মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে ভয়াবহ আগুন : হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর গুলশান ১ ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুনে শতাধিক দোকান পুড়ে যায় -সংগ্রাম
  • আগুন লাগানো হয়েছে, অভিযোগ ব্যবসায়ীদের 
  • নাশকতা নয়: আনিসুল হক
  • ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি

স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে ডিএনসিসি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা এবং কাঁচাবাজারের অংশটি ধসে পড়েছে। সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে পাঁচ শতাধিক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট দীর্ঘ সাড়ে ১৬ ঘণ্টা পর গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। 

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মার্কেটে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডিএনসিসি’র মেয়র আনিসুল হক জানিয়েছেন, আগুন লাগানো হয়নি, এটি নিছক দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুপুরে ঘটনাস্থলে আসেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ডা. রিয়াজুল হক, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহিদুল হক, ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশের ঊধর্¦তন কর্মকর্তারা। 

মার্কেটে আগুন লাগার পর গুলশান এক নম্বর সড়ক থেকে সবধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এত আশপাশের ও ভিআইপি সড়কেও যানচলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। মহাখালী-গুলশান, গুলশান-২ থেকে গুলশান-১ ও হাতিরঝিল এবং বাড্ডা লিংক রোড থেকে গুলশান-১ এলাকায় যাতায়াতের রাস্তা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যাত্রীবাহী গাড়ি চলছে ধীরগতিতে। এর ফলে অন্যান্য সড়কেও সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড যানজট। এতে দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। দুপুরের পর যানজট পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। 

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, মার্কেটের পূর্ব দিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে পুরো মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কেটের পূর্বপাশের কাঁচাবাজার অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পুরো মার্কেটই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। প্রায় ১৬ ঘণ্টায়ও আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় বিকেলে অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এক সময় মার্কেটের একদল ব্যবসায়ী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ওপর চড়াও হন। 

জানা গেছে, গুলশান-১ নম্বরে সিটি করপোরেশনের প্রায় সাত বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বিপণি বিতানে কাঁচা ও পাকা মার্কেট মিলিয়ে দুই অংশে দোকান রয়েছে ছয়শর মত। নিচতলায় বড় একটি অংশে আসবাবপত্রের পাশাপাশি খাবার ও গ্যাস সিলিন্ডার মেরামতের দোকান রয়েছে। দোতলায় রয়েছে আমদানি করা খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, পোশাক, প্লাস্টিক পণ্য, গয়না ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান। আর নিচতলায় পূর্ব অংশে রয়েছে কাঁচাবাজার। পাকা মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস এম তালাল রিজভী বলেন, রাত আড়াইটার দিকে আগুন লেগেছে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান। 

তখন ফায়ার সার্ভিসের মাত্র দুটি ইউনিট ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটের স্বল্পতার কারণে দুই মার্কেটই আগুনে পুড়েছে। ভোর ৪টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট বাড়ানো হয়। আগে বাড়ালে ক্ষতি এত হত না। ফায়ার সার্ভিস তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ জানাতে না পারলেও দুই মার্কেট মিলিয়ে কমপক্ষে দেড়শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দাবি করেন রিজভী। 

গভীর রাতে কর্মচারীদের কাছ থেকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন মার্কেটের সামনে। তাদের অনেককেই মরিয়া হয়ে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। যাদের দোকান তখনও অক্ষত, তারা মালামাল নামিয়ে মার্কেটের সামনের খোলা অংশে জড়ো করতে থাকেন। গতকাল ভোর থেকে বহু দোকান মালিক ও কর্মচারীরা ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে ভিড় করেন। ডিসিসির এই মার্কেটে প্রায় দেড় হাজার দোকান আছে বলে সেখানকার কয়েকজন মালিক জানিয়েছেন। দিনভর চোখের সামনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়তে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন অনেকে। এ সময় তাদের আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। দুপুরেও যখন গুলশান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মার্কেট থেকে আগুনের শিখা আর ধোঁয়া বের হচ্ছিল, তখন জাফর বুক চাপড়িয়ে প্রলাপ বকছিলেন। অনেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ বাতাস করছেন, কেউ আবার পানি খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু কেউই তাকে বুঝ দিতে পারছেন না। যে যার মতো আগুনে বেঁচে যাওয়া সরঞ্জাম বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন তারা। 

আশা ইনপেক্স নামের আরেক দোকানের মালিক আবু বকর বলেন, ‘খবর পেয়ে রাত পৌনে দুটায় এসেছি। এখনও ভিতরে প্রবেশ করতে পারিনি। ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি। কোনো মালই বের করতে পারি নাই। প্রায় কোটি টাকার মাল ছিল দোকানে। আবু বকরের পাশেই দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছিলেন আরেক দোকানি শহীদ। মার্কেটে দুটি কার্পেটের দোকান শহীদের। দুটোই পুড়ে গেছে। রাত থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে। কয়েকবার ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলেও ফায়ার সার্ভিস আর পুলিশের সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার সমস্ত বিনিয়োগ এই দোকানেই। এর বাইরে পুঁজি বলতে আর কিছুই নেই। শত চেষ্টা করেও মনকে শান্ত করতে পারছি না।

একজন ব্যবসায়ী জানান, নিচতলায় বড় একটি অংশে রয়েছে আসবাবপত্রের দোকান। বেশ কিছু খাবারের দোকানও রয়েছে। দোতলায় রয়েছে আমদানি করা খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, পোশাক, প্লাস্টিক পণ্য ও গয়নার দোকান। মার্কেটের নিচতলায় গ্যাস সিলিন্ডার মেরামতের কয়েকটি দোকান আছে। সকালেও সেখান থেকে বিস্ফোরণের মত শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। নিচতলায় পূর্ব অংশে রয়েছে কাঁচাবাজার। ওই দিকেই ডিএনসিসি মার্কেটের লাগোয়া চার তলা গুলশান শপিং সেন্টার। তবে সেখানে আগুন লাগেনি বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শাহজাহান জানান, ভোর সোয়া ৪টার দিকে মার্কেটের পেছনের একটি অংশ ধসে পড়ে। কাছাকাছি সময়ে ধসে পড়ে সামনের একটি অংশও। এক দোকান মালিক বলেন, মার্কেটের এক নিরাপত্তারক্ষীর কাছে রাত ২টায় তিনি আগুন লাগার খবর পান। ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ওই নিরাপত্তাকর্মী তাকে জানিয়েছেন। আরেক দোকানী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার কসমেটিকসের দোকান ছিল দোতলায়। চোখের সামনে সব ছাই হয়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। 

 দোকান মালিক সমিতির এক নেতাকে ফায়ার সার্ভিসের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ভোর পৌনে ৫টার দিকে মার্কেটের একদল ব্যবসায়ী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের উপর চড়াও হলে তারা সরে যান। প্রায় ১৫ মিনিট পর পানি নিয়ে নতুন করে আগুন নেভাতে শুরু করেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, পানির স্বল্পতার কারণে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে। পেছনের লেক থেকে পানি এনে কাজ চালাচ্ছেন তারা। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে এসে মেয়র আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে মনে হয় বিদ্যুতের আগুন। এতে দাহ্য পণ্য, খাবার, পারফিউম.. কোনো জীবনহানি হয়েছে বলে আমাদের জানা নাই। মেয়র বলেন, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশের ভবন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে চেষ্টাও তারা করছেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে কত সময় লাগবে তা বলা সম্ভাব হচ্ছে না।

আগুন লাগানো হয়েছে, অভিযোগ ব্যবসায়ীদের: অনেকেরই সন্দেহ, লাগানো হয়েছে এই আগুন। ১২৯ নম্বর দোকানের মালিক মো. বাবু বলেন, মার্কেট বিক্রি হয়েছে কয়েক বার। ভাঙতে না পেরে সিস্টেমে ফেলে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে কেউ আগুন দিয়েছে। ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের ছিল খেলনার দোকান। দুদিন আগে নতুন মাল তুলেছিলেন তিনি। দেলোয়ার বলেন, একটা সুতাও বের করতে পারি নাই। সব জিনিসপত্র ছাই হয়ে গেছে। যারা মার্কেট ভাঙার ষড়যন্ত্র করছিল তারাই আগুন দিয়েছে। এই মার্কেটটা ঘিরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হত। সবার জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ডিএনসিসি কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি ১৯ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন সিদ্দিকী জানান, সাত বিঘা জমির ওপর এই মার্কেটের পাকা মার্কেট অংশটি আছে ১৯৬২-৬৩ সাল থেকে। ১৯৮২ সালে সিটি করপোরেশন কাঁচা মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেয়। ২০০৩ সালে মার্কেটের জায়গায় পিপিপির আওতায় ১৮ তলা গুলশান ট্রেড সেন্টার নির্মাণের দরপত্র দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েও তা করতে অপারগতা জানালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা মেট্রো গ্রুপের আমিন অ্যাসোসিয়েটস ওভারসিজ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। ওই চুক্তিতে বলা হয়, ভবনের আটতলা পর্যন্ত থাকবে দোকান, নয় থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত হবে অফিস। দুই হাজার ২৪টি দোকানের মধ্যে ডিএনসিসি পাবে ২৭ শতাংশ। আর আমিন অ্যাসোসিয়েটস ৭৩ শতাংশ দোকান পাবে এবং তা বিক্রি করে লাভ তুলে নেবে। কিন্তু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই চুক্তি স্থগিত করে ভবনে ডিসিসির মালিকানা বাড়াতে বলা হয়। এরপর ডিসিসির মালিকানা বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করে নতুন চুক্তি হয়। কিন্তু দোকান মালিক সমিতি এরপর মামলা করলে ঠিকাদার কোম্পানি সেখানে আর ভবন তুলতে পারেনি বলে জানান ডিএনসিসি কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শের মোহাম্মদ। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং মেট্রো গ্রুপ এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত। ডিএনসিসি পাকা মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি জয়নাল আবেদিনও একই সন্দেহের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এটা পরিকল্পিতভাবে কেউ করেছে। আমরা দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছি। দোকান মালিকদের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সাংবাদিকরা দুপুরে মেট্রো গ্রুপের গুলশান কার্যালয়ে গেলে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। মার্কেটের আগুন কীভাবে লেগেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। এ বাহিনীর পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, একটা বিল্ডিং কলাপস করেছে। কোনো ক্যাজুয়ালটি হয়নি। এখানে কমবাস্টেবল ও ফ্লেইম্লে লিকুইড ছড়িয়ে আছে। ডেঞ্জারাস জিনিসপত্র আছে।

দুপুরে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা- তা খতিয়ে দেখতে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি পুলিশ, দোকান মালিক ও স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা একটি তদন্ত কমিটি করা উচিত। ব্যবসায়ীরা ফায়ার সার্ভিসের কাজে ধীরগতির অভিযোগ আনলেও অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস বলছে, মার্কেটে অগ্নি নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাঁচা মার্কেট সমিতির সহসভাপতি হুমায়ুন সিদ্দিকী বলেন, তাদের গোটা ১৫ এক্সটিংগুইশার ছিল। আগুন লাগার পর সেগুলো ব্যবহার করে নেভানোর চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, কীভাবে আগুন লেগেছে তা তদন্ত করে দেখা হবে।

আগুন নাশকতা নয়- আনিসুল হক: ডিএনসিসি মার্কেটে আগুন লাগার ঘটনা নাশকতা নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মেয়র আনিসুল হক সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। আনিসুল হক বলেন, স্বাভাবিকভাবে মনে হয় বিদ্যুতের আগুন। নাশকতা বলে মনে হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘তবে এটা মেয়রের পক্ষে বলা সম্ভব নয়, মেয়র নাশকতা এক্সপার্ট না। পুলিশ ভালো বলতে পারবে। মেয়র হিসেবে আমার মনে হয়, নাশকতা না হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ পারসেন্ট।

মার্কেটের মালামাল গুলশানের রাস্তায়: পাশের দোকানগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আশঙ্কায় মার্কেটের অন্যান্য দোকানের মালামালও রাস্তায় নামিয়ে রাখা হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, ডিএনসিসি মার্কেটের অধিকাংশ দোকান পুড়ে গেছে। মার্কেটের অন্যান্য দোকানের মালামাল সরিয়ে রাস্তায় নামিয়ে রাখছেন মালিকরা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পাশের গুলশান শপিং সেন্টারের প্রায় সব দোকানের মালামাল রাস্তায় নামিয়ে রাখা হয়েছে। আর আগুন লাগার পর তাৎক্ষনিকভাবে যেসব ব্যবসায়ী কিছু মালামাল বের করতে পারছেন সেগুলোও রাস্তায় রেখেছেন। এই মালামাল কোথায় নিয়ে রাখবেন তা নিয়েও চিন্তিত তারা। 

গুলশান-১ গোল চত্বর ও আশপাশের সড়কে যত্রতত্র রাখা হয়েছে দামি চেয়ার, টেবিল, খাট, ড্রেসিং টেবিল, সোফা, আলমারি, এসি, নামি শোপিস, ডাইনিং টেবিলসহ গৃহসজ্জার নানা সরঞ্জাম। এসব মালামালে প্রায় ভরে গেছে গুলশানের রাস্তা। অনেকে আবার ট্রাকে নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছেন এসব জিনিসপত্র। মার্কেটের ফার্নিচার দোকান মালিক আবুল হোসেন বলেন, যে কোনো সময় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মালামাল নিরাপদ দূরত্বে সরানোর চেষ্টা করছি। তবে মালামাল খোয়া যাওয়ার ভয়ও কাজ করছে। তাই নিরাপত্তা দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বার বার অনুরোধ জানাচ্ছি। ডিএনসিসি মার্কেটের রিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক রুনা আহমেদ আহজারি করে বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ ফায়ার সার্ভিস। তারা ঠিক মতো পানি দিলে আগুন হয়তো নিভে যেত। আমার দেড় কোটি টাকার মালামাল আছে দোকানে। সব শেষ হয়ে যেতে বসেছে।

এক দোকানেই পুড়ল পাঁচজনের ‘কপাল’: ২০ বছর ধরে গুলশান কাঁচাবাজার সুপারমার্কেটে নিজের দোকান চালান মো. জামাল হোসেন। এই দোকানের আয় দিয়েই তার পরিবার ও চার কর্মচারীর পরিবার চলে। আগুন লাগার খবর পেয়ে রাতেই মার্কেটে ছুটে আসেন জামাল হোসেন ও তার কর্মচারীরা। দোকান থেকে কোনো কিছুই তারা বের করতে পারেননি। এমনকি নগদ টাকাও না।

ব্যবসায়িক ক্ষতির হিসাব কষে মুষড়ে পড়েছেন জামাল হোসেন। কথা বলার সময় বারবার ভিজে উঠছিল তার চোখ। তিনি বলেন, ‘ক্যাশে নগদ ছিল সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। আড়াইটায় আগুনের খবর পেয়ে চাবি নিয়ে দৌড়ে এসেছি। ভাবলাম, ক্যাশ থেকে টাকাটা নিয়ে আসতে পারলেও সেভ হয়। কিন্তু কিছুই বের করতে পারি নাই। এই দোকানমালিক জানান, তার এক ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আরেক ছেলের বয়স ১৮ মাস। মেসার্স জামাল এন্টারপ্রাইজ নামে তাঁর দোকানে মূলত টকদই, মালাই, মোরব্বা, মাওয়া বিক্রি হয়। বড় বড় অনুষ্ঠানে এখান থেকে ফরমাশ অনুযায়ী এসব খাদ্যপণ্য সরবরাহ করে থাকেন। খুচরাও বিক্রি করেন। গত মাসেই দোকানের মালপত্র কেনার জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন উল্লেখ করে জামাল হোসেন বলেন, ৩০ হাজার ৫০০ টাকা করে ২৪ মাসের মাসিক কিস্তিতে এই টাকা ঋণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঋণের মাত্র এক কিস্তি দিছি। স্টাফ ও নিজের বাড়িভাড়ার ২৭ হাজার টাকা এখনো দিতে পারি নাই। ইনকামের একমাত্র উপায় ছিল এই দোকান। কী করব, বুঝতেছি না।

আমরা তো ভিক্ষাও করতে পারবো না: দোকান পুড়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রুনা আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তো ভিক্ষা করতে পারবো না। এখন কী করবো? দোকানটাই ছিল আমাদের রিজিকের মাধ্যম। রুনা বলেন, তার স্বামী বাচ্চু আহমেদ ডিএনসিসি মার্কেটের ২৯ নম্বর দোকানে সোমবার রাতে বেচাকেনা করেছেন। রাতে বাসায় ফেরার পর শোনেন মার্কেটে আগুন লেগেছে। দুপুরে মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘৪০ লাখ টাকা লোন নেওয়া আছে। পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। রাত ৩টা থেকে মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ভেতরে প্রবেশ করতে পারছি না। চোখের সামনেই সব পুড়ে যাচ্ছে।

পুড়লো ৩৮ লাখ টাকার ঘড়িটিও: আগুনে ভবন ধসে একটি দোকান পুরোই চাপা পড়ে গেছে। কসমেটিকসের দোকান ছিল সেটি। বাকি দুটি আগুনে জ্বলছে। ৩৮ লাখ টাকার ঘড়িটিও পুড়ে গেল। ভেতরে কী হচ্ছে, এখনও জানতে পারিনি। পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। মন চাইছে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে জ্বালা মেটাই। ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ জাফর সরদার এভাবেই বিলাপ করছিলেন। চোখের সমানে সব পুড়ে যেতে দেখে প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছেন এই বৃদ্ধ। কত টাকার মালামাল ছিল দোকানে- জিজ্ঞাস করতেই চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিলেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন, কসমেটিকস হলেও নামি-দামি নানান পণ্য ছিল দোকানে। গত সপ্তায় একটি ঘড়ি ইমপোর্ট করেছি ৩৮ লাখ টাকার মূল্যের। এখন বোঝেন, তিনটি দোকান মিলে কত কোটি টাকার পণ্য ছিল? 

৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি: অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ইউনিট। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশিষ বর্ধনকে প্রধান করে ৫ সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব হচ্ছেন ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক মাসুদুর রহমান। গতকাল দুপুরে কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনায়েত হোসেন। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন- তেজগাঁও স্টেশনের সালাহ উদ্দিন, তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনের পরিদর্শক শরিফুল ইসলাম ও তানহারুল ইসলাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ