সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

নারায়ণগঞ্জে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে : শেষ হলো বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের (নাসিক) ভোট। ১৭৪ কেন্দ্রে ছোটখাট অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া তেমন কোনো গোলযোগের অভিযোগ উঠেনি। আগের নির্বাচনগুলোর ধারাবাহিকতাকে সামনে রেখে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা থাকায় কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল কম। দিনের প্রথম চার ঘন্টায় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩০ শতাংশের কম। নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা বিকেল ৪টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৬৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। পূর্ণাঙ্গ হিসাবে এই সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে। রাত সাড়ে ৯টায় এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত ভোট গণনা চলছে। নির্বাচনে ২৭টি ওয়ার্ডে ১৫৬ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ও ৩৮ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী এবং সাত জন মেয়র পদপ্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন। এই নির্বাচনে ভোটার চার লাখ ৮৯ হাজার ৩৯২ জন। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবার দৃষ্টি মেয়র পদে কে জিতেন। সেলিনা হায়াৎ আইভী না কি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
বিএনপি বলেছে, বাহ্যিকভাবে সারা দিন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পর্দার অন্তরালে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় সূক্ষ্ম বা স্থূল ইঞ্জিনিয়ারিং ঘটতে পারে। গতকাল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শেষ হওয়ার ২০ মিনিট পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ শঙ্কা প্রকাশ করেন। বিকেলের ব্রিফিংয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, এ সরকারের সময়ে নির্বাচনের ফলাফল ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা আমরা বহুবার দেখেছি। সংশয় হচ্ছে, শেষ মুহূর্তে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ঘটে কি না। তাই প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবার কাছে আহ্বান, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত পর্দার অন্তরালে যেন কোনো কিছু না ঘটে। এ সময় বিএনপির এই নেতা দলীয় প্রার্থীর সব নির্বাচনী এজেন্টদের ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত দৃষ্টিসীমার মধ্যে সতর্ক অবস্থানের আহ্বান জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, বাহ্যিকভাবে যা দেখেছি, তাতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তবে পর্দার অন্তরালে কি হয় তা আমাদের জানা নেই। ফলাফল ঘোষণার পর বলতে পারব। আরেক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই নেতা বলেন, আমাদের প্রার্থী তো বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। যদি সত্যিকার অর্থে কোনো কারচুপি না হয়, তাহলে জনগণের ইচ্ছা মেনে নেব। তবে পর্দার অন্তরালে অনেক কিছু ঘটতে পারে, অনেক কিছু করা যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চলে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। দিনব্যাপী এই ভোট চললেও অনেক কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ৯টা ২০ মিনিটে এবিসি ইন্টারন্যাশানাল স্কুলের এক নং কক্ষে মাত্র ৭টি ভোট পড়েছে। দুই নম্বর বুথে পড়েছে ১২টি। সকাল ১০টায় বিবি মরিয়ম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ১নং বুথে ভোট পড়েছে ৩৩টি। ৬নং বুথে মাত্র ১৬টি এবং ৩নং বুথে পড়েছে ৪৮টি ভোট।
বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ৮৯নং তাঁতখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মহিলাদের ১নং বুথে ভোট পড়েছে ১২০টি। ৪নং বুথে ভোট পড়েছে ৮০টি। একই কেন্দ্রে পুরুষদের ৮নং বুথে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ভোট পড়েছে ১২৭টি। যেখানে ভোটের সংখ্যা ছিল ৪০৮টি।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁতখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে আসা বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এডভোকেট মাহমুদুর রহমান ইসমাইল দৈনিক সংগ্রামের এই প্রতিবেদককে বলেন, মানুষের মাঝে একটি আতংক বিরাজ করছে। কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি অনেক কম। কারণ কি-জানতে চাইলে তিনি জানান, মানুষ জানে ভোটের ফলাফল কি হবে। বাহির থেকে যতই সুন্দর দেখাক না কেন ভোটে কে জিতবে সেটা সবারই জানা। এই আশংকা থেকে ভোটররা কেন্দ্রে আসছেন না। তাদের ধারণা ভোট দিয়ে কি হবে? কোথাও গোলোযোগের অভিযোগ পেয়েছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বড় ধরণের অভিযোগ পাইনি। তবে ভোটারদের পরোক্ষভাবে ভীতি দেখানো হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। ক্যামব্রীজ কিন্ডার গার্ডেন কেন্দ্রে দুপর ১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ১নং বুথে ভোট পড়েছে ১২৩টি। এভাবে প্রায় সব ক’টি কেন্দ্রেই উপস্থিতি ছিল কম।
নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা অনেকেই জানান, দুপুরের পর কিছু ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। তবে সেটিও আশানুরূপ নয়। এবার নতুন ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। রাশেদুল হাসান নামে এক নতুন ভোটার জানান, শান্তিপূর্ণভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি। ভোটার বিল্লাল হোসেন বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো শঙ্কা বা ভয় ছিল না। নির্বিঘেœ এ নির্বাচনে ভোট দিয়েছি।
নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়ে নয় হাজার সদস্যকে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫০ জন বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৫০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেছে।
সকালে ভোট শুরু হওয়ার ঘণ্টা দেড়েক পর আইভী যান তার নিজ কেন্দ্র পশ্চিম দেওভোগের শিশুবাগ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। সেখানে ভোট দিয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। আইভী বলেন, আমি যেখানে গিয়েছি সেখানে নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ হচ্ছে। এটা যেন বিকেল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তবে পরে নারী ভোটারের হয়রানির অভিযোগ আনেন আইভী। বলেন, ছোটখাটো কারণেও ভোটারদের কেন্দ্র থেকে ফেরত দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ভোটার কেন্দ্রে আসলে তাদেরকে মোবাইল রেখে আসেন, নম্বর ঠিক নাই ইত্যাদি কথা বলে ফেরত দেয়া হচ্ছে।
সকাল ৯টার দিকে নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডের মাসদাইরের আদর্শ স্কুল ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান। সাংবাদিকদের ভোটের পরিস্থিতিকে ভালো বলেছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল যাই হোক মেনে নেবেন তিনি। পরে তিনিও কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ভয়-ভীতির কারণেই তারা যাননি ভোট দিতে। অবশ্য দুপুরে তার এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভোট দেয়ার পরই সাখাওয়াত তার নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। ঘণ্টা পাঁচেক পর তিনি আবার নারায়ণগঞ্জ শহরে আসেন। বেলা পৌনে দুইটার দিকে সাখাওয়াত আসেন শহরের এটিআই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ভেতরের পরিস্থিতি দেখার পর সাংবাদিকরা তার কাছে ভোটের এখনকার চিত্র কেমন তা জানতে চান। তিনি বলেন, কিছু কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেন ভোটারদের উপস্থিতি কম-এ বিষয়টিরও একটি ব্যাখ্যা দেন সাখাওয়াত। বলেন, কারও প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বা ভীত হয়ে কিছু কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি কম। তবে কার ভয়ে এমনটি হচ্ছে-এ বিষয়ে কিছু বলেননি বিএনপির এই মেয়র প্রার্থী।
বেলা আড়াইটায় ভোট দিতে যাবেন আগেই জানিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। ঘোষণা মতো এই সময়েই তিনি এলেন কেন্দ্রে। ভোট দিলেন এবং বের হয়ে গেলেন। নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী কেন্দ্রের আট নং বুথে ভোট দেন তিনি। শামীম ওসমানের ভোট দেয়ার ঘটনাটি এই নির্বাচনের এক আলোচিত ঘটনা। গোপন বুথে না গিয়ে প্রকাশ্যেই নৌকায় ভোট দেন তিনি। শামীম ভোটকেন্দ্রে ঢোকা থেকে শুরু করে তার ভোট প্রদান আর কেন্দ্র থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পুরোটা সময়ই টেলিভিশন চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করেছে। এ সময় শামীম ওসমানের সমর্থকরা ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেন।
ভোট দেয়া শেষে শামীম ওসমান বলেন, এই নির্বাচনে জয় পরাজয় যাই হোক না কেন, ভোট নিয়ে যেন কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। শামীম বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোট নিয়ে কথা উঠেছে। সেখানে পুনঃগণনার দাবি উঠেছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে যেন এমন কিছু না হয় সেটাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। শামীম ওসমান জানান, এই নির্বাচনে আচরণবিধি নিয়ে তিনি অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন। বলেন, নির্বাচন বিধির কারণে আমি কোনো সেন্টারে যাইনি। ভোট দিয়ে আমি আবার ফিরে যাবো। এই নির্বাচনের কী ফল প্রত্যাশা করছেন- জানতে চাইলে শামীম বলেন, বাংলাদেশে দুটি শক্তি আছে, স্বাধীনতার পক্ষে আর বিপক্ষের শক্তি। আর একটি নিউট্রাল শক্তিও আছে। আমি বিশ্বাস করি, এই শক্তি এখন আমাদের পক্ষে। তিনি বলেন, আজকে এমনকি আগামীতেও জনগণ নৌকার পক্ষে রায় দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। শামীম ওসমান আবার বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি নির্বাচনের ফল আশানুরূপ হবে। আমরা জয়লাভ করবো। শামীমের বক্তব্য শেষ হতে হতে দুইটা ৫০ মিনিট পার হয়ে যায়। এরপর ঘড়ি দেখিয়ে তিনি বলেন, আর এক ঘণ্টা পর আমরা রেজাল্ট পাবো, আপনারা আইসক্রিম খাবেন ইনশাল্লাহ।
নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডের মাসদাইরের আদর্শ স্কুল ভোটকেন্দ্রে সকাল ৯টার দিকে ভোট দেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল প্রতীকের মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। এছাড়া সকালে সাড়ে ৮টার দিকে ১২নং ওয়ার্িের খানপুরের নারায়ণগঞ্জ বার অ্যাকাডেমি স্কুল ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মুফতী মাসুম বিল্লাহ। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইসলামী ঐক্যজোট বাংলাদেশের মিনার প্রতীকের মুফতি ইজহারুল হক ভোট দেন সরকারি তোলারাম কলেজ কেন্দ্রে।
সকাল থেকেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ থাকলেও পুলিশ সুপার মইনুল হক জানান, এই নির্বাচন নিয়েও নানা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। অবশ্য কারা এই গুজব ছড়িয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাব্ব মিয়া। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে এমন সুষ্ঠু ভোট কখনো হয়নি। যা এক কথায় নজিরবিহীন। গতকাল বিকেলে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের পর তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসক বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ যে সম্ভব আমরা তা প্রমাণ করেছি। সুষ্ঠুভাবে ভোট দেয়ার জন্য তিনি ভোটারদের ধন্যবাদ জানান।
এ সময় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, আমাদের কাছে যে হিসাব আছে, তাতে এমন কোনো কেন্দ্র নেই যেখানে ৫০ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ৭০ শতাংশ ভোটও পড়েছে। তিনি বলেন, কত শতাংশ ভোট পড়েছে আমাদের সে ব্যাপারে কোনো লক্ষ্য ছিল না। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ