ঢাকা, সোমবার 20 September 2021, ৫ আশ্বিন ১৪২৮, ১২ সফর ১৪৪৩ হিজরী
Online Edition

২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের সফলতা ও ব্যর্থতা

অনলাইন ডেস্ক: আর মাত্র ছয়দিন পরেই শেষ হতে যাচ্ছে ২০১৬ সাল। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে পুরো বিশ্ব প্রস্তত, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনও এর ব্যতিক্রম নয়। বড়দিন ও নতুন বছরকে সামনে রেখে বিশ্ব ফুটবলে আপাতত কিছুদিন ছুটির আমেজ থাকলেও ক্রিকেটাররা বক্সিং ডে’কে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতিতে দারুন ব্যস্ত।

বছর শেষে পুরো বছরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের কিছু সফলতা ও ব্যর্থতা খোঁজার চেষ্টা করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। তারই কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো :

সফলতা :

লিস্টার সিটি:

গত মৌসুমের প্রিমিয়ার লীগের শিরোপা প্রথমবারের মত ঘরে তুলে ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছে ক্লডিও রানেইরির লিস্টার সিটি। মৌসুম শুরুর আগে যেখানে তাদের পক্ষে জয়ের বাজি ছিল ৫০০০-১ সেখানে প্রিমিয়ার লীগের ট্রফিটি হাতে নিয়ে মৌসুম শেষে পুরো লিস্টারই হয়ে গেছে স্বপ্নের একটি ক্লাব। অথচ আগের মৌসুমেই নাটকীয় ভাবে রেলিগেশন খরা থেকে নিজেদের কোনরকমে রক্ষা করেছির ফক্সেসরা। হয়ত সেই সময় থেকেই রূপকথার ভিতটি রচনা হয়ে গিয়েছির রানেইরির শিষ্যদের। দলের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশী অবদান ছিল স্ট্রাইকার জেমি ভার্দির। ইংলিম এই স্ট্রাইকার জাতীয় দলের সতীর্থ হ্যারি কেনের থেকে পিছিয়ে ২৪ গোল করে লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। দলের আরেক তারকা রিয়াদ মাহরেজ পিএফএ বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের খেতাব জয় করেছে। অন্যদিকে ভার্দি ও মাহরেজের সাথে এন’গোলো কন্টে ও ওয়েস মরগান বর্ষসেরা দলে জায়গা করে নিয়েছে। 

এডার :

গিনি-বিসাওতে জন্মগ্রহণকারী এই স্ট্রাইকারের জয়সূচক গোলে ইউরো ২০১৬ এর ফাইনালে ফ্রান্সকে অতিরিক্ত সমেয় ১-০ গোলে পরাজিত করে পর্তুগাল প্রথমবারের মত শিরোপা জয় করেছে। আর এই এক গোলেই দলের তারকা খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পেপেদের পিছনে ফেলে জয়ের নায়কে পরিনত হয়েছেন এডার। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে এ পর্যন্ত খেলা ২৮টি ম্যাচে গোল করেছেন মাত্র তিনটি। তাও আবার সবগুলো গোলই এসেছে প্রীতি ম্যাচে। স্তাদে ডি ফ্রান্সে ফাইনালে মাত্র ১৩ মিনিট মাঠে ছিলেন এডার। রোনালদো ইনজুরির সুবাদে ২৮ বছর বয়সী এডারকে অতিরিক্ত সময়ে মাঠে নামানো হয়। ৩০ গজ দুর থেকে তার জোড়ালো শট ফ্রেঞ্চ গোলরক্ষক হুগো লোরিসের পক্ষে আটকানো সম্ভব ছিল না। 

লুভো মানইয়োনগা :

ক্যারিয়ারে প্রতিপক্ষদের সাথে লড়াইয়ের পাশাপাশি ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়ে কঠিন ও অন্যরকম এক লড়াই শেষে আবারো ট্র্যাকে ফিরেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই লং জাম্পার। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে রিও অলিম্পিকে জয় করে নিয়েছেন রৌপ্য পদক। ২০১১ সালের দায়েগুতে বিশ^ চ্যাম্পিয়নশীপে পঞ্চম হয়েছিলেন। কিন্তু ঐ আসরের পরপরই নিষিদ্ধ ড্রাগের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে মানইয়োনগার জীবন ও ক্যারিয়ার। ২০১২ সালে ড্রাগ টেস্টে ইতিবাচক ফল আসায় তাকে ১৮ মাসের জন্য সব ধরনের প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু সব কিছুকে পিছনে ফেলে আবারো নিজেকে এ্যাথলেটিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনেন। ব্রাজিলে যুক্তরাষ্ট্রে জেফ হেন্ডারসনের কাছে এক সেন্টিমিটারেরও কম দূরত্বের জন্য স্বর্ণ পদকটি হাতছাড়া করেন। কিন্তু তারপরেও গেমসে অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক একটি গল্পের জন্ম দিয়েই দেশে ফিরেছেন।

শিকাগো কাবস :

ক্লেভল্যান্ড ইন্ডিয়ানসকে দূর্দান্তভাবে হারিয়ে ওয়ার্ল্ড সিরিজের শিরোপা জেতার কৃতিত্ব দেখিয়েছি জো ম্যাডিনসের শিকাগো কাবস। এর মাধ্যমে বেসবল ক্লাবটির ১০৮ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। ১৯৩৫ সালের পরে এই প্রথম নিয়মিত মৌসুমে টানা ১০০টি ম্যাচ জিতেছে কাবস। ইন্ডিয়ানকে ৮-৭ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জয় করে কাবস। ওয়ার্ল্ড সিরিজে এত দীর্ঘ সময় ধরে কোন ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়নি। 

সিমোনে বিলেস : 

যুক্তরাষ্ট্রের এই জিমন্যাস্ট এবারের রিও অলিম্পিকে নিজের জাত চিনিয়েছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিলেস রেকর্ড সমান চারটি স্বর্ণ জয় করে যুক্তরাষ্ট্রের জিমন্যাস্টিকসকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দলীয় ইভেন্ট, ব্যক্তিগত অল এ্যারাউন্ড, ভল্ট ও ফ্লোর এক্সারসাইজে বিলেস স্বর্ণ পদক জয় করেন। বীম থেকে স্লিপ না করলে পঞ্চম স্বর্ণটি হাতের মুঠোয় চলে এসেছিল। ঐ ইভেন্টে পরবর্তীতে তিনি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। কিন্তু ততক্ষনে বিশে^র সেরা নারী জিমন্যাস্টেও তকমাটা বিলেসের গায়ে লেগে গেছে। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরীর আগনেস কেলেটি, একই বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের লারিসা লাটিনিনা, ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার ভেরা কারলাভাস্কা ও ১৯৮৪ সালে রোমানিয়ান একাটেরিনা সাজাবোর পরে পঞ্চম নারী কেলোয়াড় হিসেবে একই গেমসে চারটি স্বর্ণ পদক জয় করেছেন বিলেস। আর এই কৃতিত্বেও পরে অকপটেই ঘোষনা দিয়েছেন, ‘আমি উসাইন বোল্ট কিংবা মাইকেল ফেল্পসের পরে নই, আমি প্রথম সিমোনে বিলেস।’

অল ব্ল্যাকস :

টানা ১৮টি ম্যাচে জয়ের মাধ্যমে টায়ার ওয়ান জাতি হিসেবে রেকর্ড গড়েছে নিউজিল্যান্ড রাগবি দল। এর শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের আগস্টে ওয়ালাবিসের বিপক্ষে জয়ের মাধ্যমে। ঐতিহাসিক এই সাফল্যের মধ্যে আরো রয়েছে বিশ^কাপের তৃতীয় শিরোপা। ফাইনালে ট্রান্স-তাসমানিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে শিরোপা জয় করে ব্ল্যাক ক্যাপসরা। ২০১৬ সালটাও স্টিভ হানসেনের দলের জন্য ছিল সাফল্য ধরে রাখার বছর। ওয়েলসের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়, এরপর ডারবানে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫৭-১৫ পয়েন্টে উড়িয়ে দিয়ে রাগবি চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জয়। এরপরপরই ইডেন পার্কে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টানা ১৮ জয়ের রেকর্ড গড়ে নিউজিল্যান্ড। শিকাগোতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম পরাজয়ে তাদের ঐতিহাসিক জয়ের রেকর্ডে বাঁধা পড়ে।

ব্যর্থতা : মারিয়া শারাপোভা : 

জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনে ড্রাগ নেয়ার অপরাধে বিশ^ টেনিসের অন্যতম স্বর্ণকণ্যা মারিয়া শারাপোভার ক্যারিয়াওে কালো মেঘের ছায়া ঘনীভূত হয়। নিষিদ্ধ ঔষুধ মেলডোনিয়ামের অস্তিত্ব তার শরীরে ধরা পড়ায় আন্তর্জাতিক টেনিস ফেডারেশন সব ধরনের কার্যক্রম থেকে এই রুশ তারকাকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। পরর্বতীতে আপিলের প্রেক্ষিতে তা কমিয়ে ১৫ মাস করা হয়। কিন্তু এই ঘটনায় ব্যপক সমালোচনার মুখে পড়েন শারাপোভা। তবে পাঁচবারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম বিজয়ীকে সতীর্থ খেলোয়াড়দের কেউ কেউ সমর্থনও করেছেন। একইসাথে শারাপোভার পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। র‌্যাকেট, স্পোর্টসওয়্যার জায়ান্ট নাইকি তার পাশে ছিল। কিন্তু অন্যান্যরা তাৎক্ষনিকভাবে তার দিক থেকে মুখ সড়িয়ে নেয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে তার নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে। কিন্তু সব কিছুকে পিছনে ফেলে আবারো স্বাভাবিক ভাবে কোর্টে ফেরাটা যে মোটেই সহজ হবে না তা সহজেই অনুমেয়। 

স্যাম এ্যালারডিচ : 

ইংল্যান্ডের ম্যানেজারের পদে নিয়োগ পাওয়াটা এ্যালারডিচের ক্যারিয়ারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হলেও তা যে কেবল ৬৭ দিন স্থায়ী হবে তা বোঝা যায়নি। গণমাধ্যমের সাথে বিতর্কিত ঘটনায় তাকে মূলত পদ থেকে ছাটাই করতে বাধ্য হয় ইংলিশ ফুটবল এসোসিয়েশন। ৬২ বছর বয়সী এই ইংলিশম্যান দলবদলের বিভিন্ন গোপনীয় বিষয় গণমাধ্যমে ফাঁশ করার পাশাপাশি তার উত্তরসূরী রয় হজসন সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করে বিতর্কিত হয়েছিলেন। যার পরিনতিতে এফএ তাকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে কম সময়ে ইংল্যান্ডের ম্যানেজার হিসেবে ক্যারিয়ারে তিক্ত এক অভিজ্ঞতা নিয়েই এ্যালারডিচ জাতীয় দল ছেড়েছেন। 

রায়ান লোকটে :

রিও অলিম্পিকে ৪ গুনিতক ২০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে স্বর্ণ জয় করে যুক্তরাষ্ট্রের এই সাঁতারু যতটা না মার্কিনীদের পদক সংখ্যা বাড়িয়েছেন তার থেকেও বেশী সমালোচিত হয়েছেন অপ্রীতিকর এক ‘চুরির’ ঘটনায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। তিনজন সতীর্থসহ লোকটে ব্রাজিল পুলিশের কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন তারা রাতে গেমস ভিলেজে ফেরার পথে পেট্রোল পাম্পে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সব হারিয়েছেন। কিন্তু পেট্রল পাম্পের সিসিটিভিতে দেখা যায় পুরো ঘটনাটি সাজানো। এখানে কোন ধরনের চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনাই ঘটেনি। এই ঘটনায় লোকটের তিন সতীর্থ গানার বেনট, জিমি ফেইগেন ও জ্যাক কনগারকে চার মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। আর ৩২ বছর বয়সী লোকটেকে দশ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

নিক কিরগিওস : 

অক্টোবরে সাংহাই মাস্টার্সে মিসচা জেভেরেভের বিপক্ষে অশোভন আচরণ করায় অস্ট্রেলিয়ান টেনিস খেলোয়াড় নিক কিরগিওসকে আট সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ঘটনায় কিরগিওসকে একজন মনস্তত্ববিদ দেখানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একইসাথে তার শাস্তি কমিয়ে তিন সপ্তাহ করা হয়েছে। এর ফলে ২০১৭ মৌসুমের শুরুতেই তিনি কোর্টে ফিরতে পারবেন। ১৯৯০ সালে জন ম্যাকেনরোর পরে প্রথম কোন খেলোয়াড় হিসেবে কিরগিওস কোর্টে বাজে আচরণের দায়ে শাস্তি পেলেন। 

টাইসন ফিউরি : 

হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ভøাদিমির ক্লিটশোকোর দীর্ঘদিনের রাজত্বকে হটিয়ে ২০১৫ সালের শেষে নিজেকে নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন নিজস্ব স্টাইলের জন্য পরিচিত ‘জিপসি কিং’ টাইসন ফিউরি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে প্রচন্ড বিষন্নতায় ভোগা টাইসনের দেহে নিষিদ্ধ কোকেনের উপস্থিতি ধরা পড়ায় এক বছরের জন্য তার বক্সিং লাইসেন্স বাতিল করা হয়। 

সেপ ব্লাটার ও মিশেল প্লাতিনি :

ঠিক এক বছর আগে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম দুই শক্তিধর ব্যক্তি সেপ ব্লাটার ও মিশেল প্লাতিনিকে ফুটবলীয় কর্মকান্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফিফা সভাপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধভাবে দুই মিলিয়ন সুইস ফ্র্যাংক জটিলতায় দু’জনকেই অভিযুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে তার সত্যতার প্রমানও মিলে। যদিও বেশ কয়েকবারই এই দুজন সর্বোচ্চ আদালতে আপীলও করেছে। প্রাথমিক ভাবে আট বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারী হলেও পরবর্তীতে প্লাতিনির শাস্তির মেয়াদ চার বছর ও ব্লাটারের ছয় বছর করা হয়েছে। যদিও প্লাতিনি সুইস সিভিল কোর্টে নিজেকে নির্দোষ প্রমানে সফল হয়েছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ফিফার সভাপতি পদে থাকা ব্লাটারের পরিবতে সর্বোচ্চ এই পদে গিয়ানি ইনফানতিনো ও ইউয়েফা সভাপতি পদে প্লাতিনির স্ললাভিষিক্ত হয়েছেন স্লোভেনিয়ার আলেক্সান্দার সেফেরিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ