শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অপরিহার্য’

২৯ ডিসেম্ব, বিবিসি, রয়টার্স : ফিলিস্তিনের দখলকৃত এলাকায় ইসরাইলের বসতি নির্মাণে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি বিপন্ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া ৭০ মিনিটের এক বক্তৃতায় কেরি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরাইলের বিভিন্ন পদক্ষেপে হতাশা ব্যক্ত করেন।

 মেয়াদ শেষের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে দেয়া এ বক্তৃতায় কেরি বলেন, ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রে বসবাস করবে, এ বিষয়টি ইসরাইল মেনে না নেয়া পর্যন্ত তারা কখনোই আরবদের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে পারবে না। 

তিনি বলেন, “কয়েক বছর ধরে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুই রাষ্ট্র সমাধান এখন একটি গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শান্তির আশা বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেখেও আমরা কিছু না বলে বা করে থাকতে পারছি না।”

“বিবেকের তাড়নায় আমরা বসতি স্থাপনের বিষয়ে যারা চরমপন্থি তাদেরকে সমর্থন করতে পারছি না, কারণ এটি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়ানো ফিলিস্তিনীদের পদক্ষেপের দিকেও আমরা চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি না। একক রাষ্ট্র গঠনে কাউকে সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বার্থ নেই।” -বলেন কেরি। এর প্রতিক্রিয়ায় তড়িঘড়ি করে দেয়া এক বিবৃতিতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কেরির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ আনেন।

তিনি বলেন, বিদেশী নেতাদের লেকচারের দরকার নেই ইসরাইলের। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার জন্য সামনে তাকিয়ে আছে ইসরাইল। 

কেরির মন্তব্য ও নেতানিয়াহুর জবাবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের তিক্ত সম্পর্কের শেষটা চিহ্নিত হয়ে থাকল। ফিলিস্তিনের দখলকৃত এলাকায় ইসরায়েলের বসতি নির্মাণ ও ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে ওবামা-নেতানিয়াহু প্রশাসনের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়।

দুই প্রশাসনের সম্পর্ক সবচেয়ে নাজুক পর্যায়ে নেমে যায় যখন দখলকৃত এলাকায় ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে গেল শুক্রবার একটি প্রস্তাব পাস করে জাতিসংঘ। অতীতে জাতিসংঘের এই ধরনের পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিলেও এবার তা করেনি।

এর প্রতিক্রিয়ায় ওবামা ও কেরিকে সরাসরি তীব্র আক্রমণ করে কথা বলেন ইসরাইলি কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ও গোপনে বহুবার ইসরাইলকে বসতি নির্মাণ বন্ধের অনুরোধ করেছে বলে জানিয়েছেন কেরি।

ওবামা প্রশাসনের বিদায়কালীন কেরির এসব কথাবার্তা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে পরিস্থিতি পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখবে না বলেই ধারণা পর্যবেক্ষকদের। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ওবামা প্রশাসনের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির দেয়া ভাষণকে ইসরাইলবিরোধী আখ্যা দিয়ে ইসরাইল তীব্র নিন্দা জানালেও বিপরীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাবাদ জানিয়ে কেরির অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিন।

গত শুক্রবার ১৫ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বসতি নির্মাণ বন্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, ‘১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল যে বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে, তার কোনও আইনি ভিত্তি নেই।’ নিরাপত্তা পরিষদের ১৪টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলে তা পাশ হয়। ভোট দান থেকে বিরত থাকে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে অতীতে তারা ইসরাইলবিরোধী প্রস্তাবগুলোতে ভেটো দিতো।

তবে ফ্রান্সের প্যারিসে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি সম্মেলন-এ দেয়া ৭০ মিনিটের ওই ভাষণে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ওবামা প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেন কেরি। ভাষণে তিনি মন্তব্য করেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি নির্মাণ বন্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই কেবল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসতে পারে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের দায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইসরাইল এর আগে অভিযোগ করেছিল, বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটিকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চায়। ওই অভিযোগ খ-ন করে কেরি বলেন, ‘ওই প্রস্তাবের কারণে ইসরাইল বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। বরং এর মূল কারণ হলো ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের স্থায়ী নীতি। যা শান্তি প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলছে।’

 কেরির ভাষণের কয়েক মিনিট পরেই এক বিবৃতিতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি কেরির ভাষণকে ইসরাইলবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেন, ‘ওই বক্তব্য ছিল ভারসাম্যহীন এবং মাত্রাতিরিক্ত ইসরায়েলি বসতিকেন্দ্রিক।’ তিনি অভিযোগ করেন, কেরি তার ভাষণে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী অভিযানের পক্ষে অবিরাম বলে গেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘সমস্যার মূলে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দেয়া। আর তা দেখতে পাচ্ছেন না কেরি।’

এদিকে কেরির বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ফিলিস্তিন। জাতিসংঘ স্বীকৃত এই পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস মনে করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে তার দাবি, শান্তি আলোচনা শুরুর আগে ইসরাইলকে অধিকৃত ভূখ- থেকে তাদের বসতি সরিয়ে নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ