বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

১১ মাসে নিখোঁজ ৭০ ॥ গুম ৩৪

নাছির উদ্দিন শোয়েব: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ১১ মাসে ৭০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৪ জনকে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নবেম্বর মাস পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থার একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। 

কয়েকমাস আগে নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানেরও খোঁজ মেলেনি। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ হিল আমান আজমিরও হদিস মেলেনি। এই তিনজনের পরিবারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ তথ্য জানা গেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শুরুতে গুম কম হলেও মাঝামাঝি ও শেষের দিকে এসে এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে আবার অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনা বেড়ে গেছে বলে পরিবার থেকে অভিযোগ আসছে।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, একের পর এক মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের ঘটনার সুরাহা না হওয়া চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা, জবাবদিহির অভাব, মানবিক বিপর্যয়সহ অনেক খারাপ দিক সামনে চলে আসছে, যা মানবাধিকার ও অপরাধের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনা তদন্তের সুপারিশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সর্বশেষ নাটোর পৌর যুবলীগের তিন নেতাকর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা থেকে। তারা হলেন নাটোর সদর উপজেলার কানাইখালী এলাকার রেদওয়ান আহমেদ সাব্বির (৩২), আবু আব্দুল্লাহ (৩০) ও সোহেল আহমেদ (৩২)। সাব্বির নাটোর পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। বাকি দুজন পৌর যুবলীগের কর্মী। ঘটনার দুই দিন আগে তারা নিখোঁজ হন। 

গত ২৯ নবেম্বর থেকে ঢাকা ও পাবনায় আট শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের নিখোঁজ রহস্যের কিনারা হয়নি। গত ৪ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছে ২০টি পরিবার। দিন, মাস, বছর গড়ালেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঝেমধ্যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে কারো কারো লাশ উদ্ধার হয়। তবে সেই হত্যার রহস্যও অজানাই থেকে যাচ্ছে। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই আটকের অভিযোগ উঠছে, তবে সেই অভিযোগেরও কোনো সুরাহা হয় না।

জানা গেছে, গত ৪ আগস্ট সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছোট ছেলে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে ঢাকার সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। ঘটনার পর হুম্মামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হুজ্জাতুল ইসলাম আল ফেসানি মিডিয়া কর্মীদের জানান, ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে ট্রাইব্যুনালের রায় ফাঁসের ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজিরা দিতে গেলে গাড়ি থেকে নামার পর ডিবি পরিচয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।

হুম্মামের অপর আইনজীবী চৌধুরী মোহাম্মদ গালিব রাগিব ওই দিন সাংবাদিকদের বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ও ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে যান। কিন্তু গাড়ি থেকে নামার পরপরই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনের নিচ থেকে কয়েকজন লোক নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয়ে হুম্মামকে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় ফাঁসের মামলায় তথ্যপ্রযুক্তি ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দিতে আসেন হুম্মাম ও তার মা ফারহাত কাদের চৌধুরী। হুম্মাম সামনের আসনে চালকের পাশে ও তার মা পেছনের আসনে বসা ছিলেন। তারা ঢাকার দায়রা জজ আদালতের সামনে পৌঁছলে আরো মামলায় আটকের কথা বলে হুম্মামকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় ডিবি পরিচয়ধারী পাঁচ থেকে ছয়জন। এরপর থেকেই হুম্মাম নিখোঁজ। অবশ্য ঘটনার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে হুম্মামকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা হচ্ছে।

অন্যদিকে গত ৯ আগস্ট রাতে জামায়াতের সাবেক নেতা শহীদ মীর কাসেম আলীর ছোট ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সাদা পোশাকধারীরা মিরপুরের ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে নিয়ে যায় বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ওই রাত সোয়া ৯টার দিকে ৬-৭ জনের সাদা পোশাকের একদল লোক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ব্যারিস্টার আরমানের মিরপুরের ডিওএইচএসের বাসায় যায়। এ সময় আরমান দরজা খুললে তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় ওই অজ্ঞাত লোকজন। পরিবারের সদস্যরা কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কি না জানতে চাইলে তারা কোনো জবাব দেয়নি। এরপর থেকেই আরমান নিখোঁজ। চার মাস পার হলেও তার কোনো হদিস দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এখন পর্যন্ত পরিবার জানতে পারেনি আরমান কোথায়, কী অবস্থায় আছেন। আরমান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন ডিফেন্স ল’ইয়ার। 

এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লা- হিল আমান আযমীকে বাসা থেকে তুলে নেয়ার অভিযোগ করেছে পরিবারের সদস্যরা।

২২ আগস্ট রাত পৌনে ১২টার দিকে মগবাজার কাজী অফিস লেনের বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী বাহিনী তাকে তুলে নিয়ে গেছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাতে আযমীকে তার ১১৯/২ মগবাজারের বাসা থেকে আটক করা হয়। তবে কি কারণে তাকে আটক করা হয়েছে তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, রাত ১১টার কিছু আগে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা বড় মগবাজার কাজী অফিস গলিতে গোলাম আযমের বাড়ি ঘিরে ফেলে। এসময় ওই গলিতে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। একপর্যায়ে রাত সোয়া ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কিছু লোক বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে আমান আজমিকে দ্রুত বাসার ভেতর থেকে বের করে এনে গাড়িতে তোলা হয়। এর পর তিনটি গাড়ি ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ ঘটনার পর রমনা থানা পুলিশ জানায়, এ ধরনের একটি খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাই। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই আমান আজমিকে নিয়ে যায় বলে শুনেছি। তিনি জানান, ‘কারা তাকে নিয়ে গেছে তা আমরা নিশ্চিত হতে পারেনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ