মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

রাজধানীর যানজট

গতকাল বুধবারের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকেই আগেরদিন মঙ্গলবারের দুর্বিষহ যানজট সম্পর্কে সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কোনো দৈনিক ফার্মগেট থেকে মহাখালী পর্যন্ত, কোনো কোনো দৈনিক আবার মতিঝিল ও দিলকুশা থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ হয়ে গুলিস্তানসহ পুরনো ঢাকার বৃহত্তর কয়েকটি এলাকার ছবিসহ রিপোর্ট ছাপিয়েছে। খিলগাঁও, মগবাজার ও মিরপুর রোডের মতো এলাকাগুলোর ছবি না ছাপালেও বিবরণী রয়েছে বিভিন্ন দৈনিকের রিপোর্টে। প্রতিটি ছবিতে ও রিপোর্টেই শুধু গাড়ি আর গাড়ির কথা! রিপোর্টে বলা হয়েছে, সব গাড়িই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রিপোর্টগুলোতে রয়েছে হেঁটে চলা সাধারণ মানুষের কথা। রয়েছে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখী ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং অফিসগামী মানুষের কথাও। বাস্তবে মঙ্গলবার দুপুরের আগে থেকেই সমগ্র রাজধানী যানজটে স্থবির হয়ে পড়েছিল। যানজটে প্রতিদিনই কমবেশি পড়তে হলেও সেদিন রাজধানীবাসী একেরারে নাকাল হয়েছেন।
প্রকাশিত খবরে এই যানজটের জন্য আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ক্ষমতাসীন দলের আয়োজিত সমাবেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনোরকম সহিংস কর্মকা- যাতে ঘটতে না পারে সে উদ্দেশ্যেই কয়েকটি রাস্তা কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, রাস্তা বন্ধ থাকলেও গাড়ি তো যে কোনো রাস্তা দিয়েই চলাচল করতে পারে। সুতরাং সমাবেশের জন্য যানজটের সৃষ্টি হয়নি! মানতেই হবে, জ্ঞান ভালোই বিলিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। আসলেও গাড়ি তো যে কোনো রাস্তা দিয়েই চলতে পারে, কিন্তু যানজট যখন সমগ্র রাজধানীকেই স্থবির করে ফেলে, যখন এমনকি ফুটপাত দিয়েও হেঁটে চলাচল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে তখন কি কোনো একটি রাস্তাও আর চলাচলের উপযোগী থাকে? বাস্তবে সব রাস্তাই তো বন্ধ হয়ে যায়। গাড়ি তাহলে চলবে কিভাবে? ক্ষমতাসীন দলের সমাবেশ উপলক্ষে মঙ্গলবারও পুরো রাজধানীকে স্থবির করে ফেলা হয়েছিল। সব রাজপথই চলে গিয়েছিল দলটির নেতা-কর্মী এবং পুলিশের দখলে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তাসহ বেশ কিছু রাস্তায় গাড়ি চলাচল আগেই ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল। ফলে যানবাহন এবং মানুষের চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লেগেছে তিন-চার ঘণ্টা। বহু মানুষকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে। মৃত্যুর মুখোমুখি এসে যাওয়া রোগী বহনকারী কোনো অ্যাম্বুলেন্সকেও যেতে দেয়নি মারমুখী পুলিশ। সব মিলিয়েই নাকাল হয়েছেন রাজধানীবাসী। এ অবস্থা চলেছে সন্ধ্যারও অনেক পর পর্যন্ত- প্রকৃতপক্ষে রাত ১০-১১টার আগে যানচলাচল স্বাভাবিক হতে পারেনি।
আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে দলীয় নানা কর্মসূচি ও জনসমাবেশের জন্য এ ধরনের বাড়াবাড়ি এবং মানুষের ভোগান্তি কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এর আগেও বিভিন্ন উপলক্ষে আমরা রাজপথ বন্ধ করে প্রধানমন্ত্রীসহ ভিভিআইপিদের চলাচল এবং সভা-সমাবেশ করার বিরোধিতা করেছি। কারণ, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের জন্য কম করে হলেও আধ ঘণ্টা আগে থেকে ওই পথের সব মোড়ে ও সবদিকে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এসময় সাধারণ মানুষকেও পায়ে হেঁটে চলতে দেয়া হয় না। এর ফলে নির্দিষ্ট পথটিতে এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত মোড় ও সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সেই যানজট ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীতে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন যে যানজটের সৃষ্টি হয় তার একটি বড় কারণ প্রধানমন্ত্রীর এই যাওয়া-আসা। এজন্যই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি রাজপথে চলাচল কমিয়ে আনার এবং দরকারি সভা ও বৈঠকগুলো গণভবনে অথবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে যতো দিন যাচ্ছে ততোই ব্যস্ততা ও রাজপথে চলাচল বাড়িয়ে চলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ইদানীং আবার মাঝেমধ্যেই সভা-সমাবেশ করার ব্যাপারে তাকে বেশি আগ্রহী দেখা যাচ্ছে। মাত্র কিছুদিন আগেই তিনি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের নামে একই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দু’দিন ধরে সমাবেশ করেছেন। সে সময়ও ‘সের-এর ওপর সোয়া সের’ ধরনের নিরাপত্তার আয়োজন করা হয়েছিল। বন্ধ করা হয়েছিল সাধারণ মানুষের এবং যানবাহনের চলাচল। তখনও নাকাল হতে হয়েছিল সেই জনগণকে, যাদের ট্যাক্সের অর্থে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দেয়া হয় এবং সরকারের খরচ চালানো হয়। আশা করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনকেন্দ্রিক মাত্র ভয়াবহ যানজটের অভিজ্ঞতার আলোকে ক্ষমতাসীনরা সহজে আর মানুষকে ভোগান্তির শিকার বানাবেন না। কিন্তু  সে আশার গুড়ে বালু পড়েছে। মঙ্গলবার মানুষকে বরং অনেক বেশি কষ্ট ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
আমরা সভা-সমাবেশের নামে মানুষকে এভাবে নাকাল করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং মনে করি, ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত বিরোধী দল বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি না দেয়ার পাশাপাশি ক্ষমতার জোরে আওয়ামী লীগের সমাবেশ অনুষ্ঠান এবং সে সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে যানজট সৃষ্টির কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। যেহেতু ক্ষমতায় রয়েছেন সেহেতু সমাবেশ তারা প্রতিদিনই করতে পারেন কিন্তু তাই বলে যখন তখন রাজপথ বন্ধ করে মানুষকে নাকাল করার নীতি ও কার্যক্রমের অবশ্যই অবসান ঘটানো দরকার। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ধরনের উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী সহজেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে পারেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন রেডিও-টিভিতেও। তেমন ব্যবস্থা করা হলে রাজধানীবাসী অন্তত ভয়াবহ যানজটের কবল থেকে রেহাই পেতে পারেন। আমরা আশা করতে চাই, দলের নেতা ও উপদেষ্টাসহ ঘনিষ্ঠজনেরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলার সৎসাহস দেখাবেন। প্রধানমন্ত্রীরও উচিত নিজে থেকেই মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। বিএনপিকে অনুমতি না দেয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের জন্য এ ধরনের সমাবেশ করা উচিত হয়েছে কি না সে কথাটাও ভেবে দেখা দরকার বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ