শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

নারী ও শিশুরা বর্বরতার শিকার

ঘরে বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশুরা প্রতিদিনই বর্বর সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ক্রমাগতভাবে সারা দেশে নজিরবিহীন এ ধরনের সামাজিক অপরাধ কর্মকাণ্ড কেবল বেড়েই চলছে। সব বয়সের অবলা ও অসহায় নারী ও অবুঝ শিশু ধর্ষণ, হত্যা, অমানবিক সহিংসতা ও বর্বর নির্যাতনের অপরাধ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চললেও সরকার ও সরকারি প্রশাসনের উচ্চ শিক্ষিত, সভ্যতাগর্ভী দায়িত্বশীলদের আদৌ টনক নড়ছে কী? প্রশ্ন হচ্ছে, নারী ও শিশুর প্রতি বর্বর নির্যাতন রোধে দেশে কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না। আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ না হওয়ায় এবং ন্যায় বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিই এসব গুরুতর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ইসলামী নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নে, ইসলামী ভাবধারা নির্মাণের পথে শত বাধা-বিপত্তি, ইসলামী মূল্যবোধ ও দেশীয় সংস্কার ধ্বংস করা, ধর্মীয় অনুশাসনকে নিরুৎসাহিত করা, নিত্য নতুন প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিদেশী-বিজাতীয় অপসংস্কৃতির চরম আগ্রাসন, এদেশের সামাজিক রীতি-পদ্ধতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন সর্বোপরি সমাজের সকল ক্ষেত্রে সততা, ন্যায়নিষ্ঠার পথ পরিহার করে দমন-পীড়ন, জোরজুলুমের রাম রাজত্ব কায়েম থেকেই মানুষের মনে দিন দিন হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা বাসা বাঁধছে। প্রতিদিনের বর্বর, ভয়ংকর অপরাধের ঘটনাগুলো থেকে এ অশনি-সংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং আমাদের জাতীয় মনস্তত্ত্ব যে পতনের গভীর খাদে তলিয়ে যাচ্ছে তা সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। উদাহরণ স্বরূপ নিচের তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করা যায়, গত এক বছরে এবং চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত এই ২২ মাসে ৯ হাজার ৬৩৬ জন নারী সহিংস নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই ২২ মাসের সমানুপাতিক হারে চলতি বছর শেষে নারীর প্রতি সহিংস অপরাধের ঘটনার পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার ৪৫৯টি। ২০১৫ সালে দেশের ১৪টি দৈনিক ও চলতি বছরের ১০ মাসে ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে এ তথ্য সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থার জরিপ মতে, গত দুই বছরে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের তুলনায় চলতি ২০১৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত ১ জানুয়ারি ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ধর্ষিত হয়েছে ৪৫৩ জন নারী। সেপ্টেম্বরে কম করে হলেও ১০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জন নারীকে। ধর্ষিত ৪৫০ জন নারীর মধ্যে ৭৯ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছর। ৩৫ জনের বয়স ৬ বছরের নিচে। একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ২৭ বছরে সারাদেশে ভেজাল প্যারাসিটাল খেয়ে মারা গেছে হাজার হাজার শিশু। ভেজাল ও নকল প্যারাসিটামল খেয়ে এ পর্যন্ত কত হাজার বা কত লাখ অবুঝ শিশুর জীবনহানি ঘটেছে কারো কাছে তার কোনো পরিসংখ্যান আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য ভেজাল ও নকল ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করেও সরকারি ওষুধ প্রশাসনের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের কারণে সংশ্লিষ্ট খুনি-অপরাধীরা অনায়াসেই পার পেয়ে যাচ্ছে।
গত ১৮ অক্টোবর কথিত ডিজিটাল জোয়ারে স্মরণকালের ভয়াবহ নিষ্ঠুর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। পাঁচ বছর বয়সী এক অবুঝ কন্যা শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর অচেতন অবস্থায় তাকে পাওয়া যায় বাড়ির অদূরের হলুদ ক্ষেতে। প্রতিবেশী পাষণ্ড সে হায়েনাকে শিশুটি কাকু বলে ডাকতো সে হায়েনা কর্তৃক নির্যাতিত এ শিশু এখন বেঁচে থাকলেও দৈহিক ও মানিসকভাবে চরম বিপন্ন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গঠিত চিকিৎসক বোর্ডের সদস্যদের ভাষায়, এমন নিষ্ঠুরতা আমরা আমাদের চিকিৎসক জীবনে দেখিনি। শিশুটির বিশেষ অঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। পাশবিকতায় ভেঙ্গে গেছে তার প্রজনন অঙ্গের হাড়। সিগারেটের অসংখ্য সেঁকা দেয়া হয়েছে নিষ্পাপ শিশুটির শরীরে। এ দেশে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ঘটে চলেছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীর স্পষ্ট কথা প্রণিধানযোগ্য। তার ভাষায়Ñ- আমাদের বিবেক মরে গেছে। দিনে দিনে মানুষ কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠছে। সমাজ থেকে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ উঠে গেছে। ধর্মীয় ও পারিবারিক শিক্ষার অনুপস্থিতির ফলে সব ধরনের অপরাধ বেড়ে গেছে। এসব বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে দেশের মানুষের মধ্যে যে ভাবনার জন্ম হচ্ছে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের অনুধাবন করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে নৈতিকতার চর্চা। ধর্মীয় সকল উদ্দীপক শক্তিকে উৎসাহিত করে কাজে লাগাতে হবে। নারী ও শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে পুরুষদের যৌন বিকারগ্রস্ত হওয়ার যত কুরুচিপূর্ণ উপকরণ, আয়োজন নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি সর্বোপরি আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। আইনের প্রয়োগ কঠোর করতে হবে। পাশাপাশি সাময়িকভাবে হলেও নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি দ্রুততর করতে হবে। মামলার কাজ দ্রুত শেষ করে কঠোর সাজা না দিলে এ ধর্ষকামী অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। সারাদেশে খুন, গুম, ধর্ষণ ও বর্বর নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর কিছু মামলার বিচারহীন পরিণতি এবং যৌন উস্কানিমূলক নানা অপসংস্কৃতির বেপরোয়া চর্চাও এ বেহাল পরিস্থিতির জন্য কম দায়ী নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পরিচালকরা সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জনস্বার্থে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন, এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ