বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

খুলনায় বাগদা ও গলদা চাষে বছর জুড়ে লোকসান গুনতে হয়েছে চাষিদের

খুলনা অফিস : খুলনায় ‘সাদা সোনা’ খ্যাত বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষে এবার সারাবছর ধরেই লোকসান গুনতে হয়েছে চাষিদের। পাশাপাশি চলতি বছরের শেষ দিকে (নবেম্বর-ডিসেম্বর) এসে গলদা রফতানিতে দেশে-বিদেশে স্থবির অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গলদার চাহিদা কমে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজারগুলোতে।
তবে মধ্যস্বত্বভোগী ডিপোমালিক ও ফড়িয়াদের অভিযোগ, মাছ কোম্পানিগুলোর ইচ্ছেমাফিক বেঁধে দেয়া দরে গলদার ভরা মওসুমেও প্রতিকেজিতে চাষিদের লোকসান গুনতে হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ফলে লাভের কথা বাদ দিয়ে পুঁজি বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা।
জানা গেছে, ভাইরাস মুক্ত পোনার সঙ্কট, অতিবৃষ্টিতে চিংড়ির ঘের ভেসে যাওয়া, চিংড়ির ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, উৎপাদনে কারিগরি জ্ঞানের অভাব ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধিসহ ৭ কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে উপকুলের ১০ লাখ চিংড়ি চাষি। এরই মধ্যে অনেক ঘের মালিক গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ মহামারির মত রূপ নিয়েছে। এতে চিংড়ির গুণগত মান যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির যে কদর ছিলো তা হারাচ্ছে। জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনাসহ উপকূলীয় জেলার প্রায় দুই লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতিবছর বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ হয়। এর মধ্যে শুধুমাত্র খুলনায় চিংড়ি চাষে জড়িত রয়েছেন প্রায় ৫ লাখ মানুষ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এখানে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছরে বাগদার উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও কমেছে গলদার উৎপাদন।
জানা গেছে, স্থানীয় চিংড়ির বাজারগুলোতে গত বছর মাঝারি গ্রেডের যেসব চিংড়ি ৯০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে চলতি বছরের নবেম্বর-ডিসেম্বরে তার দাম বাজারে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। ছোট গ্রেডের চিংড়ি গত বছর ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা বিক্রি হচ্ছে ৪০০/৪৫০ টাকা। আর ১২০০ টাকার বড় গ্রেডের চিংড়ির বর্তমান দাম ৯০০ টাকায়। মাঝারি গ্রেডের প্রতিকেজি চিংড়ি উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। সেই সাথে রয়েছে ঘেরে শ্রমিকের মজুরি, জমির মালিকের হাড়ির টাকা ও আনুষঙ্গিক খরচ। ফলে চিংড়ি চাষিরা চলতি বছরে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের মৎস্য চাষি সুনীল সরকার জানান, ‘বাজার দর বিগত বছরের তুলনায় কেজিতে ৩/৪শ’ টাকা কম। কোম্পানিতে মাছের কোন রেট (দাম) নেই। এতে আসল পয়সাও কারো ঘরে যাবে না, শতভাগ চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ডুমুরিয়ার বাসিন্দা ঘের ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান জানান, মওসুমের শুরুতে এবার অতিবৃষ্টিতে ঘের ভেসে যাওয়ায় অনেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে। এখন চিংড়ি বিক্রিতে লোকসান হওয়ায় দেনার টাকা কিভাবে শোধ করবো তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
ডুমুরিয়ার বড়ডাঙ্গা গ্রামের জাহিদুর রহমান জানান, প্রতিবছর মাছ ধরার মওসুমে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চিংড়ির দাম কমানো হয়। এতে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। তবে মধ্যস্বত্বভোগী ডিপো মালিকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো গতবছরের তুলনায় এবার চিংড়ির দাম কমিয়ে নির্ধারণ করেছে। ফলে বাজার থেকে বেশি দামে মাছ কিনলে তাদেরকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্ট এসোসিয়েশনের পরিচালক ও আছিয়া সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম জহির জানান, গলদা রফতানিতে বর্তমানে দেশে-বিদেশে একটা স্থবির অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গলদার চাহিদা কমে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোতে।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শামীম হায়দার জানান, পুশ বন্ধে মৎস্য অধিদপ্তর, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। এছাড়া পুশের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ