শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

জেলা পরিষদের নির্বাচন এবং সম্ভাবনার অন্য দিক

আশিকুল হামিদ : বছরের শেষ প্রান্তে এসে ৩০ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিক তার প্রধান শিরোনাম করেছে, ‘স্থানীয় সরকারও এখন আ, লীগের কব্জায়’। শতকরা হিসাবের চিত্রও রয়েছে রিপোর্টটিতে। এতে দেখানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোর ৭৪ শতাংশ রয়েছে আওয়ামী লীগের দখলে। শতকরা ১৫ ভাগ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ‘অন্যান্য’কে দেখানো হলেও দৈনিকটি জানিয়েছে, এরও অধিকাংশ দখল করেছেন আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহীরা’। সে হিসাবে ৮৩ শতাংশই চলে গেছে আওয়ামী লীগের দখলে। বাকি ১৭-এর মধ্যে বিএনপি রয়েছে মাত্র ১১ শতাংশে। অন্য ৬ শতাংশ কারা সে সম্পর্কে চিত্রে জানায়নি দৈনিকটি। এই ৬ শতাংশের মধ্যে সম্ভবত জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো  রয়েছে, যারাও আসলে আওয়ামী শিবিরের দলই।
কথা ওঠার পাশাপাশি এ ধরনের হিসাব-নিকাশের আশু কারণ যে ২৮ ডিসেম্বরের জেলা পরিষদ নির্বাচন সে কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্য কোনো দল অংশ না নিলেও এতে শুধু ‘বিদ্রোহী’ নামে পরিচিত প্রার্থীদের ছড়াছড়িই ছিল না, তারা জিতেছেনও ১২টি জেলা পরিষদে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্তরা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন ২৫টিতে। সেদিক থেকে প্রায় অর্ধেক আসনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে। এতে অবশ্য কিছুই যায়-আসে না। কারণ, কোনো দল বা ব্যক্তি অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগের মনোনীতরা আগেই ২২টিতে চেয়ারম্যান পদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ বলে ঘোষিত হয়েছিলেন। সে হিসাবে ৫৯টির মধ্যে দলটির মনোনীতজনেরা জিতেছেন ৪৭টিতে। চেয়ারম্যানের পাশাপাশি কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদেও সব মিলিয়ে ২৫৬ জন আগেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে রয়েছেন। এদের সঙ্গে এবার যুক্ত হবেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসা প্রার্থীরা। রয়েছেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরাও, অতীতের মতো এবারও তাদের সসম্মানে দলে ফিরিয়ে নেয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারাও দলে ফিরতে পেরে ধন্য ও কৃতার্থ হয়ে যাবেন। অমন সম্ভাবনার ভিত্তিতেই জাতীয় দৈনিকটির খবরে বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকারও এখন আ, লীগের কব্জায়’।
এ বিষয়ে আমরা অবশ্য বহুদিন ধরেই বলে এসেছি। কারণ, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবই উল্টে ফেলা হয়েছে। এখন সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ধরনের কথাগুলো কেবলই ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যাবে। এই সরকারের অধীনে  তিনশ’ আসনের জাতীয় সংসদে ১৫৪ জন ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হন। একই অবস্থা চলছে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্তও। যেমন সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনীতরা জিতেছেন দু’ হাজার ৬৬৭টিতে। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত ২০৪ জন, যাদের প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন। সে হিসাবে দলটির ‘নির্বাচিত’ চেয়ারম্যানদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দু’হাজার ৮৭১। পাশাপাশি রয়েছেন আরো ৮৮৮ জন, যারা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের সমর্থন নিয়ে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ এই ৮৮৮ জনও আসলে আওয়ামী লীগের লোক। এবার যোগ করলে মোট সংখ্যা হবে তিন হাজার ৭৫৯। এদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির ৫৭ এবং জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির ১১ জনসহ আরো অন্তত শ’ দেড়েক চেয়ারম্যান রয়েছেন, যাদের প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের পক্ষের লোক। পরিসংখ্যানে স্বতন্ত্র নামধারী অনেকের কথা বলা হয়েছে। তারাও কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যাবেন না। সে হিসাবে দেখা যাবে, চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ‘অর্জন’ সাড়ে চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অবস্থা কিন্তু অত্যন্ত শোচনীয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সরকার অনেক আগেই রাজনৈতিক দলের তালিকা থেকে বিদায় করেছে। আর ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দেশের প্রধান দল বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন মাত্র ৩৬৭টি ইউনিয়ন পরিষদে। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের বদৌলতে এটাই বাস্তব সত্য। চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নির্বাচিত সাধারণ সদস্যদের কথাও মনে রাখতে হবে। কারণ, তারাও ইলেক্টোরাল কলেজের সদস্য তথা ভোটার বা ইলেক্টর। প্রতিটি ইউনিয়নে নয়জন সাধারণ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের তিনজন করে নারী সদস্য রয়েছেন। সাড়ে চার হাজার চেয়ারম্যানের সঙ্গে ১২ জন হিসেবে  সদস্য ধরলেও তাদের সংখ্যা ৫৪ হাজারে পৌঁছাবে। সে তুলনায় বিএনপির অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, বিএনপি মাত্র ৩৬৭ জন চেয়ারম্যান পেয়েছে। এসব ইউপির সব সদস্যও যদি বিএনপির হয়ে থাকেন তাহলেও দলটির মোট ভোটারের সংখ্যা সাড়ে চার হাজার হবে না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ৫৪ হাজার ইলেক্টর বা ভোটারের বিরুদ্ধে বিএনপিকে সর্বোচ্চ চার- সোয়া চার হাজার ভোটার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। এমন অবস্থায় জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচন হলে বিএনপির তথা বিরোধী দলের পরিণতি কতটা শোচনীয় হবে পাঠকরা সে সম্পর্কে সহজেই অনুমান করতে পারেন।
কথা কিন্তু এমনি এমনি ওঠেনি। বিএনপির মতো দেশের প্রধান ও ব্যাপকভাবে  জনসমর্থিত দল এবং ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি সুশীল সমাজসহ গণতন্ত্রকামী সকল পক্ষের আপত্তি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে গত ২৮ ডিসেম্বর দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছেন শুধু ইলেক্টোরাল কলেজের সদস্যরা। সাধারণ মানুষ কোনো সুযোগই পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাও শুধু আওয়ামী লীগের লোকজনই করেছে। কারণ, জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী মহাজোটের সকল দলও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘাষণা দিয়েছিল। সুতরাং আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলই জেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তা সত্ত্বেও ‘নির্বাচন’ হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে আরো একটি ৫ জানুয়ারির রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে।
এমন এক আশংকাজনক অবস্থার মধ্যে জোর গুজব উঠেছে, বাংলাদেশে নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক কোনো কোনো সংস্থাও পরিষ্কার ভাষায় বলেছে, শেখ হাসিনার সরকার ক্রমেই ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে উঠছে। কথাটার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগোতে থাকা কোনো সরকারই সাধারণত ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে ওঠে। এর প্রমাণ একবার পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৪-৭৫ সময়কালে, যখন জাতির ঘাড়ে বাকশাল-এর একদলীয় শাসন চাপানো হয়েছিল। সে ইতিহাসেরই নাকি পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা ও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে! স্মরণ করা দরকার, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালী শাসন যাত্রা শুরু করেছিল। সেদিন জাতীয় সংসদের মাত্র ১১ মিনিট স্থায়ী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছা ও নির্দেশে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। সংশোধনীর আগে পর্যন্ত শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সংশোধনী পাস করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। চতুর্থ সংশোধনীর ফলে প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়, রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এবং সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেশে একটি মাত্র দল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংশোধনীর ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ২৪ ফেব্রুয়ারি একমাত্র দল বাকশাল গঠন করেন। তার নির্দেশে তাকেই চেয়ারম্যান করে ৬ জুন গঠিত হয় বাকশালের ১১৫ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি। সরকার নিয়ন্ত্রিত চারটি দৈনিক ছাড়া দেশের সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ হয়ে যায় ১৬ জুন।
বাকশাল গঠনের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে অনেক যুক্তিই দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ শেখ মুজিব নাকি ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে বাকশাল গঠন করেছিলেন! এ কথাও বলা হয়েছে যে, বাকশাল গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল জাতীয় সংসদে। অন্যদিকে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস কিন্তু এসব যুক্তিকে সমর্থন করে না। যে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র যুক্তি দেখানো হয় তার জন্য দায়ী ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বব্যাপী দুর্নীতি, কালোবাজারি ও চোরাচালানসহ প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা, সরকারের রাজনৈতিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড এবং সবশেষে ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাকশাল প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে দেয়া শেখ মুজিবের ভাষণেও এ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দরকার যখন ছিল ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও নতুন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান কিংবা জরুরি ভিত্তিতে একটি সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার গঠন করা, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তখন উল্টো রাজনৈতিক আন্দোলন ও সরকার বিরোধিতার সকল পথ বন্ধ করে দেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি প্রথমে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে এগিয়েছিলেন বাকশালের একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পথে।
সমগ্র এই প্রক্রিয়া ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ বলা হলেও বাকশাল বাস্তবে আওয়ামী লীগেরই নামান্তর মাত্র ছিল। কারণ, বাকশাল বলতে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ বোঝানো হয়েছিল, ‘আওয়ামী লীগ’ নামটিকে বাদ দেয়া হয়নি! অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মস্কোপন্থী দুই দল ন্যাপ (মো.) এবং সিপিবির শোচনীয় পরিণতিও এর প্রমাণ। কারণ, প্রথম থেকে সর্বাত্মকভাবে লেজুড়বৃত্তি করা সত্ত্বেও বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেতৃত্বের অবস্থান পাননি ‘কমরেড’ মনি সিংহ এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো দলীয় প্রধানরাও। এই দু’জনকেসহ দুই দলের মাত্র ছয়জনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেয়া হয়েছিল। তাদের ক্রমিক সংখ্যা ছিল ৭০-এর ঘরে। ওদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীকে ১৯৭৪ সালের জুন থেকে সন্তোষে গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ বিরোধী অন্য নেতারা ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, কয়েকজন পালিয়ে বিদেশেও চলে গিয়েছিলেন। সুতরাং ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের যুক্তিকে রাজনৈতিক অসততা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
‘সাময়িক কালের’ জন্য গঠন করা হয়েছিল ধরনের যুক্তিকেও গ্রহণ করা যায় না। কারণ, সে ধরনের কোনো বিধান চতুর্থ সংশোধনীর কোথাও কিংবা বাকশালের গঠনতন্ত্রে ছিল না। গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা-উপধারা বরং প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য নিয়েই বাকশাল গঠন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ও কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন এবং সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন দেয়া থেকে বাকশাল, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতিটি বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতা ছিল শুধু রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের।
একথা অবশ্য সত্য যে, চতুর্থ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাসঙ্গিক অন্য একটি সত্য হলো, ১৯৭৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট চাওয়া হয়নি। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় জনগণকে জানানো হয়নি যে, ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ এত মৌলিক ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটাবে। তাছাড়া সংবিধানের সংশোধনী পাস করার পরও গণভোটের আয়োজন করা হয়নি। অথচ এ ধরনের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে জনমত যাচাই এবং গণভোট অনুষ্ঠান করা গণতন্ত্রে একটি অবশ্যপালনীয় কর্তব্য- যেমনটি পরবর্তীকালে করেছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে শেখ মুজিব প্রবর্তিত প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি বাতিল করে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। সর্বসম্মতিক্রমে পাস করা সত্ত্বেও এ প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করেছিল সরকার। কিন্তু বাকশাল গঠন এবং চতুর্থ সংশোধনী পাস করার সময় এ ধরনের গণতন্ত্রসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত ভুল ও গণতন্ত্রবিরোধী ছিল বলেই মুজিব-উত্তর কোনো বছর ২৫ জানুয়ারির মতো ‘ঐতিহাসিক’ একটি দিবসকে আওয়ামী লীগ কখনো যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য ও সম্মানের সঙ্গে পালন বা উদযাপন করেনি। দলটি বরং দিনটিকে পার করেছে নীরবে। মাঝেমধ্যে দু’চারজন নেতাকে অবশ্য খুবই দুর্বল কণ্ঠে বাকশালের পক্ষে কৈফিয়ৎ দিতে বা ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ ধরনের যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। কারো পক্ষেই অবশ্য মরহুম নেতার সর্বশেষ ‘কীর্তি’ বাকশালকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু সব জেনে-বুঝেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর লক্ষ্যে পা বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। প্রসঙ্গক্রমে তারা বিশেষ করে জেলা পরিষদ নির্বাচন এবং এর ভোটার তথা ইলেক্টোরাল কলেজের দিকে লক্ষ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন। আগেই বলেছি, একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আওয়ামী মহাজোটেরও কোনো দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। সংসদের বাইরের প্রধান এবং ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত রাজনৈতিক দল বিএনপিও ইতিবাচক অবস্থান নেয়নি। আরেক দল জামায়াতে ইসলামীকে তো সরকার রাজনৈতিক দলের তালিকা থেকেই বিদায় করে রেখেছে। অর্থাৎ জেলা পরিষদের নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগই অংশ নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আরো একটি একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে।
আশংকার কারণও সৃষ্টি হয়েছে এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই। এর সঙ্গে উদ্বেগের উপাদান যুক্ত করেছেন বিতর্কিত ও নিন্দিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি কিছুদিন আগে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা আসলেও সম্ভবত অমন চিন্তাই করছেন। নাহলে সিইসি হঠাৎ ইলেক্টোরাল কলেজের কথা বলবেন কেন? সরকার সত্যিই তেমন সিদ্ধান্ত নিলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হবে এবং নতুন পর্যায়ে ফিরে আসবে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থা। এর সঙ্গে আবার অন্য নামে হলেও বাকশালের প্রেতাত্মাকে জুড়ে দেয়া হবে। এসবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে দলীয় লোকজনকে ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি’ বানানোর এবং তাদের দিয়ে সকল স্তরে নির্বাচন নামের নাটক মঞ্চায়নের চেষ্টা করবে। 
মূলত এজন্যই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভীতি ও সংশয়ের সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, সরকার যেহেতু জেলা পরিষদ সংক্রান্ত আইনটি বাতিল করেনি এবং ওই আইনের ভিত্তিতেই যেহেতু নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে, সেহেতু সারে দেশের সকল জেলা পরিষদই চলে গেছে আওয়ামী লীগের দখলে। এরও আগে ইউনিয়ন পরিষদসহ সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেও আওয়ামী লীগের দখল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সুতরাং ইলেক্টোরাল কলেজের সকল নদস্য বা ভোটারই এখন আওয়ামী লীগের। প্রসঙ্গক্রমে আশংকার কারণ হিসেবেও প্রাধান্যে এসেছে ইলেক্টোরাল কলেজের প্রশ্নটি। দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনকে একটি ‘টেস্ট কেস’ বা ‘মহড়া’ হিসেবে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনেও একই ইলেক্টোরাল কলেজকে ভোটার বানানোর পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ, ইলেক্টোরাল কলেজের প্রায় সকল ভোটার আওয়ামী লীগের লোকজন বলে জেলা পরিষদ নির্বাচনে সংঘাত-সংঘর্ষের তেমন ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়টিকেই প্রাধান্যে নিয়ে আসার চেষ্টা চালানো হবে। তেমন অবস্থায় এরশাদ হয়ে উঠতে পারেন ক্ষমতাসীনদের প্রকৃত ‘সেভিয়ার’। এরশাদকে এমনকি রাষ্ট্রপতিও বানাতে পারে আওয়ামী লীগ। কারণ, দলটির দরকার যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতার, এমনকি সংসদেরও আশপাশে আসতে না দেয়া। সুতরাং এরশাদকে খুশি করার ব্যাপারে কঞ্জুসি করার ঝুঁকি নেবে না আওয়ামী লীগ। আর এ কথা তো সবারই জানা রয়েছে যে, এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বানানো হলে তিনি এমপির সংখ্যার ব্যাপারে শুধু নয়, রাজনৈতিক দলের সংখ্যার ব্যাপারেও টুঁ শব্দটি করবেন না। ওদিকে সংবিধান তো আগেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সংসদেও তারা নিজেরাই ‘নির্বাচিত’ হয়ে হাজির হবেন। সব মিলিয়ে নতুন পর্যায়ে একদলীয় শাসন চাপিয়ে দেয়ার পথে কার্যত কোনো বাধাই থাকবে না। ফলে নতুন কোনো নামে হলেও বাকশালকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা তথা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানো হতে পারে। কে জানে বাকশাল গঠনের মাস জানুয়ারিতেই তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে কি না!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ