বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সর্বনাশা পলিথিন

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী: আমরা প্রতিনিয়ত চকলেট, ট্রফি অথবা চুইংগামের মোড়ক যেখানে সেখানে ফেলে দেই। ফেলে দেয়ার পর সেই মোড়কটি কি হলো, কোথায় গেলো, কীসের তৈরি সেই মোড়কটির? এসব কথা খুব একটা আমরা ভেবে  দেখি না। কেবল চকলেট, ট্রফি চুইংগামের মোড়কই নয় প্লাস্টিক ও পলিথিনের তৈরি নানা জিনিসের এমন প্রায় সবখানেই। রাস্তার ধারে, নর্দমার পানিতে, টেলিফোন তার আর বিদ্যুতের তারেও ঝুলে থাকে অগণিত ফেলে দেয়া পলিথিন ব্যাগ। একটু হাওয়া দিলেই বা একটু ঝড় উঠলেই আমাদের চারপাশে পলিথিনের উড়াউড়ি এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা আমাদের চারপাশে হাজারো রকমের প্লাস্টিক বা পলিথিনের তৈরি জিনিস দেখতে পাই। প্রতিদিন আমরা এসব পলিথিন ব্যবহার করি। বৈদ্যুতিক সুইচ, টেলিফোন ও টেলিভিশন সেট, কম্পিউটার, টেপ, ডিস্কেট, দাঁতের ব্রাশ, পোশাক-আশাক, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং এ রকমের আরো অনেক জিনিস পলিথিন বা প্লাস্টিকের তৈরি।

ভাবতে অবাক লাগে যখন বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বলেন, পলিথিন বা প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাগের মাটির সঙ্গে মিশে যেতে অথবা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে সাড়ে চারশ’ বছরের বেশি সময় লাগে। সূর্যের তাপ, আবহাওয়া আর্দ্রতা, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এদের কোনোটিই পলিথিনকে নষ্ট করতে পারে না। আমরা যাকে বলি হেবনস্টি তা এর ব্যাপারে ঘটে না। অথচ প্রকৃতি থেকে আমরা যা পাই- গাছের পাতা, ফল, ফুল, বাকল এদের মাটিতে মিশে যেতে বেশি সময় লাগে না। এদের জেনাস্টি ঘটে খুব দ্রুত। এসব মাটিতে মিশে গিয়ে আবারো গাছের সৃষ্টি হয়ে। ফিরে আসে।

প্লাস্টিক কথাটি বলতে বোঝায় এমন বস্তুকে যা যে কোনো ছাঁচে তৈরি করা যায়। আসলে প্লাস্টিককে ইচ্ছা করে সহজেই যে কোনো আকার দেয়া যায় বা বাঁকানো-চোবানো যায়। বিশ্বে সর্বপ্রথম যে প্লাস্টিকটি উদ্ভাবিত হয় তার নাম দেয়া হয়েছিল পার্কেসিন। আলেকজান্ডার পার্কিস  নামের একজন বৃটিশ বিজ্ঞানী ১৮৬২ সালে সেলুলজ থেকে এই প্লাস্টিক তৈরি করেছিলেন। পার্কিস সেলুলজ সংগ্রহ করেছিলেন নিজের গ্লুকোজ পরমাণু থেকে। প্রাণী দেহের পশম ও চুল এই গ্লুজোজ পরমাণুরই তৈরি। তাকে অনুসরণ করে ১৮৬৫ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী ওয়েশলে হাইয়াটস বিলিয়ার্ড বল তৈরিতে প্লাস্টিকের ব্যবহার করেন। কিন্তু এ বলের আবরণে খুব সহজেই আগুন ধরে যেতো এবং এমনকি দুটি বলের ঠোকাঠুকিতে রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটতো। প্লাস্টিক হলো একটি কৃত্রিম বস্তু যা তৈরি হয় রাসায়নিক দ্রব্য থেকে। আর প্লাস্টিক দিয়ে যেসব জিনিস তৈরি হয়, তার অনেক কিছুই স্বাভাবিক বস্তু যেমন কাঠ, কাগজ, কাচ, লোহা, তুলা, পশম থেকেও এসব তৈরি করা যায়। এ বস্তুগুলো আমরা উদ্ভিদ প্রাণী ও খনিজদ্রব্য থেকে পেয়ে থাকি বলেই এরা স্বাভাবিক এবং দেহের জৈবনস্টি ঘটতে সময় লাগে কম। প্লাস্টিক কিন্তু কারো মতো সহজে পঁচে না অথবা লোহা বা স্টিলের মতো তাতে সহজে মরচেও ধরে না। তাছাড়া প্লাস্টিক অনেক টেকইস হয়। প্লাস্টিকের  সবচেয়ে সুবিধে হলো এর ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ চলতে পারে না এবং একে যেকোনো আকার দেয়া চলে। এ কারণে সাধারণ বাজার ব্যাগ থেকে শুরু করে টেলিফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরার মতো জটিল সব সরঞ্জাম তৈরি করার কাজে প্লস্টিক খুব সহজে ও কম খরচে ব্যবহার করা যায়। প্লাস্টিক দিয়ে যেমন বেজায় রকম শক্ত বা কঠিন জিনিস বানানো যায় তেমনি নমনীয় ও স্বচ্ছ জিনিসও বানানো যায়। আরো মজার কথা হচ্ছে, প্লাস্টিক দিয়ে যেকোনো রকমের জিনিস তৈরি করা যায়। প্লাস্টিক নানা রকমের হয়ে থাকে এবং তা ব্যবহার হয়ে থাকে নানাভাবে। আসলে পলিথিন বলে যাকে আমরা জানি তা প্লাস্টিকেরই একটি ধরন। এটি শক্ত ও নমনীয় এবং এটি সহজেই গ্যাসীয় বা বা তরল বস্তুকে বাঁধা দিতে পারে। পলিথিন ব্যবহৃত হয় ব্যাগ, পাইপ, বালতি, বোতল, চেয়ার-টেবিল এসব জিনিস তৈরির কাজে। পলিথিনের মতো আরো একটি কৃত্রিম তন্তু হচ্ছে পলি প্রপিলিন। পলিথিন ও পলি প্রপিলিন এর সাথে মিশিয়ে বেশ শক্ত ও মজবুত সব জিনিস বানানো হয়। এ ধরনের জিনিসগুলোর মধ্যে রয়েছে চেয়ার, গাড়ির খুচরো অংশ, নানা রকমের মোড়ক ইত্যাদি। পলিপ্রপিলিনের মতোই প্লাস্টিকের আরও একটি রকম ভেদ হচ্ছে পলিকার্বোনেট। পলিকার্বোনেট আসলে অনেক বেশি শক্তিধর। সাধারণ হেলমেট যন্ত্রাংশ, দরজা-জানালা ইত্যাদি তৈরির কাজে পলিকার্বোনেট ব্যবহৃত হয়।

প্লাস্টিক বা পলিথিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় গ্যাস ও তরল বস্তু। এই গ্যাস ও তরল বস্তু আসে কয়লা ও অশোধিত তেল থেকে। এ তেল থেকে যে বস্তুটি পাওয়া যায় তাতে থাকে অনেক ক্ষুদ্র পরমাণু। তাপ ও চাপের ফলে এগুলো জোড়া লেগে তৈরি করে অণুর একেকটি বিশাল শিকল বা চেইন। একে বলা হয় পলিমার। পলিমার বেঁকে যেতে পারে বলেই পলিমার থেকে তৈরি হয় প্লাস্টিক নামের বিবিধ সব বস্তু।

প্লাস্টিকের অনেকগুলো উপাদান থাকলেও তাদের প্রধানত দু’টি ভাগে ভাগ করা চলে। এ দু’টি ভাগ হচ্ছে থার্মো প্লাস্টিক ও থার্মোসেটস। থার্মো প্লাস্টিক ঠাণ্ডা অবস্থায় শক্ত ও মজবুত হয়ে যায়। এ ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে টাইলস, বালতি, বল, গামলা, ড্রাম ইত্যাদি তৈরি করা হয়। অপরদিকে থার্মোসেটস দিয়ে তৈরি হয় টেলিফোন সেট, কম্পিউটার ইত্যাদি। থার্মোসেটস দিয়ে যেসব জিনিস তৈরি হয় তা আবারো গলানো যায় না। আসলে বিভিন্ন উপাদানের কিছুটা রদবদলে প্লাস্টিকের নানাবিধ জিনিস তৈরি করা যায়। এসব জিনিসগুলোর ব্যবহারও বিচিত্র।

প্লাস্টিকের নানা রকমের মধ্যে দু’টি হচ্ছে নাইলন ও পলিয়েস্টার। এগুলো এখন আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহারের বস্তু। কাপড় ও কার্পেট তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় নাইলন ও পলিয়েস্টার। কেভলান নামের আরো এক ধরনের প্লাস্টিক রয়েছে যা শক্তিতে স্টীল ও লোহাকে হার মানাতে পারে। বুলেট প্রুফ হেলমেট, জ্যাকেট, ক্যাবল, গাড়ির অংশ ও উড়োজাহাজের বডি তৈরিতে  ব্যবহৃত হয় ক্যাবলার। টেকলন নামের আরেক ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি রান্নার নানাবিধ হাড়িকুড়ির গায় রান্নার সময় ও পরে খাবার লেগে থাকে না। পলিয়েস্টারিত আরেক ধরনের প্লাস্টিক যা নরম বিছানার জন্য কোনো ম্যাট্রেসের কাজে ব্যবহার হয়। খাবার গরম রাখার নানারকম পাত্র বা হটকেরিয়ার তৈরি হয় ‘পালস্টিরিন দিয়ে। পলিইউরোথেইন দিয়ে তৈরি হয় সুজ, জুতার সোল, টায়ার ইত্যাদি। পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) অনেকটা নমনীয় ওয়াটার প্রুফ বলেই পানিতে এদের কোনো ক্ষতি হয় না। এক্রিলিক প্লাস্টিক স্বচ্ছ অথচ বেশ শক্ত এবং এটি যেকোনো আবহাওয়ায় টেকসই। গাড়ির গতি ও কাচ এক্রিলিক  প্লাস্টিকেরই তৈরি। ফাইরার গ্লাস নামের প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয় পানির ট্যাংকে ও জাহাজের হাল তৈরির কাজে। ট্যাক্সি ব্র্যাকেট, স্কি, রেসের সাইকেল ও উড়োজাহাজের খুচরা অংশ তৈরি হয় প্লাস্টিক দিয়ে। এ ধরনের প্লাস্টিকে কার্বন মিশানো থাকে বলেই এদের বলা হয় সিআরসি বা কার্বন রিইনকোর্সড প্লাস্টিক।

এ কথা সত্যি প্লাস্টিক আমাদের হাজারো কাজে লাগে। কিন্তু সেই হাজারো কাজের মাঝেও প্লাস্টিক আমাদের বড় ধরনের ক্ষতির কারণও হয়েছে। এ ক্ষতি হচ্ছে মূলত প্লাস্টিকের অপব্যহারের কারণে। দুনিয়াজুড়ে এই বস্তু ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠছে মানুষ। পরিবেশকে বাঁচানোর তাগিদেই এ অপব্যবহার রুখতে হবে আমাদেরকেও। প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় গুণগুলোই তার অপব্যবহারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিকে সহজে পচে না বলে তা পরিবেশগত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে সেখানে ফেলে দেয়া প্লাস্টিক বা পলিথিন সামগ্রী মাটির উর্বরতা নষ্ট করা, শহরের নর্দমা ওপয়ঃপ্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পানি বদ্ধতার সৃষ্টি করে। এছাড়া পলিথিন ক্ষতির জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার মহামারির কারণ হতে পারে। চর্মরোগ ও ক্যান্সারের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে চিকিৎসকগণ পলিথিনের ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারকে দায়ী করেছেন। খাবার জিনিস, বিশেষ করে রুটি, বিস্কুট, চিপস ইত্যাদি যে পলিথিনে প্যাকেট করা হয় তা খাবারকে অবশ্যই দূষিত করছে। খাবার সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন বিশেষভাবে তৈরি পলিথিন। কিন্তু সে বিশেষভাবে তৈরি পলিথিনের তোয়াক্কা কে করছে? 

অনেকের একটা সাধারণ ধারণা আছে যে, মুড়িয়ে ফেললেই পলিথিনের জঞ্জাল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ ধারণা ঠিক নয়। মুড়ে যাওয়া পলিথিন থেকে উৎপন্ন হয় হইড্রোজেন সায়ানাইড নামের বিষক্ত গ্যাস। মানুষের শরীরের জন্য এ গ্যাস খুবই ক্ষতিকর। খোলা জায়গায় পলিথিন মোড়ানো হলে তা আশপাশের মানুষের শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

পলিথিনের বিপদ থেকে বাঁচার জন্য পলিথিনের পুনর্ব্যবহার ও পুনরাবর্তনের উপর জোর দিতে হবে। কিন্তু যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া পলিথিন যে জঞ্জাল সৃষ্টি করছে তাকে পুনর্ব্যবহার বা পুনরাবর্তনের আওতায় আনা সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়। হিসাব করে দেখা গেছে, বড়জোর বিশ শতাংশ পলিথিনের ব্যাগ পুনর্ব্যবহার বা পুনরাবর্তনের আওতায় আনা যায়। আর বাকী আশিভাগ আমাদের সামনে বড় রকমের বিপদের ঝুঁকি হয়ে রয়ে যাবে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পলিথিন সমস্যা দূর করার প্রয়োজনে পচনশীল পলিথিন উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের পলিথিন বা প্লাস্টিককে মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটির কোনো ক্ষতি হবে না। এ জন্য প্লাস্টিকের সাথে অতিরিক্ত শ্বেতসার বা সেলুলজ মিশিয়ে তা ব্যাকটেরিয়ার খাওয়ার  উপযোগী করে তুলতে হবে। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মিও এ ধরনের প্লাস্টিককে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে। শ্বেতসার মেশানো প্লস্টিকে ব্যাকটেরিয়া একবার ঢুকতে পারলেই প্লাস্টিকের অনুগঠন ভেঙ্গে যাবে। অবশ্য প্লাস্টিক পচে যাওয়া বা মাটিতে মিশে যাওয়া নির্ভর করে প্লাস্টিকে কতটা শ্বেতসার মেশানো যাবে তার উপর। সেই সঙ্গে মাটির গঠন, তাপ ও আর্দ্রতার পরিমাণও হিসাব করে দেখতে হবে।

পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে আনার প্রয়োজনে সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। ইহা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসব ক্ষেত্রে বা কাজে পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার না করলেই নয় সেসব ক্ষেত্রে বা কাজে পলিথিন ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে বাজারের ব্যাগ ও সাদারণ খাবারের মোড়কে পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে বন্ধ করে দিতে হবে। দুনিয়ার যেসব রাষ্ট্র পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী তাদের সে দুষণের জন্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

বাজারে থলে হিসেবে কালো পলিব্যাগের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এ ধরনের পলিব্যাগে খাবার জিনিস বহন করা মারাত্মক ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যাগে ব্যবহৃত বা রং খাবার জিনিসকে সহজেই দূষিত করে ফেলে। এছাড়া ফেলে দেয়া পলিথিন পরিষ্কার বা জীবণুমুক্ত না করেই কালো রংয়ের পলিয়েস্টার তৈরি করা হচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য দারুণ হুমকির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর এমন পলিথিনের স্বর্গরাজ্য। পলিথিনের জঞ্জাল দোর্দন্ত প্রতাপে গ্রাস করছে ঢাকা মহানগরকে।  কেবল ঢাকা নয় পলিথিন সাম্রাজ্যের বিস্তার এখন অন্যান্য শহরেও। গ্রাম-গঞ্জও এর থেকে আজ মুক্ত নয়। বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে বাজার গ্রাম ও খাবারের মোড়ক হিসেবে। প্লাস্টিকের হাঁড়িকুড়ি ও তৈসজপত্রেও এমন ছেয়ে গেছে বাজার। এক সময় একটি মাত্র চট বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার হতো, এখন সেখানে পাঁচ-সাতটি পলিব্যাগ তার স্থান দখল করেছে। খালি হাতে বাজারে গিয়ে দোকানির দেয়া বিনামূল্যের ব্যাগে ভর্তি করে বাজার নিয়ে ফিরে বাজারীরা। তারপর এ ব্যাগ স্থান করে নেয় আবর্জনার স্তূপে অথবা নর্দমা বা রাস্তার পাশে। 

ঢাকা মহানগরিতে পানিবদ্ধতা এখন মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন শহরে জলাবদ্ধতার আশিভাগই হচ্ছে ব্যবহৃত পলিথিনের কারণে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ৫/৭ বছরে ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়বে। সামান্য বৃষ্টিতেও ঢাকার শান্তিনগর, মতিঝিল, মগবাজার, নবাবপুর রোড পানিতে ডুবে যায়। দীর্ঘদিন জমে থাকা এ পানি দুর্গন্ধ ছড়ায় ও মশার বিস্তার ঘটায়। এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৪২ লাখ পলিথিন আবর্জনা হিসেবে ফেলা হচ্ছে। এভাবে প্রতি বছর ১৮০ কোটি পলিথিন ব্যাগ ঠাঁই করে নিচ্ছে আমাদের চারপাশে।

প্লাস্টিক বা পলিথিন আমাদের পরিবেশকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জীবন ও জীবিকার উপর সৃষ্টি করছে মারাত্মক হুমকি। এসব কথা মেনেও পলিথিনকে বর্জন করা যাচ্ছে না পুরোপুরি। আসলে যেকোনো কাজেই বিশেষ করে বাজার-ব্যাগ হিসেবে পলিথিনের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ বিশ্বের সেরা পাট উৎপাদনের দেশ বাংলাদেশ। পলিথিনের বিপরীতে পাটের ব্যববহার দ্রুত বাড়াতে হবে। আগে যে পাটের থলেতে আমরা বাজার করতাম সেই কালচারে আমাদের ফিরে যেতে হবে। আশার ব্যাপার ধান, চাল, গম, আটা, চিনি, ভুট্টায় পলি (বস্তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে সরকার) এতে যেমন পাটশিল্পের সম্প্রসরণ হবে, তেমনি পলিব্যাগের দৌরাত্ম্য থেকে জাতি মুক্তি পাবে। দেশের পরিবেশও সুন্দন হবে। মানুষ পলিব্যাগ ব্যবহারের কারণে কতগুলো স্বাস্থ্যগহত সমস্যায় পড়ছে তা থেকেও মুক্তি পাবে।

লেখক : পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ