শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

বিজ্ঞানী তৈরির মহাপরিকল্পনা এবং...

গত ২৯ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের চিঠিপত্র কলামে ‘বিজ্ঞানী তৈরিতে চাই মহাপরিকল্পনা’ শীর্ষক একটি ছোট চিঠি ছাপা হয়েছে। এটি লিখেছেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান তোফায়েল হোসেন খান। চিঠির কলেবর খুব বড় নয়। তবে এতে যে আকাক্সক্ষার কথা তুলে ধরা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিঠির ভাষা এ রকম, ‘মানুষ ভাবে আগে। কাজে নামে পরে। কল্পনাপ্রবণ মানুষের চিন্তাচেতনায় অন্যদের চেয়ে সবসময় অগ্রগামী হয়। আবিষ্কারক মানুষ আমাদের দেশেও আছে। উদ্ভাবনী প্রতিভার সেসব অগ্রসর মানুষদের খুঁজে বের করুন। যাকে এ মুহূর্তে সাধারণ বলে ভাবা হচ্ছে, সেই সাধারণকেই অসাধারণ করে তোলার দায়িত্ব নিন। উপযুক্ত পরিচর্যায় যেমন একটি চারাগাছ সম্ভাবনাময় বৃক্ষের পরিণত পায়, তেমনই সম্ভাবনাময় মানুষদের আগে বাছাই করুন। পরিচর্যার অভাবে একটি চারা হয়ে ওঠার আগেই যেমন অঙ্কুরেই মরে যেতে পারে, তেমনই এদেশে প্রতিভাবান আবিষ্কারমনা শত শত মানুষ মানবেতিহাসে নিজের নাম না লিখিয়েই চিরবিদায় নেয়। এটি আমাদের শুধু নয়, যেকোনও জাতির জন্য বড় লোকসানের। এদেশের মানুষকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে বসাতে চাইলে বিজ্ঞানসাধনার বিকল্প দেখি না। পত্রলেখক ঠিকই বলেছেন, অনেক প্রতিভা অঙ্কুরেই মরে যায়। বড় বৃক্ষ দূরে থাক, চারাগাছ হয়ে ওঠারও সুযাগ পায় না বহু অঙ্কুর। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে প্রতিভার তেমন মূল্যায়ন হয় না। এছাড়া পরিচর্যার অভাবে, দিকনির্দেশনার দূরবস্থার কারণে প্রতিভার অপচয় হয় বেশি। ফলে যার বিজ্ঞানী হবার কথা সে হয় নাট্যকার, কবি। যার পাইলট বা বৈমানিক হবার কথা সে হয় স্কুলমাস্টার। যার বিজ্ঞানী গবেষণক হবার কথা সে হয় প্রিন্টিং মিডিয়ার গ্রুফ রিডার। এমনকি যে স্কুলজীবনে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করে জিপিএ-৫ পেয়ে সেরা ছাত্র হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, শেষমেষ তাকে ট্রাক ড্রাইভার হতেও দেখা যায়। অনেকটা এরকমই আমাদের শিক্ষা পরিস্থিতি।
আমাদের এদেশে এমন প্রতিভাও আছে যারা জ্বালানি তেল ছাড়া পানি দিয়ে চালাবার মতো গাড়ির ইঞ্জিন বানাতে পারে। পানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। কর্ণফুলী নদীর পানি ব্যবহার করে হাইড্রোলিক পাওয়ার প্লান্ট অনেক আগেই এদেশে হয়েছিল। কিন্তু সেটার কোনও খবর এখন আর নেই। বায়োগ্যাস দিয়ে গ্রামাঞ্চলে রান্নার পদ্ধতি আবিষ্কার এবং তা দিয়ে আলো জ্বালাবার ব্যবস্থাও আমাদেরই আবিষ্কার বলা যায়। সোলার এনার্জি প্লান্ট বসিয়ে সূর্যের আলো ব্যবহার করে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেবার যে আধুনিক ব্যবস্থা তাও কিন্তু আবিষ্কারমনা বিজ্ঞানীদেরই অবদান। বায়োগ্যাস প্লান্ট কিংবা সোলার এনার্জির কথা কি কয়েক দশক আগেও আমাদের মাথায় ছিল? এসবই বিজ্ঞানের অবদান। বিজ্ঞানমনা প্রতিভার আবিষ্কার। গবাদিপশুর মলমূত্র, গৃহস্থালির আবর্জনা দিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চালানোর প্রযুক্তি খুব কঠিন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বও না। সামান্য প্রযুক্তিজ্ঞান মাত্র। অথচ এ দিয়ে কী অসামান্য উপকারই না হচ্ছে মানুষের! আজকাল ফসল ফলানো যায় মাটি ছাড়াই। শুধু কচুরিপানা, খড়বিচালির গাঁদা বানিয়ে নদ-নদী, বিল-ঝিলের পানিতে শাক-সবজি, রবিশস্য উৎপাদন করা সম্ভব। এমনকি ভাসমান ঘরবাড়িও তৈরি করা যেতে পারে নদী বা বিলের পানির ওপর। বসানো যায় হাটবাজারও। শুধু জানতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কিছু বৈজ্ঞানিক সূত্র। অথচ বিজ্ঞান বিষয়টি আমাদের দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায়ই উপেক্ষিত। আমাদের মাথাভারী দু’একটা বিজ্ঞানগবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে বটে, কিন্তু তেমন কার্যক্রম লক্ষণীয় নয়। আসলে বিজ্ঞানকেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য এমন অথর্ব প্রতিষ্ঠানেরই সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ যুগ বিজ্ঞানের। তাই বিজ্ঞানের উন্নয়ন ব্যতীত আমাদের সকল উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে বাধ্য। চীন হোয়াংহো নদীতে কয়েক মাসে বিশ্ববিখ্যাত ব্রিজ তৈরি করে ফেলতে পারে। কিন্তু আমাদের মহানগরী ঢাকায় ফ্লাইওভার বানাতে যেমন লাগে বছরের পর বছর, তেমনই কয়েক দিন পর পর কিছুটা বানিয়ে তা আবার ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হয়। এতে বেড়ে যায় ব্যয়। কয়েকদিন পর পরই বাড়াতে হয় এসব ফ্লাইওভারের নির্মাণ বাজেটও। এসবের মূল কারণ যেমন প্রযুক্তিগত অযোগ্যতা, তেমনই দায়ী সংশ্লিষ্টদের অসততাও। অযোগ্যতা আর অসততা আমাদের নিরন্তর পেছনের দিকে টানছে। আলোচ্য পত্রলেখকের দাবি অনুসারে বিজ্ঞানী তৈরির মহাপরিকল্পনা যেমন থাকতে হবে, তেমন থাকতে হবে সৎমানুষ তৈরির মহাপরিকল্পনাও। কিন্তু আমাদের চলমান প্রতিহিংসার রাজনৈতিক ডামাডোলে এসবের কোনওটাই সম্ভবপর নয়। আমাদের দুর্ভাবনা এখানেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ