শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ কনফেডারেশন : একটি পর্যবেক্ষণ

গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ : [এক]
এক সময়ে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর দক্ষিণ হস্ত বলে পরিচিত বিজেপি নেতা সুধীন্দ্র কুলকার্নি সম্প্রতি একটি পুস্তক রচনা করেছেন। ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব হামিদ আনসারী গত ২৮ ডিসেম্বর পুস্তকটির মোড়ক উন্মোচন করেন। এই পুস্তকে মি. কুলকার্নি আগামী ২০৪৭ সালের পূর্বে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে একটি কনফেডারেশন গঠনের ধারণা পেশ করেছেন। তিনি পুস্তকটির শিরোনাম দিয়েছেন ‘আগস্টের কণ্ঠস্বর’। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্টে লালিত তাদের ধ্যান-ধারণাকে কেন্দ্র করে তিনি এই প্রস্তাব দেন। তার মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনাস্থা, বৈরী মনোভাব ও শত্রুতা এবং সংঘাত-সংর্ঘের কারণে ঐ সময়ে দেশ ভাগ হয়েছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ঐ সময়ের ভারত বিভক্তিও তার দৃষ্টিতে স্বাভাবিক ছিল না। তার ভাষায়- “Indias bloody partition in 1947 and the creation of Pakistan on the basis of baseler and toxic two nation theory was highly unnatural. Because it was unnatural it Predictably led to Pakistans own bloody partition in 1971 with the liberation of Bangladesh.” অর্থাৎ- ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের রক্তাপ্লুত বিভক্তি এবং ভিত্তিহীন ও বিষাক্ত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সৃষ্টি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিকতার পূর্বাভাস বাস্তবে ১৯৭১ সালে রক্তাক্তভাবে পাকিস্তানকে বিভক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরো বলেছেন যে, ভারতবর্ষের এই দুই বিভক্তি তিনটি দেশের জন্য বহুমুখী সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
মি. কুলকার্নি ১৬ বছর বিজেপি’র খেদমত করে ২০১৩ সালে দলটি থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন যে, তিনটি স্বতন্ত্র স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যাবে না কিংবা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করাও সম্ভবপর নয়। তার ধারণা দেশ বিভক্তিকে উড়িয়ে দেয়া না গেলেও তার নেতিবাচক প্রভাবসমূহ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভবপর। তার দৃঢ় বিশ্বাস ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার যদি এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হন তাহলে এই কাজটি করা কঠিন নয়। এর শুরুটা করতে হবে ভারত এবং পাকিস্তানকে কাশ্মীরের দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যমূলক সমঝোতা ভিত্তিক একটি মীমাংসার মাধ্যমে। কুলকার্নি আরো বলেছেন- “Mahatm a Gandhi has made an impressis Plea that India and Pakistan ie Hindus and Muslims can coexist like brothers belonging to a single family.” অর্থাৎ- মহাত্মা গান্ধী একটি হৃদয়গ্রাহী অনুরোধ রেখে বলেছিলেন যে, ভারত ও পাকিস্তান তথা হিন্দু ও মুসলমানরা একটি একক পরিবারের সদস্যের ন্যায় ভাই ভাই হয়ে এক সাথে বসবাস করতে পারে। বিজেপি’র অন্যতম শীর্ষ নেতা এল কে আদভানী এই আহ্বানকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে পন্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় ও রামদয়াল লহিয়াও ভারত-পাকিস্তানের কনফেডারেশন চেয়েছিলেন। সুধীন্দ্র কুলকার্নির এই পুস্তকে তিনি সর্বভারতীয় আটজন নেতার অভিমত ও নিবন্ধ সন্নিবেশিত করেছেন। এই আটজন নেতা হচ্ছেনÑ (১) মোহনলাল করমচাঁদ গান্ধী, (২) পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু, (৩) কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, (৪) মাওলানা আবুল কালাম আজাদ(৫)শ্রী অরাবন্দ (৬)স্বামী রঘুনাথ আনন্দ, (৭) ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ও (৮) আনন্দ কুমার স্বামী।
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত আটজন নেতার মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া আর কেউই ভারত বিভাগের পক্ষে ছিলেন না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার প্রথম জীবনে ভারতীয় কংগ্রেসের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন এবং ভারত বিভক্ত না করে হিন্দু মুসলমান মিলেমিশে অখ- ভারতে বসবাসের পক্ষে ছিলেন। তিনি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য নিরলস চেষ্টা চালান এবং হিন্দু নেতাদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রকার প্রতিশ্রুতি আদায়ে ব্যর্থ হন। জনাব জিন্নাহ মনেপ্রাণে এতই জাতীয়তাবাদী ছিলেন যে, ১৯০৮ সালে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন ব্যবস্থা সংক্রান্ত মুসলিম লীগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে ভারতের স্বাধীনতার জন্য এতই অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন যে, কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক তাকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ নামে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও জিন্নাহ সফল হতে পারেননি। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী ভারতীয় কংগ্রেস মুসলমানদের কোন স্বার্থই রক্ষা করবে না। মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তার দেয়া ১৪ দফা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। কংগ্রেস নেতা হিসেবেই তিনি তা পেশ করেছিলেন; কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্ব তা প্রত্যাখ্যান করে। এতে তার মোহমুক্তি ঘটে এবং তিনি কংগ্রেসের নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন।
কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৪ দফা ছিল নিম্নরূপ :
১. স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র হতে হবে ফেডারেল ধরনের এবং প্রতিরক্ষা, অর্থ ও বৈদেশিক সম্পর্ক ছাড়া অবশিষ্ট ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের উপর ন্যস্ত থাকবে।
২. সকল প্রদেশকে একই ধরনের স্বায়ত্তশাসন প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. দেশের সকল আইনসভা এবং নির্বাচিত সংস্থাগুলো এমনভাবে গঠন করতে হবে যাতে সকল স্তরে সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত, ফলপ্রসূ ও সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্ব থাকে এবং যে সমস্ত প্রদেশে তারা সংখ্যাগুরু সে সমস্ত প্রদেশে তারা যেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হারায় এবং এমন কি সংখ্যা সাম্যও প্রতিষ্ঠিত না হয়।
৪. কেন্দ্রীয় আইনসভায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব এক তৃতীয়াংশের কম হবে না।
৫. স্বতন্ত্র ইলেক্টরেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে, যেমনটি বর্তমানে আছে। তবে শর্ত থাকে যে, যে কোন সম্প্রদায়ের জন্য যে কোন সময়ে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে তাদের স্বতন্ত্র নির্বাচনের ক্ষমতা পরিহার করার অধিকার থাকবে।
৬. কোনও এলাকা কখনো যদি বিভাজনের প্রয়োজন হয় তাহলে কোনক্রমেই তা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার বেলায় প্রযোজ্য হবে না।
৭. সকল সম্প্রদায়কে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা তথা ধর্ম, বিশ্বাস, প্রার্থনা, ধর্মীয় বিধি-বিধান ও আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন, প্রচার, প্রসার, শিক্ষা প্রশিক্ষণ এবং সংঘভুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৮. কোন আইন বা বিধানসভা অথবা নির্বাচিত সংস্থার তিন চতুর্থাংশ সদস্য যদি এই মর্মে বিরোধিতা করেন বা মতামত পেশ করেন যে, তা কোনও সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষতিকারক হবে তা হলে কোন আইন বা প্রস্তাব বা তার অংশ বিশেষ উক্ত সভা বা সংস্থায় পাস করা যাবে না।
৯. সিন্ধু প্রদেশকে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে আলাদা করতে হবে।
১০. অন্যান্য প্রদেশের আদলে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তানেও সংস্কার কার্যক্রমের সূচনা করতে হবে।
১১. অন্যান্য ভারতীয় নাগরিকদের ন্যায় মুসলমানদের কেন্দ্রীয় রাজ্য ও স্থানীয় সরকারের চাকরিতে পর্যাপ্ত ও ন্যায্য হিসসা দেয়ার জন্য শাসনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় বিধান সংযোজন করতে হবে।
১২. শাসনতন্ত্রে মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পারিবারিক ও সামাজিক আইন, দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং রাজ্য সরকার ও স্থানীয় সংস্থা পর্যায়ে তার গ্যারান্টি দিতে হবে।
১৩. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তত এক তৃতীয়াংশ মুসলমান সদস্য থাকতে হবে।
১৪. ফেডারেশনভুক্ত প্রদেশ বা রাজ্যসমূহের সম্মতি ব্যতীত কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্রের কোনও পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না।
ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য জিন্নাহর ১৪ দফা ছিল একটি মৌলিক দলিল। এই দলিলের খসড়া তৈরি করেছিলেন রাজা গোপাল আচারী এবং রিপোর্ট আকারে তা ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ পেশ করা হয়েছিল। জওহর লাল নেহেরু একে হাস্যাস্পদ বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্য নেতারা ব্যঙ্গ বিদ্রুপও করেছিলেন। এই রিপোর্টের ১২ বছর পর ১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং সাত বছরের মধ্যে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভক্ত হয়। মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল না, থাকলে প্রায় ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের সুযোগে ভারতবর্ষে কোনও হিন্দু বা ভিন্ন ধর্মের কোনও অস্তিত্ব থাকতো না এবং মুসলমানরা ভারতে সংখ্যালঘু না হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠই থাকতো।
যাই হোক, ভারতীয় ফেডারেশনের অধীনে মুসলমানরা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের গ্যারান্টি নিয়ে থাকতে পারেনি। আজকের ভারতবর্ষে এমন দিন নেই যেখানে কোথাও না কোথাও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে না এবং মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার বনছে না। তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন প্রায়শই বিপন্ন হচ্ছে। গরু জবাই ভারতের বহু রাজ্যে নিষিদ্ধ, কুরবানি নিষিদ্ধ। বসতঘর বা রান্না ঘরের ফ্রিজে গরুর গোশত রাখার অভিযোগে তাদের প্রাণ দিতে হচ্ছে। তাদের মসজিদ ও ধর্মগ্রন্থের নিরাপত্তা নেই, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে। বিচারপতি সাচারের রিপোর্টে এর একটি করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
কাশ্মীরের মুসলমানরা নরক যন্ত্রণায় ভুগছে। এক সময়ের ভূস্বর্গ কাশ্মীর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসী লুটেরাদের অত্যাচারে এখন জর্জরিত। এমতাবস্থায় ভারত-বাংলাদেশ পাকিস্তানের কনফেডারেশনের ধারণা এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার প্রাক্কালে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার কাছে অনুরূপ একটি প্রস্তাব রেখেছিলেন। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং সাপ্তাহিক রেডিয়্যান্স পত্রিকায় জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে তা প্রকাশিত হয়েছিল। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ