সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

খুলনা সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের সরবরাহ না থাকায় রোগীদের দুর্ভোগ

খুলনা অফিস : তিন মাস আগে শিশু হালিমাকে (৭) কুকুরে আঁচড় দেয়। এরপর থেকে তার প্রায়ই বমিবমি ভাব, ঠিক মতো খেতে চায় না। খাওয়ায় প্রায়ই অরুচি। মা তানিয়া বেগমের সাথে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন দিতে আসেন। কিন্তু ভ্যাকসিন না থাকায় তাকে বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।
রূপসা উপজেলার লকপুর খাজুরা এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম (৩৩)। স্বামী ইলিয়াস পেশায় একজন দিনমজুর। তিনি বলেন, একটি ভ্যাকসিনের দাম ৪৮০ টাকা। এই একটি ভ্যাকসিন ৪ জনের আক্রান্ত শরীরে পুশ করা যায়। সে হিসেবে ৪ জন মিলে কিনলে এক একজন ভাগে পড়ে ১২০ টাকা। তারপর যাওয়া আসা খরচতো আছে। স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। পুরো টাকাই যদি আমার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হয়, তাহলে খাবো কি। শুধু হালিমা ও ফাতেমাই নয়, অনেকেই জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন কিনে এনে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ অক্টোবর থেকে হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। ফলে রোগীরা বাইরে থেকে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন র‌্যাবিক্স-ভিসি ৪৮০ টাকায় কিনে এনে ৪ জনে একত্রিত হয়ে দিচ্ছেন। গত ৪ অক্টোবর থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত রোগীরা নিজেরাই ভ্যাকসিন কিনে এনে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। সে হিসেবে গত ৮০ দিনে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন দেওয়া হয় মোট ৩ হাজার ২৮৭ জনকে। এর মধ্যে অক্টোবর মাসে ৯১৫ জন, নভেম্বর মাসে ১১৮০ জন ও ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেওয়া রোগীর সংখ্যা ১১৯২ জন। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন রোগী ভ্যাকসিন কিনে এনে চিকিৎসার ব্যয় মেটাচ্ছেন। ওই সময়ে মধ্যে ভ্যাকসিন বাইরে থেকে রোগীরা ক্রয় করেন ৮২২টি। যার মূূল্য দাঁড়ায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪০ টাকা। প্রতিটি ভ্যাকসিন মূল্য ৪৮০ টাকা। যা ৪ জনে দিতে পারেন।
চিকিৎসকরা জানান, এই রোগের রোগীরা জল দেখে বা জলের কথা মনে পড়লে প্রচন্ড আতঙ্কিত হয় বলে এই রোগের নাম জলাতঙ্ক। ভাইরাসজনিত এই রোগটি সাধারণত কুকুর, শেয়াল, বাদুড় প্রভৃতি উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায়। এটি এক প্রাণী থেকে আরেক প্রাণীতে পরিবাহিত হয় তার লালা বা রক্তের দ্বারা। প্রতিবছর বিশ্বে যত মানুষ কুকুরের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার ৯৯ শতাংশই এই রোগের কারণে হয়।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, চাহিদার তুলনায় ভ্যাকসিন সরবরাহ কম দেওয়া হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে অবগতি করেছি। ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন আনার জন্য লোক পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালের রোগীরা চাহিদা অনুযায়ী একভাগ মাত্র ভ্যাকসিন পাচ্ছি। যা ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগামী জানুয়ারি থেকে হাসপাতালের রোগীর চাহিদার তুলনায় এ ভ্যাকসিন যাতে পর্যাপ্ত পাওয়া যায় সে বিষয়ে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাবো। এই ভ্যাকসিন আমরা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি।
হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, একজন জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন নিতে গেলে তার মাসে ৪টি ডোজ পরিপূর্ণ করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নেওয়ার পর তিন দিনের মাথায় দ্বিতীয় ডোজ, তৃতীয় ডোজ ৭ দিনের মাথায় ও শেষ ডোজ ২৮ দিনের মাথায় নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
পরবর্তীতে এক বছর আরও একটি কোর্স পূর্ণ করতে হবে। পরবর্তীতে ৫ বছরের আরও একটা ডোজ নেওয়া লাগে। এ ভ্যাকসিন হতদরিদ্র জন্য একটি ব্যয়বহুল।
চিকিৎসকদদের মতে ক্ষতস্থান চুলকানো, ক্ষতস্থানে ব্যথা, মুখ থেকে লালা নিঃসৃত হওয়া, উত্তেজনা, স্বল্পমাত্রায় জ্বর, গিলতে সমস্যা হওয়া, পানি পিপাসা থাকা, পানি দেখে ভয় পাওয়া, মৃদু বায়ু প্রবাহে ভয় পাওয়া, আবোল-তাবোল বকা, প্যারালাইসিস ইত্যাদি।
জলাতঙ্ক বা র‌্যাবিস একটি ১০০ ভাগ মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ রোগ। সুতরাং এ জাতীয় যেকোনো প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা কোনো ক্ষতস্থানে লালার স্পর্শ হলে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতস্থানটি প্রচুর সাবান পানি দিয়ে অন্তত ১০ মিনিট ধরে খুব ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। ক্ষতস্থানে পভিডন আয়োডিন বা অন্য কোনো অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে হবে এবং অনতিবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের আধুনিক ভ্যাকসিন গ্রহণ করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ