বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পার্বত্যাঞ্চলে সংঘাত অনিবার্য করে তুলেছে সরকার

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকতগুলো কিংবা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন তথা নারিকেল জিঞ্জিরা যেমন আমাদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে, তেমনি আমাদের দেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশ জুড়ে যে পার্বত্য অঞ্চল, তাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি। বিনোদন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার টানে এক অঞ্চলের মানুষ ছুটে যায় আর এক অঞ্চলে। আবার অনেকেই আছেন, যারা পাশাপাশি দেখতে পছন্দ করেন দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন, প্রাচীন স্থাপত্য। আমরা যেমন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, টেকনাফ, পতেঙ্গা, কুয়াকাটার বিশাল জলরাশির সৌন্দর্য দেখে অভিভুত হই, তেমনি রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির সুউচ্চ পাহাড়, সুগভীর গিরিখাদ, জুমচাষীদের পুড়িয়ে দেওয়া জমিনে ফুলের বাগান। নাম না জানা আরও কতো ফুলের সমাহার দেখে বিমুগ্ধ হই। এসব পার্বত্য এলাকা ভ্রমণে কখন গিয়ে দাঁড়াই মেঘের ওপরে। নিচে বৃষ্টি হয়। আমরা নির্বিঘেœ মেঘের সীমানার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকি। বৃষ্টিতে ভিজি না। গিরিখাত ধরে রোমাঞ্চকর যাত্রার ভেতরেও আছে অপার আনন্দ।

তেমনি কক্সবাজার, টেকনাফ, পতেঙ্গার সমুদ্র সৈকতে বিশাল জলরাশির সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়বার আনন্দ আমরা উপভোগ করি। কুয়াকাটায় একদিকে যেমন সমুদ্রের সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে খেলা করি, তেমনি একই সৈকতে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পারি সাগরের ভেতরে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। আমরা গর্ব করে বলি, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত আছে বাংলাদেশে, কক্সবাজার। আবার তেমনিভাবে বলি, পৃথিবীর আর কোনো সমুদ্র সৈকত থেকে একই সঙ্গে দেখা যায় না সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। এই গর্ব জাতি- ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল মানুষের। এসব অঞ্চলে বেড়াতে গেলে তাই সকল ধর্ম বর্ণ জাতি উপজাতির মানুষ চোখে পড়ে এই অপরূপ সৌন্দর্য। সকলেই ছুটছে ‘চক্ষু মেলিয়া’ নিজ ঘর থেকে ‘দুই পা ফেলিয়া’ সৌন্দর্য আহরণের জন্য। এটা মানুষের চিরন্তন সৌন্দর্যপিপাসূ মনের আকাক্সক্ষা। তাই যে যখন সময় পাই নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি।

এখন যদিও মানুষ সময় বের করে যে-কোনো ঋতুতে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তবে সবচেয়ে বেশি বের হন সাধারণত শীতকালে। তার কারণও আছে। নবেম্বর-ডিসেম্বরে সাধারণত ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা শেষ হয়। তখন অভিভাবকরা সময় পান। সন্তানদের নিয়ে সমুদ্র, পাহাড়ে বেড়াতে বের হন। হোটেল- মোটেলগুলোতে জায়গা পাওয়া যায় না। কখনও কখনও এত ভিড় হয় যে, ভ্রমণ পিপাসূরা রাস্তায় তাঁবু টানিয়ে কিংবা গাড়িতেও ঘুমান। তবু বেড়াতে যান। এ লক্ষণ ভালো। অর্থাৎ আমাদের দেশেও এখন একটা বড় ভ্রমণ-পিপাসূ শ্রেণী তৈরি হয়েছে। যারা নিজের দেশের সকল দর্শনীয় স্থান দেখে নিতে চান। এই শীতে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও এর  দু- একটি উপজেলা সফরে গিয়েছিলাম।  সর্বত্রই সব কিছুই ছিল উৎসব মুখর। মানুষ ছুটছে আলুটিলার সুড়ঙ্গের দিকে। অনেকেই মশাল জ্বালিয়ে পিচ্ছিল পাথুরে ঝর্ণার পানি প্রবহমান সুড়ঙ্গ পথ পাড়ি দিয়ে এসে উল্লাসে করতালি দিচ্ছে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে ছবি তুলছেন। তারপর হয়তো ছুটছেন খাগড়াছড়ির চেঙ্গি নদীর উপর ঝুলন্ত সেতুর দিকে। চেঙ্গি নদীর উপর তৈরি হয়েছে নতুন সেতু। নিচে র‌্যাবার ড্যাম। এখনও পানি প্রবহমান। ফলে র‌্যাবার ডামে পানি আটকানোর দরকার হয় না। তবু ভিড় আছে মানুষের। নদীর এপারে-ওপারে উপজাতীয়দের ছোট-খাটো দোকান-পাট। চা-বিুস্কট কলা পান চানাচুর এই সব বিক্রির পণ্য। তারাও সবার সঙ্গে হাসি-মুখ, তাদের বাঙালি বা উপজাতি ভেদ করতে দেখিনি। 

সেখান থেকে কেউ কেউ ছুটছেন সাজেকের দিকে। সাজেক রাঙ্গামাটি জেলায় হলেও যেতে হয় খাগড়াছড়ি এলাকা ঘুরে। পাহাড়ি সেই ৭০ কিলোমিটার পথ অপরূপ সবুজ-শ্যামলিমায় ভরা। সাজেকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আছে। টিলার মাথা সমান করে সেখানে ঘুরবার ব্যবস্থা। একাধিক রকম টিলা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সাজেকের কমলা বিখ্যাত। কমলার বাগান বেশ দূরে। ততদূর হয়তো কেউ যায় না। পাহাড়, চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয়। কিন্তু তবু মানুষের পদভারে মুখরিত সাজেক। এক সময় এখানে থাকবার ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। মুরগি- চাল-ডাল মসলা এসব নিয়ে যেতে হতো খাগড়াছড়ি থেকে। তারপর উপজাতীয়দের বাসভবনেরই কোনো একটি কক্ষে ভাড়ায় রাত কাটাতে হতো। অর্থের বিনিময়ে রান্নাও করে দিতো তারাই। তাতেও মানুষের উৎসাহের অভাব ছিল না। রাত্রিযাপনের সেটুকু কষ্ট স্বীকার করেই সাজেকে বেড়াতে যেতেন পর্যটকরা। এখন সাজেকের শীর্ষ পর্যন্ত পাকা রাস্তা, গাড়ি বা বাসে করে আড়াই তিন ঘন্টার মধ্যে খাগড়াছড়ি থেকে সেখানে পৌঁছানো যায়। ঘুরে ফিরে দেখে দিনকে দিন ফেরতও আসা যায়। তাছাড়া পর্যটকের আনাগোনায় সেখানকার উপজাতীয় অ-উপজাতীয় বাসিন্দারা দোতলা-তিনতলা ঘরবাড়ি তুলেছেন। নিজেরা এক তলায় থাকেন বাকিটা ভাড়া দেন। তাদের সাধ্যানুযায়ী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি বিছানাপত্রের ব্যবস্থারও তারা চেষ্টা করেন। ফলে এখন আর দুর্গম নেই সাজেক। পর্যটকের ভিড়ও বেড়েছে। 

পর্যটনের জন্য রাঙ্গামাটি বরাবরই বিখ্যাত। এখানকার পাহাড়, সেই সঙ্গে কাপ্তাই লেকের অফুরন্ত পানি, ঝুলন্ত ব্রিজ, রাজবাড়ি, বুদ্ধ মন্দির। এই সব আকর্ষণীয় স্থান আছে। খাদ্য রুচির পরিবর্তনের জন্য উপজাতীয় রেস্তরাঁ আছে। মধ্যম মানের খাবারের দোকানেরও অভাব নেই। কিন্তু দেখলাম, হোটেলগুলোতে স্থান সংকুলানের অভাব। অনেকেই ব্যাগ-ব্যাগেজ সন্তান-সন্ততি নিয়ে লবিতে বসে আছেন, কখন রুম খালি হবে। তারা হয়তো রাতের কোনো বাসে দূর-দূরান্ত থেকে ভোরে এসে রাঙ্গামাটি পৌঁছেছেন। কখন তারা কোনো একটি রুমে ঢুকবেন। শিশুরা এসব মানতে চায় না। তারা মা-বাবাকে নাজেহাল করে ছাড়ছে। কোথায় রুম, রুমে যাব। হোটেল মালিকেরা ‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে রুম বরাদ্দ করছেন। অধিকাংশ রুমই আগে থেকে বুকিং দেওয়া আছে। চেক-আউট টাইম ১২টা হলেও ন’টার মধ্যেই সবাই হোটেল রুম ছেড়ে দিচ্ছেন, উঠছেন নতুন পর্যটক। নষ্ট করার সময় নেই। ছুটবেন কোনো টুরিস্ট স্পটের দিকে। সমুদ্র সৈকতগুলোতে সেন্টমার্টিন বা কুয়াকাটায়ও একই দৃশ্য। 

রাঙ্গামাটির সুবিধা এই যে, সেখানে সমুদ্র নেই বটে, কিন্তু কাপ্তাই লেকের বিশাল জলধি পর্যটনের আরও এক আকর্ষণীয় ব্যবস্থা। পর্বত আরোহণ থেকে নৌকা ভ্রমণ এক সঙ্গেই করা যায়। আমরা রাঙ্গামাটিতে একদিন কাটিয়ে পর্যটন স্থানগুলো ঘুরে রওনা হয়েছিলাম লংগদু উপজেলার দিকে। স্রোতহীন শান্ত পানির অফুরান এই লেকের প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকার মাছের পোনা ছাড়া হয়। সব ধরণের মাছ। রুই, কাতল, মৃগেল, চাপিলা, আইড়, বোয়ালসহ আরও সব দেশী মাছ। লোপিয়ার পোনাও ছাড়া হয় প্রচুর। জেলেরা কেউ কেউ রাতভর মাছ ধরেন। কেউ কেউ দিনভর। মাছ ধরার ব্যাপারে তারা স্বাধীন। এই জন্য সরকারিভাবে কাউকে কোনো পয়সা দিতে হয় ন্।া কিন্তু উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদ্ াদিতে হয়। রাঙ্গামাটিতে লংগদু উপজেলা সাড়ে তিন ঘন্টার পথ। লঞ্চ এগিয়ে গেলে কেবলই অপার সৌন্দর্য। লেকের তীর জুড়ে সূর্য পাহাড়। লেকের মাঝখানে স্থানে স্থানে বসতি। কেউ উপজাতীয়, কেউ বাঙালি। তারা থাকেন পরিবার-পরিজন নিয়েই। লেকের শেষ প্রান্তে পাহাড়ের গা- ঘেঁষে গ্রাম। সেখানেও মিশ্র বসতি। কিন্তু শান্তিতে বোধ করি কেউ নেই। লংগদু যাবার পথে কোথায়ও কোথায়ও লেক মেঘনার মোহনার মতো চওড়া। এপাশ থেকে ওপাশ দেখা যায় না। কোথায়ও কোথায়ও মাছের আশায় পানকৌড়ির ঝাঁক বসে। লঞ্চ কাছাকাছি এলে একসঙ্গে পানির উপর দিয়ে দৌড়ে কিংবা উড়াল দিয়ে দূরে চলে যায়। কোথায়ও একাকী একটি পানকৌড়ি বসে থাকে কোনো বাঁশের কঞ্চির ডগায়। এখনও অনেক ছোট-বড় দ্বীপ আছে জনতিবসতিহীন। বারবার মনে হয়েছে, এর প্রতিটি দ্বীপ হতে পারে একটি একটি পর্যটন স্পট। লেকে উপযুক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব নয়। কিন্তু সরকারের ভুল নীতি সে ব্যবস্থাকে ম্লান করে রেখেছে। অথচ যদি মালদ্বীপের মতো এগুলোকে পর্যটন স্পট করা যেত তাহলে আয় হতো পারতো বিপুল অঙ্কের অর্থ। কর্মসংস্থান হতে পারতো হাজার উপজাতীয় ও বাঙালির। 

এই পথেও যে কত কিছু দেখার আছে! সেটি বর্ণনা করা কঠিন।  এই পথে আছে বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই। আছে সুভলংয়ের ঝর্ণাধারা। এখন শীতকালে শুষ্ক। কোনো মতে পাথর ভিজে থাকে। বিশাল ঝর্ণাধারার পানি গড়িয়ে পড়ে বর্ষায়। তখন হাজারও মানুষ সেই ঝর্ণার নিচে পরিতৃপ্তির গোসল সারে। সুভলং বেশ বড় জনপদ। বাঙালি উপজাতি এখানে মিলেমিশে থাকে। সাধারণত পাহাড়ের গভীরে যেসব উপজাতীয় বসবাস করে, তারা সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন তাদের পণ্য সামগ্রী নিয়ে শহরগুলোতে আসেন। এরা দরদাম বোঝেন কম। যা চান দিতে হবে তাই। সে পণ্য শহুরে উপজাতীয়রাও কেনেন, বাঙালিরাও কেনেন। পণ্যের বৈচিত্র্যও যে খুব বেশি তাও নয়। মাটির নিচের আলু, মুলা, মুলা শাক, ক্ষীরা। আমার অচেনা আরও শাকসবজি, বাঁশ কোড়ল, ধেনে মরিচ- এই সব নিয়ে আসেন তারা। এইগুলো বিক্রি করে কিনে নিয়ে যান নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য। এই ধারা প্রায় সর্বত্রই, সকল বাজারেই। 

কাপ্তাই লেকের চমৎকার মনোরম পরিবেশের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি লংগদুর দিকে। পথে আরও দু’একটা জনবসতি দেখলাম। দেখতে দেখতে এক সময় পৌঁছে গেলাম লংগদুতে। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে কীভাবে যে সাড়ে তিন ঘন্টা পেরিয়ে গেলো টেরই পাইনি। লংগদুতে আমাদের গ্রহণ করার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েকজন। আমাদের সহায়তা করার জন্য রাঙ্গামাটি থেকে বরাবরই সঙ্গী ছিলেন বিশ বছরের তরুণ মনু মারমা। অমায়িক। যেন সে সাহায্যের হাত বাড়িয়েই আছে। লঞ্চ থেকে লগি ধরে নামা-ওঠা সর্বত্রই ছিল মনুর হাত। তার বাড়ি রাঙ্গামাটি থেকে লঞ্চে প্রায় সাত ঘণ্টা দূরে বাঘাইছড়ি উপজেলায়। বাঘাইছড়িতে নেমে বর্ষার দিনে ট্রলারে যেতে আরও ঘন্টাখানেক। না হলে বাঘাইছড়ি থেকে পায়ে হেঁটে তিন ঘন্টার পথ। বাবা-মা কৃষিজীবী। আছে একটি ছোট ভাই আর একটি বোন। বোনটি এবার অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছে। মনু মারমার সংগ্রামী জীবন। তার লেখাপড়ার খরচ যোগানোর সাধ্য তার বাবা-মার নেই। 

মনু মারমা নবম শ্রেণীতে পড়তে পড়তে চলে এসেছিল রাঙ্গামাটিতে। জীবিকা আর লেখাপড়ার সঙ্কল্প নিয়ে। বাঘাইছড়ি উপজেলার নিজ গ্রামে তার সহজে যাওয়া হয় না। যাতায়াতে প্রায় হাজার টাকা খরচ। এত টাকা সে কোথায় পাবে। রাঙ্গামাটি এসে সে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করেছে। রাস্তা তৈরির কাজে ইট-খোয়া বয়েছে, কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে রানদা মেরেছে। সেই ফাঁকে চালিয়ে গেছে নিজের পড়াশুনা এবং এই কৃতসংকল্প কিশোর এসএসসি পাসও করেছে। এখন রাঙ্গামাটির প্রায় আড়াই ঘন্টা দূরে কোনো এক কলেজে ভর্তি হয়েছে। ঠিক মতো কলেজে যাওয়াও হয় না, কিন্তু নাম লিপিবদ্ধ আছে। টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। পাস করেছে। এরপর ফাইনাল পরীক্ষা নিয়ে সে চিন্তায় অস্থির। এখন যে কাজ করে, তাতে কোনো মতে দিন চলে। এক পত্রিকার সম্পাদক তার অফিসে তাকে থাকবার সুযোগ করে দিয়েছেন। অনলাইনে টুকটাক কাজ করে যা আয় করে, তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু হাল ছাড়ছে না মনু মারমা। সে পুলিশের চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিল। ইন্টারভিউতে টিকেও ছিল। কিন্তু সে জানালো চাকরির জন্য চাকরিদাতারা ৫ লক্ষ টাকার ঘুষ চায়। ৫ লক্ষ তো দূরের কথা ৫ হাজার টাকা জোগাড় করাও তার জন্য কঠিন। তবুও সে হতাশ নয়। যেভাবেই হোক পড়াশুনা চালিয়ে যেতে চায় সে। আশা, একদিন না একদিন একটা না একটা কিছু হবেই। 

তার পাহাড়ি জীবনের গল্প খুব সহজ নয়। বাঘাইছড়ির ওমন যে গন্ডগ্রামে তার পৈত্রিক আবাস, সেখানেও উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের থাবা বিস্তৃত আছে। ধান কাটলে চাঁদা, ফসল বিক্রি করলে চাঁদা, ছাগল বিক্রি করলে চাঁদা, তরিতরকারি বিক্রিতে চাঁদা। মাছ ধরলে চাঁদা। এভাবেই চাঁদা দিতে দিতে অস্থির তার পরিবার। কিন্তু উপজাতীয়রা একেই নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে। অথচ সরকারের নজর সেদিকে নেই। উপজাতীয় হোক আর বাঙালিই হোক, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সেদিকে কর্তৃপক্ষের মনোযোগ নেই। তাদের মনোযোগ যেন কেবলই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এভাবেই দুঃসহ দিন কাটছে সেখানকার পাহাড়ি ও বাঙালিদের। এর মধ্যে রাহুগ্রাসের মতো সরকার করতে যাচ্ছে ভূমি আইন- সে এক সর্বনাশা পদক্ষেপ। 

লঞ্চ ভেঁপু বাজিয়ে থামলো লংগদু ঘাটে। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, কোনো ঘাটেই উঠা-নামার পারাপারি নেই। যারা লঞ্চে উঠবেন, তারা গাঠরি-বোচকা নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। যারা নামবেন তারাও নামছেন সুশৃঙ্খলভাবেই। তা না হলে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকতো। তবু লঞ্চ ঘাটে ভেড়ার আগেই ডেকের সামনে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে গেলেন। লংগদুতে নামবেন, নামবারও সেই একই ব্যবস্থা। লঞ্চের একজন সহকারী একটি লগি ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেটি নড়বড় করে। সিঁড়িটিও পদভারে দুলতে থাকে। যারা অভ্যস্ত তারা দ্রুত পায়ে নেমে যান। আমরা ঠিক করলাম, নামবো সবার শেষে। তাই হলো। সকল যাত্রী নেমে যাওয়ার পর আমরা লগি ধরে নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। ততক্ষণে মনু মারমা আমাদের ব্যাগ-ব্যাগেজ নামিয়ে ফেলেছে। যারা আমাদের গ্রহণ করতে এসেছিলেন, তারাও এগিয়ে এলেন। আমরা এগিয়ে গেলাম লংগদুর ছোট বাজারে। স্বাগতিক বললেন, ওঠেন। কোথায় উঠবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তিন-চারটি মোটর সাইকেল দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি বললেন, এই  মোটর সাইকেলে ওঠেন। কেননা  মোটর সাইকেলই সেখানকার একমাত্র যানবাহন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই  মোটর সাইকেলের পেছনে বসে যার যার গন্তব্যে যান।  মোটর সাইকেলের সীটও বেশ বড়। অনায়াসে তিনজন বসা যায়। আমরা জানতে চাইলাম, যেখানে যাব সেটা কতদূর। স্বাগতিক জানালেন, এই সামনের মোড়টা পেরোলেই। একজন আমাদের গোটা তিনেক ব্যাগ নিয়ে একটি মোটর সাইকেলে উঠে পড়লেন। আর আমরা হেঁটেই গন্তব্যে রওনা হলাম। (আগামী কিস্তিতে সমাপ্য)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ