শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষে সাত শ্রমিক নেতা আটক ॥ ১৩৫ শ্রমিক বরখাস্ত

স্টাফ রিপোর্টার ও সাভার সংবাদদাতা : আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে বরখাস্ত, মামলা ও আটকের মধ্যে উইন্ডি অ্যাপারেলসের পর আরেকটি পোশাক কারখানার ১৩৫ জন শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বৃহস্পতিবার বাইপাইল এলাকার ‘ফাউন্টেন গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড’ কারখানার বরখাস্ত এই শ্রমিকদের রঙিন ছবিসহ নোটিশ মূল ফটকে টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে এর আগে গত বুধবার ১২১ জন শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্ত করে উইন্ডি কর্তৃপক্ষ। 

এদিকে চলমান শ্রমিক আন্দোলনে উস্কে দেয়ার অভিযোগে সাভার উপজেলা পরিষদের বিএনপি সমর্থিত (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান মিনি আক্তার উর্মিকে (৩২) আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের আশুলিয়ার নবীনগর এলাকা থেকে আটক করে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি ও আশুলিয়া থানা পুলিশ। 

ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির (ওসি) এফ এম সায়েদ বলেন, আশুলিয়ায় চলমান শ্রমিক আন্দোলনে উস্কে দেয়ার অভিযোগে সাভার উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনি আক্তার উর্মির নামে সকালে একটি আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে তাকে মামলার ভিতিত্বে নবীনগর থেকে তাকে আটক করে আদালতে প্রেরণ করা হয়। আদালত তাকে কাশিমপুর কারাগারে প্রেরণ করেন। মিনি আক্তার উর্মিকে আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সাভারের সাবেক সংসদ সদস্য ও ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা.দেওয়ান মোঃ সালাউদ্দিন বাবু। 

অন্যদিকে, আশুলিয়ায় শ্রমিক অশান্ত’র ঘটনায় বুধবার রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে সাত শ্রমিক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। ঢাকা জেলা-পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করানো হতে পারে বলে প্রথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এমন সন্দেহ থেকে এ অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সাত শ্রমিক নেতাকে জিজ্ঞাসবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। 

আশুলিয়া থানার এসআই শাহাদাৎ হোসেন জানান, শ্রমিক অসন্তোষের সময় উসকানি দিয়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে শ্রম আইনে কারখানাটির ১৩৫ জন শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্তসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় কর্তৃপক্ষ। সাময়িক বরখাস্ত শ্রমিকদের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় ডাকযোগে নোটিসের কপি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

এছাড়াও বুধবার উইন্ডি অ্যাপারেলস লিমিটেড ও ফাউনটেইন গামের্ন্টস কর্তৃপক্ষ ২৪৯ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে ‘উসকানি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের’ অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের করে। মামলা হওয়ার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে জামগড়া এলাকা থেকে মাসুদ ও বাকের নামের দুই শ্রমিক ও পরে পাঁচ শ্রমিক নেতাকে আটক করে। এরপর গভীর রাতে আরও দুই শ্রমিক নেতা ও ১০ শ্রমিককে আটক করা হয় বলে আশুলিয়া থানার ওসি মহসিনুল কাদির জানান।

বুধবার আটকদের মধ্যে সাত শ্রমিক নেতার পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্টের সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি সৌমিত্র কুমার দাশ, গার্মেন্ট অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন, স্বাধীন বাংলা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আল কামরান, সাধারণ সম্পাদক শাকিল ও বাংলাদেশ তৃণমূল গার্মেন্ট শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শামীম খান, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির (বিসিডাব্লিউএস) আশুলিয়ার সংগঠক মো. ইব্রাহিম ও টেক্সটাইল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের আহব্বায়ক মো.মিজান।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু জানান, গভীর রাতে জামগড়া এলাকা থেকে তাদের সংগঠনের ছয়জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে তাদের পরিচয় তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। শ্রমিক নেতাদের আটকের খবরে সাধারণ শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই গ্রেফতারের ভয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে।

বেতন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য দাবিতে সোমবার আশুলিয়ার ২৫টি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ শুরু করেন। এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রী, নৌমন্ত্রী ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে; মঙ্গলবার কাজ বন্ধ থাকে ৫৫ কারখানায়। বিভিন্ন সংগঠনের শ্রমিকনেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা আন্দোলনে সমর্থন না দিলেও শ্রমিকরা নিজেরাই সংগঠিত হয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আর এ বিষয়টি ধরেই শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোনো একটা পক্ষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের ক্ষতি করতে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে ‘অবৈধ’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরপর পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান মঙ্গলবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই ৫৫ কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে বলেন, শ্রমিকরা যতদিন কাজে যোগ না দেবে ততদিনের বেতন তারা পাবে না। বিজিএমইএ-এর ওই সিদ্ধান্ত বুধবার থেকেই কার্যকর করা হয়। বুধবার সকালে কারখানায় এসে নোটিশ দেখে ফিরে যান বন্ধ কারখানাগুলোর অনেক কর্মী। গতকালও তা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক মোস্তাফিজার রহমান বলেন, যে কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে কারখানাগুলোর প্রধান ফটকে এবং শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়কে হাজার সদস্য মোতায়েন করা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ