সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পাঠ্যবই বিতরণের অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ

খুলনা অফিস : খুলনাঞ্চলে বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণে নানা অজুহাতে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বই বিতরণকালে সেশনচার্জের নামে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫শ’ থেকে এক হাজার টাকা নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ একাধিক অভিভাবকের। যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। এ ঘটনা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই উৎসবকে ম্লান করে দিয়েছে।

সাড়ে পাঁচশ’ টাকা না দেয়ায় মির্জাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাত্র দু’টি করে নতুন বই বিতরণ : ডুমুরিয়ায় মির্জাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পহেলা জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে মাত্র দু’টি করে নতুন বই বিতরণ করা হয়েছে। সাড়ে পাঁচশ’ টাকা না দিলে বাকি বই দেয়া হবে না বলে শিক্ষকরা জানিয়েছে। এ ঘটনায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আনন্দ বিনষ্ট, মানসিক বিপর্যয় ও প্রধানমন্ত্রীর অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ এনে শিক্ষামন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন অভিভাবকরা। সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের তদন্ত করেছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শেখ ফিরোজ আহমেদ। 

অভিযোগ ও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পহেলা জানুয়ারি মির্জাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৩৯ জন শিক্ষার্থীর মাঝে মাত্র দু’টি করে নতুন বই বিতরণ শেষে জানিয়ে দেয়া হয় সাড়ে পাঁচশ’ টাকা না দিলে বাকি বই দেয়া হবে না। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী হ্যাপি বৈরাগী, সোনালী মন্ডল, ৮ম শ্রেণীর পিয়াস রায়সহ অনেকেই জানায়, স্যারেরা সেশন চার্জ ও ভর্তি ফি বাবদ সাড়ে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে বাকি বই নিতে হবে জানিয়েছেন। বিষয়টি আমরা আমাদের মা-বাবাকে জানিয়েছি। 

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিভাবক প্রকাশ মন্ডল, হারুন শেখসহ অনেকেই জানান, বিদ্যালয়ের সভাপতি অরুণ কুমার মহলদার ঢাকাবাসী। তার কোন তদারকি নেই বললেই চলে। ফলে খেয়াল খুশি মতো চলছে সবকিছু। বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছি আমরা।  ঘটনা প্রসঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিনয় কৃষ্ণ বাছাড় তার ভুল স্বীকার করে বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে ওই দিন সকল শিক্ষার্থীর মাঝে সব বই তুলে দেয়া সম্ভব হয়নি, তবে পরদিন বিতরণ করা হয়েছে। আর সাড়ে পাঁচশ’ টাকা না দিলে বাকি বই দেয়া হবে না বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা বইয়ের বিনিময়ে কোন টাকা চাইনি আর চাইবো কেন। এ প্রসঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শেখ ফিরোজ আহমেদ জানান, তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পাইকগাছায় টাকার বিনিময়ে বই : রোববার সারা দেশের ন্যায় পাইকগাছাতেও উদযাপিত হয়েছে ‘বই উৎসব’। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে নতুই বই তুলে দেয়ার কথা থাকলেও উপজেলার রাড়–লী ইউনিয়নের আর কে বি কে হরিশ্চন্দ্র কলেজিয়েট স্কুলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ওই স্কুলের ৭ম শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে প্রান্ত দাশ ও হাবিবুল্লাহ সরদার। প্রান্তর পিতা কার্ত্তিক দাশ ও হাবিবুল্লার পিতা আজিজ সরদার বলেন, প্রথমে ১০০ টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরে অনেক অনুরোধের পর ৫০ টাকা করে নিয়ে বই দেয়া হয়েছে। এভাবে প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে।  এ ব্যাপারে কলেজিয়েট স্কুলের অধ্যক্ষ গোপাল চন্দ্র ঘোষ প্রথমে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করেন। পরে আবার ফোন করে বলেন, আসলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী সারা বছর বেতন দেয় না। মূলত তাদের কাছ থেকে সেশনচার্জ হিসেবে ১০০, ৫০ এমনকি ২০ টাকাও নেয়া হয়েছে। আবার অনেকে দেয়নি।

শরণখোলায় বই উৎসবে সেশন চার্জের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ : বাগেরহাটের শরণখোলা রায়েন্দা মডেল হাইস্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের প্রথম দিন নানা অজুহাতে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বই বিতরণকালে সেশন চার্জের নামে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ একাধিক অভিভাবকের। যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। এ ঘটনা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই উৎসবকে ম্লান করে দিয়েছে। 

অভিভাবক হাজী মো. আবুল হোসেন নান্টু বলেন, আমি পার্শ্ববর্তী আরকেডিএস বালিকা বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। আমার ছেলে মাহফুজুর রহমান সাজু মডেল হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। সকালে সে স্কুলে বই নিতে গেলে তার কাছে টাকা দাবি করা হয়। পরে ছেলে এসে আমাকে জানালে শিক্ষকদেরকে অনুরোধ করে বই নিতে হয়। তবে টাকা দিতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থীকে বই না নিয়েই খালি হাতে ফিরে যেতে দেখা গেছে। 

শরণখোলা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান খান বলেন, আনুষ্ঠানিক বই বিতরণের উদ্বোধন কালে কোনো প্রকার টাকা না নেয়ার জন্য সকলতে সতর্ক করা হয়েছে। তারপরও এমনটা করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, রায়েন্দা মডেল হাইস্কুল একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা বিরোধী একটি চক্রের দখলে। তারা সরকারের এই সফলতাকে ব্যাহত করতে বিনামূল্যের বই থেকে অর্থ বাণিজ্য শুরু করেছে। উৎসবের দিনে তারা টাকা নিয়ে সরকারের সুনাম নষ্ট করেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি। 

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মীর আলিফ রেজা বলেন, বই উৎসবের দিনে কোনো প্রকার অর্থ গ্রহণ অনৈতিক। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।  তবে রায়েন্দা পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সুলতান আহম্মেদ গাজী বলেন, বই বিতরণে কোন টাকা গ্রহণ করা হয়নি। ভর্তি ফি ও সেশন চার্জ বাবদ টাকা নেয়া হলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেয়া হয়।  বাগেরহাট জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ^াস বলেন, আইনে এ ধরনের কোন সুযোগ নেই। কেউ এ ধরনের অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ