সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

পুরো শীতকাল জুড়েই থাকছে গ্যাস সংকট

কামাল উদ্দিন সুমন : রাজধানী ঢাকা, শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, বন্দরনগর চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রায় সব এলাকাতেই গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যমান সংকটকে তীব্র করে তুলেছে শীতকালীন প্রতিকূল অবস্থা। সঞ্চালন ও বিতরণ পাইপ লাইনগুলোতে ময়লা ও উপজাত (কনডেনসেট) জমে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদনকারী বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে সৃষ্ট কারিগরি ত্রুটির কারণে এই সংকট শীতকাল জুড়েই থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্যাস স্বল্পতায় শিল্পাঞ্চলের অনেক কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কম্প্রেসার বসিয়েও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। কয়েকদফা গ্যাসের চাপ বাড়িয়ে অনুমোদন নিলেও কাক্সিক্ষত চাপে গ্যাস পাচ্ছে না কারখানাগুলো। ফলে একদিকে শিল্পপ্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েই চলছে। আবাসিক গ্রাহকদের কাঁধেও চেপেছে অতিরিক্ত খরচের বোঝা ও ভোগান্তি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের অনেক স্থানে দিনে চার ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেলেও পরবর্তী চার ঘণ্টা পাওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টায় ১২ ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেলেও রান্নার প্রচলিত সময়ে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় ২৪ ঘণ্টা গ্যাস থাকলেও চাপ কম হওয়ায় চুলা জ্বলে টিমটিম করে।

সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ আবাসিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। আবাসিক ছাড়াও বিদ্যুৎ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সিএনজি স্টেশনগুলো গ্যাস সংকটের ভুক্তভোগী। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৪০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গড় উৎপাদন ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ৭০ কোটি ঘনফুট। গত ৮ ডিসেম্বর উৎপাদন হয় ২৬৫ কোটি ৬৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস। শীতে গ্যাসের চাহিদা গরম কালের চেয়ে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট বাড়ে। এই সংকটের মধ্যে বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে হঠাৎ দেখা দেয়া কারিগরি ত্রুটি। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই ত্রুটি সারাতে অন্তত দুই মাস লাগবে। ফলে গোটা শীত মওসুমেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সংকট থাকবে।

সূত্র জানায়, রাজধানীতে গ্যাস সংকটে অপেক্ষাকৃত বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে যেসব এলাকার মানুষ তার মধ্যে রয়েছে মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, কাজীপাড়া, ইন্দিরা রোড, গ্রিন রোড, কলাবাগান, শুক্রাবাদ, কাঁঠালবাগান, মোহাম্মদপুর, রাজাবাজার, মগবাজার, মালিবাগ, তেজকুনিপাড়া, পশ্চিম রামপুরা, বাসাবো, আরামবাগ, আর কে মিশন রোড, টিকাটুলি, মিরহাজারিবাগ, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, উত্তরা, জাফরাবাদ, লালবাগ, কেরানীগঞ্জ। তিতাস গ্যাসের জরুরি নম্বরে ফোন করে প্রতিদিনই গ্রাহকরা এ সংক্রান্ত অভিযোগ করছেন।

সম্প্রতি বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে নিয়মিত সংস্কার কাজ শুরু করা হয়। তখন এতে কিছু কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। ৯ ডিসেম্বর ওই সংস্কার কাজ করার কারণে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হয়।

সঞ্চালন ও বিতরণ পাইপগুলোর অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরনো। শীতকালে ময়লা ও গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট জমে পাইপগুলো সরু হয়ে পড়ে। সবমিলিয়ে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র জানায়, ঢাকাসহ এর আশপাশের অন্তত ১৪টি জেলায় গ্যাস বিতরণ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল)। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান বলেন, চাহিদার চেয়ে এমনিতেই গ্যাসের জোগান কম। তাই বিতরণেও ঘাটতি থাকে। শীতকালীন চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন সে অনুপাতে বাড়েনি। বরং সম্প্রতি বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে সঞ্চালন লাইনে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ায় দৈনিক পাঁচ কোটি থেকে ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। তাই বিতরণ পর্যায়েও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি।

 পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিবিয়ানায় যে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে তা ঠিক করতে সপ্তাহখানেক লাগবে বলে ভাবা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, এটি ঠিক করতে প্রায় দুই মাস লাগবে। তাই এ বছর শীতকালীন গ্যাস সংকট আরো বাড়বে।

সূত্র জানায়, দুই কম্প্রেসারের সুফল পাচ্ছে না শিল্প: শিল্প-কারখানায় চাহিদানুযায়ী চাপে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় দুটি কম্প্রেসার স্থাপন করে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। এ প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।

জানা যায়, ঢাকা, জয়দেবপুর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, কালিয়াকৈর, আশুগঞ্জ, মনোহরদি, চন্দ্রা ও সাভারসহ এর আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ বাড়ানোর জন্য ২০০৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় দুটি গ্যাস কম্প্রেসার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১৪ সালে এগুলো চালু হয়েছে। জিটিসিএল সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে আশুগঞ্জে গ্যাসের চাপ ছিলো ৬০০ থেকে ৭০০ পিএসআই (প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে চাপের পরিমাণ)। কমেপ্রসার স্থাপনের পর এর মাত্রা এক হাজার পিএসআইয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করা হয়। এছাড়া টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় গ্যাসের চাপ ৪৫০-৫৫০ পিএসআই থেকে বেড়ে এক হাজার পিএসআই-এ উন্নীত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ