শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নিম্নমানের পণ্যে ‘এ’ সনদের লোগো ব্যবহারে প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতারা

এইচ এম আকতার : পণ্যের গুণমান বা প্রতিষ্ঠানে সেবা বিবেচনায় ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও) সনদ গুরুত্ব বহন করছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক এ সনদ। নিম্নমানে অনেক পণ্যে এখন এ সনদের লোগো ব্যবহার হচ্ছে। এতে করে প্রতিনিয়ত ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। কি কি গুণ বিবেচনায় কোন সনদের লোগো ব্যবহার করতে হবে তা দেখার কেউ নেই। আর এ কারণেই কোম্পানিগুলো নিজের ইচ্ছা মতো টাকার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক এসব সনদ ব্যবহার করছে।

ব্যবসা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক টেন্ডারে অংশগ্রহণ, মান অর্জন, ক্ষতি প্রতিরোধসহ নানা কাজে আইএসও সনদ গুরুত্ব বহন করছে। শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, দেশেও এখন পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন হয় এ সনদে। আইএসও সনদ পেলেই সেসব প্রতিষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে বাড়াচ্ছেন ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’। তবে বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক এ সনদ।

আইএসও’র সদর দফতর সুইজারল্যান্ডে। এ প্রতিষ্ঠানটি কোনো সনদ প্রদান করে না, এটি মূলত বিভিন্ন ধরনের মান তৈরি ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন দেশের সার্টিফিকেশন বডি সংস্থাটির মান অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করে ‘আইএসও’ সনদ দিয়ে থাকে। আর এসব সার্টিফিকেশন বডির তদারকি করে সেই দেশের এক্রিডিটেশন বোর্ড।

বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে এ আইএসও সনদ প্রদানের সার্টিফিকেশন বডি। যাদের কোনো তদারকি বা পরিসংখ্যান নেই। তাদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ এক্রিডিটেশন বোর্ড (বিএবি) গঠন করা হলেও তা থেকে অনুমোদন নেয়নি একটি ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান। উদ্বেগের হলেও সতি, দেশে এ পর্যন্ত কতগুলো প্রতিষ্ঠান আইএসও সনদ লাভ করেছে সে পরিসংখ্যানও নেই। টাকা পেলে এসব সার্টিফিকেশন বডি থেকে মেলে আইএসও সনদ, এমন অভিযোগের শেষ নেই। 

দুর্নীতি আর নিম্নমানের কারণে বিএবি কোন প্রতিষ্ঠানের সনদ বাতিল করেছে এমন কোন প্রমাণ নেই। আর এ কারণেই যত্রতত্র এসব সনদধারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আর ফলাও করে তা প্রচারও করছে। এতে করে ক্রেতা এবং সেবা গ্রহণকারীরা নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

শুধু তা-ই নয়, তদারকি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই লঙ্ঘন করা হচ্ছে এ আন্তর্জাতিক সনদের শর্ত। এদিকে ক্ষেত্রবিশেষে তিন বছর মেয়াদি এ সনদ নিয়ে প্রতিষ্ঠান ফলাও করছে আজীবন। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও সনদ নবায়ন হচ্ছে না। এছাড়া পণ্যের মোড়কের ফলাও করে এ সনদেও লোগো ব্যবহার করে ভোক্তাদের আকর্ষণ করা হচ্ছে। আবার নতুন ভার্সনের আইএসও’র মান প্রকাশ হলেও পুরনো সনদ দিচ্ছে সার্টিফিকেশন বডি। এসবই আইএসও’র শর্ত পরিপন্থী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সরকারি পর্যায়ে একমাত্র মান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ‘বিএসটিআই’ আইএসও সনদ দিচ্ছে। এটি ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে একমাত্র ইউনাইটেড সার্টিফিকেশন সার্ভিস লিমিটেড বিএটি থেকে সার্টিফিকেশন বডি হিসেবে সনদ নিয়েছে। এছাড়া দেশে আরও ১৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সনদ প্রদান করছে। যারা মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সার্টিফিকেশন বডির এজেন্ট হিসেবে নিজেদের দাবি করে থাকেন। তবে কোথায়, কী পদ্ধতিতে এসব প্রতিষ্ঠান সনদ দিচ্ছে, এসবের কোনো তথ্য নেই। ভালো অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কম নয়। যারা অর্থের বিনিময়ে সনদ বিক্রির মতো কার্যক্রমে জড়িত।

বিএবি’র তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে তাদের কাছে স্পেশালাইজ বিজনেস সলিউশন (এসজিএস), ইউনাইটেড রেজিস্টার অব সিস্টেম (ইউআরএস), ব্যুরো ভেরিটাস, এডভান্স এসেসমেন্ট সার্ভিস (এএএস), কিউ টেক্স সলিউশন, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেশন, ইন্টারটেক, ডিএএস সার্টিফিকেশন, দ্য ব্রিটিশ এসেসমেন্ট ব্যুরো (বিএবি), এজিএ’র মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের তালিকা রয়েছে, তবে তাদের বিএবি’র সনদ নেই।

এ বিষয়ে বিএবি’র মহাপরিচালক আবু আবদুল্লাহ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইন হলেও আইএসও সনদ প্রদান ভলেন্টারি সার্ভিস হওয়াতে বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। তবে সরকার চাইলে তাদের একটি নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব।

বাংলাদেশে আইএসও ৯০০১ (কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য), আইএসও ১৪০০১ (এনভায়নরেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য), আইএসও ২২০০০ (ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য), আইএসও ১৮০০১ (অকুপেশনাল হেলথ এন্ড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য) বহুল প্রচলিত। এসব সনদের মেয়াদ তিন বছর। আর কয়েক বছর পরপরই এসব সনদের নতুন ভার্সন আসে। তবে বাংলাদেশে পুরনো ভার্সনের আইএসও প্রদানেরও ঘটনা ঘটছে। যেমন বর্তমানে পণ্যমানের জন্য আইএসও ৯০০১ঃ২০১৫ দেওয়া হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান আইএসও ৯০০১ঃ২০০৮ সনদ দিচ্ছে।

অন্যদিকে, পরিবেশজনিত সফলতার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান আইএসও ১৪০০১ লাভ করছে, যা সেই প্রতিষ্ঠানের পণ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তবে পণ্যের মোড়কে বা বিজ্ঞাপনে সেই সনদের প্রচার করে ক্রেতা আকর্ষণ করা হচ্ছে।

এসব বিষয়ে বিএসটিআই ১৫ সদস্যের আইএসও সনদ কমিটির প্রধান ও উপ-পরিচালক প্রশাসন আ ন ম আসাদুজ্জামান বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক মাসের মধ্যেও আইএসও প্রদানের ঘটনা ঘটছে। এ সময়ের মধ্যে তারা কীভাবে তদন্ত করছে, রিপোর্ট তৈরি করে তাদের মূল প্রতিষ্ঠানে দিচ্ছে, সনদ আনছে, আমার মাথায় আসে না। আমরা বরাবর এটা নিয়ে কথা বলে যাচ্ছি। প্রশ্নবিদ্ধ তাদের কার্যক্রমে বিএসটিআই’র দেওয়া সনদেরও মান ক্ষুণœœ হচ্ছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, টাকার বিনিময়ে দেশে সবই সম্ভব হচ্ছে। আর আইএসও হবে না কেন। টাকা হলে সবই সম্ভব। কীভাবে, কে সনদ দিচ্ছে, তা তো দেখার কেউ নেই। কার সার্টিফিকেট, কে চেক করে দেখবে।

প্রসঙ্গত, কোনো ক্ষেত্রে আইএসও সনদ প্রদান ও গ্রহণের কার্যক্রম কয়েকটি ধাপে সম্পাদিত হয়। এ সনদের আবশ্যিক শর্তগুলো আইএসও সিস্টেম সার্টিফিকেশন ১৭০২১ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়ে থাকে। সনদের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পর অভ্যন্তরীণ অডিট করা হয়, যা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডকে মিলিয়ে দেখা। এ অডিটের ওপরই নির্ভর করে আইএসও সনদপ্রাপ্তি। আবার তিন বছর মেয়াদি এ সনদ লাভ করলেও সনদের ধার্য করা সময়ে প্রতিবছর পিরিয়ডিক অডিট সম্পাদিত করতে হয় সার্টিফিকেশন বডির।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ