এক খারাপ পারফরম্যান্সে র‌্যাঙ্কিংয়ে অবনতি অব্যাহত রয়েছে পাকিস্তানের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশের ফলে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে পঞ্চম স্থানে চলে গেছে মিসবাহ-উল-হকের দল। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশের ফলে ৫ রেটিং পয়েন্ট হারিয়েছে পাকিস্তান। ফলে সদ্য শেষ হওয়া এ সিরিজের পর ৯৭ পয়েন্ট নিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ের পঞ্চম স্থানে পাকিস্তান।মাত্র এক পয়েন্ট কম নিয়ে পাকিস্তানের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। গত বছরের জুলাই-আগস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ টেস্ট সিরিজে ২-২ ব্যবধানের ড্রয়ে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠে এসেছিল পাকিস্তান। সম্প্রতি দারুণ সাফল্যে ১০৯ পয়েন্ট নিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে অস্ট্রেলিয়া। ১০২ পয়েন্ট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা তৃতীয় এবং ১০১ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ ইংল্যান্ড। ৬৫ পয়েন্ট নিয়ে নবম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর ১২০ পয়েন্ট টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে অবস্থান করছে  ভারত।
টেস্টে টানা হারের গ্লানি নিয়ে ওয়ানডে শুরু করবে সফরকারী পাকিস্তান। দল টানা হারলেও পাকিস্তান ভক্তদের কাছে একটি সুখবরই এখন আলোচনার মূল বিষয়। যার কারণে ভক্তরা দলের এই লজ্জাজনক হারকে নিয়েও তেমন আমলে নিচ্ছে না। যে খবরটি দেশটির ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সেটি হলো, পাকিস্তানে ফিরছে তাদের স্বপ্নের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে দীর্ঘ ৮ বছর পর দেশটিতে খেলতে যাচ্ছে টেস্ট খেলুড়ে কোন দেশ।
জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চে পাকিস্তানের মাটিতে দু’টি টি- টোয়েন্ট খেলতে রাজি হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড। তবে এই ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ছাড়পত্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। এর আগে পাকিস্তান নিরাপত্তা দেবে এমন আশ্বাসে ক্যারিবীয়দের প্রস্তাব দেয়।এ প্রসঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড থেকে বলা হয়, আমরা পাকিস্তানের থেকে তাদের মাটিতে দু’টি টি-২০ ম্যাচ খেলার প্রস্তাব পেয়েছি। তবে আমাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। আমাদের বোর্ড পিসিবি থেকে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা প্রধানের কাছে পাঠিয়েছে।’ সম্প্রতি আইসিসি’র এক বৈঠকে পিসিবি তাদের মাটিতে ম্যাচ আয়োজনের ব্যাপারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে সমর্থ হয়। আগামী ১৮ ও ১৯ মার্চ ম্যাচগুলোর সম্ভাব্য ভেন্যু লাহোর। পরে দু’দল ফ্লোরিডায় আরও দু’টি ম্যাচ খেলবে।
এদিকে চলতি মাসের শেষে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে লাহোর সফরে যাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিরাপত্তা প্রতিনিধি দল। এর মাধ্যমে পুনরায় পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরে আসার একটি পথ অন্তত সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সম্পর্কিত আইসিসি’র বিশেষ টাস্ক ফোর্স প্রধান জাইলস ক্লার্কের নেতৃত্বে লাহোর সফরে আসছে ক্যারিবীয় দলটি। এ সম্পর্কে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাজাম শেঠী বলেছেন, ক্যারিবীয় সফরে যাবার আগে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দু’টি বা তিনটি টি২০ ম্যাচ খেলতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ক্যারিবীয়তে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলার আগে ফ্লোরিডায় আগামী মার্চ-এপ্রিলে তাদের বিপক্ষে সমসংখ্যক টি-২০ ম্যাচ খেলবে পাকিস্তান। শেঠী আরো জানিয়েছেন, পাকিস্তানের নিরাপত্তার ব্যবস্থার সার্বিক উন্নতি নিয়ে আমরা ক্লার্ককে বিস্তারিত জানাবো। গত বছর কেপ টাউনে আইসিসি কার্যনির্বাহী সভায় আন্তর্জাতিক দেশগুলো যাতে পুনরায় পাকিস্তান সফরে আসে সে সম্পর্কিত একটি প্রস্তাব পিসিবি উত্থাপন করেছিল। শেঠী বলেন, ২০০৯ সালের পর থেকে পাকিস্তানে বিদেশী দেশগুলো খেলতে না আসা আর্থিকভাবে দারুণ ক্ষতির মুখে পড়েছে পিসিবি। অন্তত পিসিবির প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করতে আইসিসি রাজি হয়েছে, এটাই আশার কথা।
২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার টিম বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পাকিস্তানের মাটিতে কোনো টেস্ট খেলুড়ে মেজর দল সফর করেনি। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল পাকিস্তান সফরে গিয়েছিল। তবে, সেটি পাকিস্তানে অন্য দলগুলোর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মতো অবস্থা তৈরি করতে পারেনি। তারপরও প্রাণ ফিরে পেয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেটে। তার সাথে দেশটির কোটি কোটি সমর্থক। আবেড়ে আপ্লুত খেলোয়াড়সহ ক্রিকেটের সাথে যুক্ত সাবেক ও বর্তমানরা। কারণ একটাই। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর পাকিস্তানে ফিরেছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ছিল উপচেপড়া পাকিস্তানীরা। শুধু নিজ দেশকেই নয়, সফরকারী জিম্বাবুয়েকেও অভিনন্দন জানাতে ভুল করেনি তারা। সফরকারীদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে দেশটির পক্ষ থেকে। পাকিস্তানীদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ জিম্বাবুয়ের সবাই। নিজেদের ফেসবুক-টুইটারে তারই প্রতিফলন দেখিয়েছেন তারা। অনেকেই লিখেছেন, খেলোয়াড়ি জীবনে এমন আতিথেয়তা তারা কখনোই পাননি। পাকিস্তানীদের আদর-আপ্যায়নে তারা মুগ্ধ। এবার যদি ওয়েস্টইন্ডিজ পাকিস্তান সফরে যায়, তাহলে একইভাবে আদর আপ্যায়ন করা হকে ক্যারিবীয়দের। দীর্ঘ আট বছর পর ঘরের মাটিতে খেলতে আসছে টেস্ট খেলুড়ে কোন দেশ, এই খবরে পাকিস্তানজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। অস্ট্রেলিয়া সফরে দলের বাজে পারফরমেন্সের পরও তারা আশাবাদী। দেশে আবারো আন্তর্জাতিক খেলা শুরু হবে- এটাই তারা চান। একই সাথে দীর্ঘ ৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটবে। 
দেশে টেস্ট খেলুড়ে কোন দলের খবরে যখন সবাই আনন্দে মাতোয়ারা তখন আরও একটি সংবাদ তাদের উৎসবের প্রেরণা যুগিয়েছে। সেটি হলো ‘প্রফেসর’ খ্যাত হাফিজের প্রত্যাবর্তন। মিসবাহ-উল-হক, শহীদ আফ্রিদির পর মোহাম্মদ হাফিজকেই ভাবা হতো পাকিস্তান ক্রিকেটের পরবর্তী কাণ্ডারী। টি-২০’র নেতৃত্ব পাওয়ার পর সময়ের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সে পথেই হাঁটছিলেন। কিন্তু অবৈধ বোলিং অ্যাকশনে ও ব্যাট হাতে ফর্মহীনতায় সব কেমন এলমেলো হয়ে যায়। অ্যাকশন শুধরে প্রায় ছয় মাস পর আবার ফিরলেন হাফিজ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজের দলে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন ৩৬ বছর বয়সী এই তারকা। বোলিং অ্যাকশনে আইসিসি’র বৈধতা পাওয়ার পাশাপাশি এ সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে চমৎকার পারফর্মেন্স দেখিয়ে নির্বাচকদের নজর কেড়েছেন। আজ শুক্রবার সিডনিতে প্রথম ম্যাচ দিয়ে শুরু পাঁচ ওয়ানডের সিরিজ। যেখানে আজহার আলীর নেতৃত্বে লড়বে সফরকারী পাকিস্তান। মিসবাহ্-উল-হকের দল এর আগে তিন টেস্টের সিরিজে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হয়। নবেম্বরে পর্যবেক্ষণের পর আইসিসির ছাড়পত্র পাওয়া হাফিজ ইতোমধ্যেই ঘরোয়া ক্রিকেটে অফস্পিন বোলিং করেছেন। ডিপার্টমেন্টাল ওয়ানডে কাপে ২৪৮ রান করেছেন, নিয়েছেন ১১ উইকেট। হাফিজ বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বল করতে পারিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে যেহেতু মাত্র একমাস বোলিং করছি তাই এটা আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি নিজেকে একজন ব্যাটসম্যানই বিবেচনা করি, যে প্রয়োজনে বোলিংও করতে পারে। এটাও জানি, কোন ম্যাচের সেরা একাদশে সুযোগ পেলে দল আমার বোলিংয়ের ওপরও নির্ভর করবে। তবে সে চাপ সামাল দিতে সক্ষম।’ পাকিস্তানের হয়ে ৯ টেস্ট ও ১১ ওয়ানডে সেঞ্চুরি করা ছাড়াও তিন ফরমেট মিলিয়ে ২২৭ উইকেট শিকার করা হাফিজ গত আগস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে খারাপ করার পর দল থেকে বাদ পড়েন। এই সময় কেবল ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলছিলেন। কারণ অনেক আগেই শ্রীলঙ্কা সফরে টেস্ট ম্যাচে বোলিং অ্যাকশন অবৈধ হয়।
গত বছরের জুনে ১ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে আইসিসি। এবার পুরোপুরি অ্যাকশন শুধরে ফিরে এলেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) এক কর্তা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত টিম ম্যানেজমেন্ট শেষদিকে হাফিজকে দলভুক্ত করার জন্য বলেছে এবং নির্বাচকরা সেই অনুরোধে সাড়া দিয়েছে। ওয়ানডে সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া রওনা হওয়ার আগে হাফিজ বলেছেন, চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ