মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায় উৎপত্তি হওয়া মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে অনুভূত এ ভূকম্পনে আতংকগ্রস্ত মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হুড়োহুড়ি করে। এদিকে, ভূমিকম্পে আতংকে সুনামগঞ্জে এক বৃদ্ধসহ ২ জনের মৃত্যু ও ২ মাদরাসা শিক্ষার্থী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সিলেট ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে পাকা ভবনে ফাটল কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত দুই বছরে অন্তত ১২ বার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, রিখটার স্কেলে ৪ থেকে ৪ দশমিক ৯৯ মাত্রাকে মৃদু ভূম্পিকম্প হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া ৫ থেকে ৫ দশমিক ৯৯ মাত্রাকে ‘মাঝারি’, ৬ থেকে ৬ দশমিক ৯৯ মাত্রাকে ‘শক্তিশালী’, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৯৯ মাত্রাকে ‘ভয়াবহ’ এবং মাত্রা ৮ এর বেশি হলে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ ভূমিকম্প বিবেচনা করা হয়। 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ১৭৬ কিলোমিটার দূরে ভারতের ত্রিপুরায়। উৎপত্তিস্থলে এ কম্পনের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭।

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত আর্থ অবজারভেটরির তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, বিকেল ৩টা ৯ মিনিটে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ১৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব এবং আগরতলা থেকে ৭৬ কিলোমিটার পূর্বে। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল ত্রিপুরার আম্বাসা এলাকায়, ভূপৃষ্ঠের ৩৬ কিলোমিটার গভীরে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ত্রিপুরার আগরতলার কাছে আম্বাসা থেকে ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। গভীরতা ছিল ৩৬ দশমিক ১ কিলোমিটার। ভারতের বিভিন্ন জরিপ সংস্থা থেকে এর মাত্রা ৫ দশমিক ৭ পর্যন্তও বলা হচ্ছে।

 বেশ কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূকম্পনের পর আরো কয়েকটি প্রতিঘাত টের পাওয়া যায়। এ সময় আতঙ্কে রাজধানীসহ সারাদেশেই ঘর বাড়ি, দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠান ছেড়ে খোলা রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করে। বিকেলে অফিস ছুটির ঘণ্টা দুই আগে রাজধানীর ভবনগুলো ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন সবাই।

জাতীয় সংসদের গণসংযোগ অধিশাখা-২ এর পরিচালক লাবণ্য আহমেদ বলেন, সংসদের মত এত বড় স্থাপনাও কেঁপে ওঠে। অনেকে আতঙ্কে ছুটাছুটি করতে থাকেন। তবে কেউ হতাহত হননি।

রামপুরা এলাকার এক সংবাদকর্মী জানান, ভূমিকম্পের সময় তাদের বাসাটি যেন ভাসমান নৌকার মতো দুলছিল।

পূর্ব ও দক্ষিণের সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ফেনী, চট্টগ্রাম অঞ্চল ছাড়াও মধ্য ও উত্তরের অধিকাংশ জেলায় এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে বলে খবর দিয়েছেন দৈনিক সংগ্রামের ব্যুরো-অফিস ও সংবাদদাতারা। ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী জনপদে বেশি অনুভূত হয়েছে এ ভূমিকম্প।

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ছাতক উপজেলার শামসুল হকের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে সায়মা আক্তার (১৪) ও জগন্নাথপুর উপজেলার হিরণ মিয়ার (৬০) মৃত্যু হয়েছে। আহত হয় একই উপজেলার মাদরাসা শিক্ষার্থী নাদিউর রহমান (১৩)। হিরণ মিয়া জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের আমাসপুর গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয়রা জানান, এদিন বিকেলে হিরণ মিয়া নিজ ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ ভূমিকম্প হওয়ায় ঘর থেকে দ্রুত বের হতে গিয়ে তিনি দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বলেন, নিহত সায়মা আক্তারের বাবা শামসুল হক ছাতক সিমেন্ট কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ভূমিকম্পের সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে চারতলার ঘর থেকে দৌড়ে নিচে নামার সময় সিঁড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যায় সায়মা। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সায়মাকে মৃত ঘোষণা করেন। সায়মা আক্তার ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

এছাড়া আহত হয়েছে উপজেলার পাটলী দারুল উলুম এমদাদিয়া মাদারাসার পঞ্চম শ্রেণির আবাসিক ছাত্র নাজিউর রহমান (১৩)। সে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা সদরের আবদুল হাইয়ের ছেলে। ভূমিকম্পের সময় নাজিউর মাদরাসার দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিলে মাথায় আঘাত পান। তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া জগন্নাথপুর পৌরশহরের বাসিন্দা তকবুর মিয়ার মেয়ে রুবি বেগম ঘটনার সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিসক ডা. মধুসুদন ধর জানান, ভূমিকম্পের পরপরই হিরণ মিয়া নামের একজনকে হাসাপতালে আনার আগেই মারা যান। এছাড়া নাজিউর রহমান ও রুবি আক্তার নামের দুজনকে হাসাপতালের আনা হলে নাজিউরের আঘাত বেশি হওয়ায় তাকে ওসমানী হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। আর রুবি বেগমকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। 

সিলেট ব্যুরো জানায়, ভূকম্পন প্রথমে মৃদু মাত্রায় শুরু হলেও হঠাৎ বেশ জোরে ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে সিলেট নগরের বাসা-বাড়ি, বিপণি বিতান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লোকজন দ্রুত বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। এসময় জিন্দাবাজারের ব্যস্ততম সড়কগুলোতে মানুষের অবস্থানের কারণে দেখা দেয় তীব্র যানজট। অন্যদিকে ভূমিকম্পে জিন্দাবাজারের নির্মাণাধীন একটি ভবনের দেয়ালের কয়েকটি ইট ধসে পড়ে। এতে একটি মোটরসাইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে মানুষের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

কুমিল্লা অফিস জানায়, ভূমিকম্পে শহরের কান্দিরপাড় এলাকার সিটি মার্কেটে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিকেলে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর থেকে এ ফাটল সৃষ্টি হয় বলে জানান স্থানীয়রা। সিটি মার্কেট ব্যতীত আর কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

দুই বছরের ১২ বার ভূমিকম্প : গত ২০১৬ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলে ১২টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর ৭টি ও আগের বছর ৫টি। গত বছর ২৩ অগাস্ট মিয়ানমারের মলাইকে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে। ১ আগস্ট মিয়ানমারের পাকুক্কু এলাকায় ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয় অনুভূত হয় যা চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ২৭ জুলাই মিয়ানমারের পাকুক্কু এলাকায় ৪ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয় অনুভূত হয় যা চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ২৭ জুন খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ৪ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। তার আগে ১৩ এপ্রিল মিয়ানমারে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। কয়েকটি ভবন হেলে পড়ে, হুড়োহুড়িতে আহত হয় বহু মানুষ। এপ্রিলের ৫ তারিখে ভারতের মেঘালয়ে ৪ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় ঢাকাসহ বাংলাদেশের উত্তর অংশের বিভিন্ন জেলায়। আর ২০১৬ সালের প্রথম ভূকিম্প অনুভূত হয় ১ এপ্রিল। ভারতের মনিপুর অঞ্চলে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকা, জামালপুর, রাজশাহী, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটে হুড়োহুড়ির মধ্যে আতঙ্কে মৃত্যু হয় পাঁচজনের। আহত হয়ে ঢাকা ও সিলেটে হাসপাতালে ভর্তি হন অর্ধশতাধিক। বেশ কিছু ঘরবাড়িতে ফাটল দেখা যায়। 

২০১৫ সালে ২৫ এপ্রিল নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে আট হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়; ক্ষয়ক্ষতি হয় ভারত ও বাংলাদেশেও। ওই বছর ৩০ অক্টোবর ভারতের আসামে ৪ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলেও। ২৮ জুন ভারতের আসামে ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় সিলেটসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। এছাড়া নেপালে ১৬ মে ও ২৭ এপ্রিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭ ও ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ