শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

চলতি বছরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১৭ বনদস্যু ॥ ৬০ জনের আত্মসমর্পণ

খুলনা অফিস : খুলনার কয়রার কুশোডাঙ্গা গ্রামের খানজাহান আলী খানজাকে কাঁকড়া নৌকা থেকে অপহরণ করে নিয়ে মুক্তিপনে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে সুন্দরবনের দস্যু আজিজুল বাহিনী। হতদরিদ্র খানজাহান আলী খানজা (৪৫) মুক্তিপণের টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গত ২ ডিসেম্বর গুলী করে হত্যা করে দস্যুরা। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদি হয়ে কয়রা থানায় দস্যু বাহিনী প্রধান আজিজুল ও হাসানের নাম উল্লেখ্যসহ অজ্ঞাতদের আসামী করে গত ৫ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করেন। উপরোক্ত কথা উল্লেখ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কয়রা থানার এস আই কিশোর কুমার আরও বলেন, ‘দস্যুরা এখনো লোকালয়ে উঠেনি। তবে বনদস্যুদের সহযোগী মদিনাবাদ এলাকার রইজ উদ্দিনের ছেলে আরাফাত হোসেন উজ্জ্বলকে গ্রেফতার করতে পারলে মূল ঘটনা জানা যাবে। তার সাথে বনদস্যুদের সখ্যতা রয়েছে। ইতোপূর্বে উজ্জ্বলের নামে দু’টি ডাকাতি মামলা রয়েছে। খানজাহান আলী খানজাকে গুলী করে হত্যার সময় সেখানে উপস্থিত ছিল কি না, সেটা গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে। এখনো তো প্রায় প্রতিদিন সুন্দরবনে দস্যুতার কথা শুনছি জেলে-বাওয়ালীদের কাছ থেকে।  পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, আসন্ন গোলপাতা সংগ্রহের মওসুমকে টার্গেট করে নিজেই নতুন দস্যু বাহিনী গঠনে কয়রা, শ্যামনগর ও রামপাল এলাকায় সদস্য সংগ্রহ করছে ওই উজ্জ্বল। শুধু বনদস্যু উজ্জ্বল নয়, এভাবেই আসন্ন গোলপাতা সংগ্রহের মওসুমকে টার্গেট করে নতুন নতুন বাহিনী গঠনের চেষ্টায় রয়েছে দস্যুরা। বনজীবী, পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। যদিও চলতি বছরে বাহিনী প্রধানসহ রেকর্ড সংখ্যক অর্ধশতাধিক বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। মরেছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ও। তবুও থামছে না সুন্দরবনের দস্যু তৎপরতা।
র‌্যাব-৬ ও র‌্যাব-৮ এর সূত্র মতে, সুন্দরবনে চলতি বছরে ৬০জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে র‌্যাব। বিভিন্ন ঘটনায় চলতি বছরে র‌্যাব-৮ এ সাত ও র‌্যাব-৬ এ দু’জন এবং পুলিশের সাথে অন্তত ৮/১০ জন দস্যু কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।
সর্বশেষ সুন্দরবনে জলদস্যু শামসু বাহিনীর সাথে র‌্যাব-৮এর সাথে গুলী বিনিময়কালে দু’জন নিহত হয়েছে। তবে গত ২৭ নবেম্বর বনদস্যু খোকা বাবু বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়ানো দুর্ধর্ষ ছয়টি বনদস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু বাহিনীর মধ্যে রয়েছে মাস্টার বাহিনী, মজনু, ইলিয়াস বাহিনী, সাগর এবং আলম শান্ত বাহিনী। দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বনদস্যুরা র‌্যাবের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ পথ বেছে নেয়।
২৮ নবেম্বর খোকা বাবু বাহিনীর প্রধান কবিরুল ইসলাম ওরফে খোকা বাবুসহ ১২ বনদস্যু ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার তিনটি গুলী জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বরিশাল র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
এরআগে, গত ৭ সেপ্টেম্বর বনদস্যু আলম-শান্ত বাহিনীর ১৪ সদস্য ২০টি অস্ত্র ও ৫৯৬টি গুলী এবং ১৪ জুলাই মজনু-ইলিয়াস বাহিনীর ১১ সদস্য ২৫টি অস্ত্র ও এক হাজার ২০ রাউন্ড গুলী জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে।
সর্বপ্রথম চলতি বছরের ৩১ মে সুন্দরবনের অন্যতম বাহিনী মাস্টার বাহিনীর ১০ সদস্য ৫২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৪ হাজার ৫০০ রাউন্ড গুলী জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাগেরহাটের মংলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। চলতি বছরের ২৪ মে উপকূলীয় জেলাসমূহে মৎস্যজীবী জেলেদের মৎস্য আহরণ নির্বিঘœ ও জলদস্যু দমনে জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভা শেষে খুলনা সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেছিলেন, দস্যু দমনে সুন্দরবনের পশ্চিম বনবিভাগে র‌্যাবের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। গ্রেফতার জল ও বনদস্যুদের ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। গত দুই বছরে সুন্দরবনে এক হাজার ৩৩৭টি অভিযান পরিচালনা করেছে র‌্যাব। এসব অভিযানে দু’বছরে ৩৫ জন দস্যু নিহত হয়েছে। সুন্দরবনে অস্ত্রের যোগান ও সরবরাহ করে থাকেন শহরের অভিজাতরা। এসব অস্ত্রের উৎস্য খুঁজে বের করা হবে। অস্ত্র সরবরাহকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। সুন্দরবনে প্রবেশ করা নৌকায় অত্যাধুনিক ডিভাইস স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন তিনি। টাস্কফোর্সের ওই ৬ষ্ঠ সভায় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রতিনিধি মো. কবিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিনিধিদের দেয়া বক্তব্য কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়নি, তবে দস্যুদের তালিকা আছে। সুন্দরবনে নতুন নতুন লোক আসছে। বর্তমানে শামসু বাহিনী, আলিম বাহিনী, নান্নু বাহিনী ও জাহাঙ্গীর বাহিনী এবং শরণখোলার নিচে কিছু বাহিনী আছে। একেবারে ছোট ছোট বাহিনী। পাইপগান নিয়ে ৫/৭ জনে মিলে নতুন নতুন বাহিনী গঠন করছে। দলের দু-একজনকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য জানা যায়। জাহাঙ্গীর বাহিনী আত্মসমর্পন করবে বলে যোগাযোগ করছে। আত্মসমর্পণ করলে ভাল। এছাড়া আমাদের অভিযান আগামীতে আরো বেগবান হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ