শুক্রবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

দু টি অ ণু গ ল্প

আশরাফ পিন্টু :

কাহিনীর খোঁজে
একজন তরুণ লেখক। কিছু লিখতে চায় সে। কিন্তু কোথাও কাহিনী খুঁজে পায় না। যে কাহিনী সে লিখতে চায় তা যেন পূর্ববর্তী লেখকদের কাহিনীর সাথে মিলে যায়। গতানুগতিক হয়ে পড়ে তার গল্পের কাহিনী। সে চায় নতুন কিছু লিখতে; আনতে চায় কাহিনীতে স্বকীয়তা। কিন্তু কোথায় কাহিনী...?
সে প্রথমে গ্রামের মেঠো পথে হাঁটা দেয়। এখানে নাকি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সবুজ-নিটোল মনোরম সব কাহিনী। সে প্রথমে বটবৃক্ষের কাছে যায়। বটবৃক্ষকে বলে কাহিনীর খোঁজ দিতেÑযে কাহিনী হবে সম্পূর্ণ নতুন, কারো গল্প উপন্যাসের সাথে সে কাহিনীর কোনো মিল থাকবে না।
বটবৃক্ষ শান্তভাবে বলে; আমি তো নিশ্চল স্থবির অক্ষম এক জীব। আমার জীবনের কাহিনীতে তো কোনো বৈচিত্র্য নেই; পথিক আমার সুশীতল ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়-পরিশ্রান্ত হয়। আবার সেই পথিকই যাবার সময় আমার ডাল ভেঙে নিয়ে যায়। এ কাহিনী তোমার ভালো লাগবে না জানি। কারণ এতে কোনো নতুনত্ব নেই। তার চেয়ে তুমি মানুষের কাছেই ফিরে যাও। সেখানেই পাবে তুমি বৈচিত্র্যময় অনেক কাহিনী।
কিন্তু লেখক মানুষের কাহিনী লিখতে চায় না। লেখক চায় প্রকৃতির কাহিনী- যেখানে পাওয়া যেতে পারে নতুনত্ব। লেখক বটবৃক্ষের কাছে থেকে বিমুখ হয়ে নদীর কাছে যায়।
নদী বলে,Ñমানুষের মতো আমার চলৎশক্তি আছে, আছে গতিশীলতা। কিন্তু আমার কাহিনী তোমাকে তেমন বৈচিত্র্য দিতে পারবে না। আমার পানি তোমরা অর্থাৎ মানুষেরা নানা কাজে ব্যবহার করো, জমিতে ফসল ফলাও; তোমাদের জীবন বাঁচে সে ফসল খেয়ে। আবার সেই পানিকেই তোমরা দূষিত করো। মরণ ডেকে আনো সবার। তাই বহু বুদ্ধিমান মানুষের কাছেই তুমি ফিরে যাও। সেখানেই পাবে তুমি ভালো-মন্দ অনেক বৈচিত্র্যময় কাহিনী।
তবুও তরুণ লেখক মানুষের কাছে যায় না । মানুষের প্রতি বিতৃষ্ণ এ লেখক প্রকৃতির মাঝেই খুঁজে পেতে চায় বৈচিত্র্য কাহিনী। লেখক ধীরে ধীরে সূর্যের কাছে যায়। অনেক প্রতিকুলতার মধ্যদিয়ে সে সূর্যের কাছে পৌঁছে।
সূর্য তাকে পেয়ে খুব বাহবা দেয়। তার অভিনব চিন্তার কথা শুনে কিছুটা অবাকও হয়। সূর্য তেজোদ্দীপ্ত স্বরে বলে, আমার তেজের জন্যেই মানুষ আমার ধারের কাছে ঘেঁষতে পারে না। আমার ক্ষতি করতেও ভয় পায়। কারণ আজকাল তেজেরই জয়-জয়কার। তোমাকে আমি দুটো পথ দেখিয়ে দিতে পারি। প্রথমত, তুমি আমার তেজ নিয়ে লিখতে পারো। একটু চিন্তা করে পুনরায় সূর্য বলে, কিন্তু এ লেখাও হবে গতানুগতিক-ক্ষণস্থায়ী। কেননা এমন তেজোদ্দীপ্ত লেখা ইতোপূর্বে অনেক কবি-সাহিত্যিক লিখে গেছেন।
সূর্য কিছুক্ষণ থেমে দম নেয়। তারপর শান্ত স্বরে বলে,Ñআমার যেমন তেজ আছে তেমনি আছে স্নিগ্ধ মায়াময় বর্ণালি রং। তুমি এই বর্ণালি রঙে মন রাঙিয়ে লিখতে পারো। আর এটাই তোমার জন্য হবে উত্তম পন্থা।
লেখক পরিশেষে পাহাড়ের কাছে যায়। পাহাড় সব শুনে ধীর-স্থির ভাবে বলে আমিও তোমাকে তেমন কোনো নতুন কাহিনী দিতে পারব না। আমার বিশাল দেহ থেকে তোমরা অর্থাৎ মানুষেরা মাটি কেটে নাও; এতে আমার তেমন ক্ষতি না হলেও ভবিষ্যতের জন্যে তোমরাই ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছো। তবে তোমাকে আমি একটা উপদেশ দিতে পারি- তুমি আমার মতো ভাবুক হও। বটবৃক্ষের মতো পরোপকারী হও. সূর্যের বিভিন্ন বর্ণালির রঙে মন রাঙিয়ে নদীর স্রোতের মতো কল্পনার গতি বাড়িয়ে  দাও। তবে শুধু কল্পনা নয়, এর সঙ্গে বাস্তবতারও প্রয়োজন আছে। আর এ জন্যে তোমাকে শহরে যেতে হবে। সেখান থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করো এবং এসব কাছে লাগিয়ে তুমি তখন হয়ত নতুন কোনো কাহিনী লিখতে পারবে।
পাহাড়ের কথায় লেখক শহরে আসে। রাজপথ দিয়ে হাঁটতে থাকে বাস্তব কাহিনীর খোঁজে; যাকে কল্পনার রং লাগিয়ে তৈরী করবে নতুন কাহিনী। লেখক নিমগ্ন চিত্তে হাঁটতে থাকে, হাঁটতে থাকে...। মাঝে-মধ্যে চারপাশের দৃশ্যাবলীও দেখে চোখ তুলে - যা থেকে...।
চলার পথে পিছন থেকে একটি ট্রাক  এসে আচমকা লেখককে পিষে দিয়ে চলে যায়। মাথা থেকে  গলিত মগজ বের হয়ে পড়ে । লেখকের আর কাহিনী লেখা হয় না। হয়না নতুন গল্প লেখা।
তবে একটা নতুন কাহিনীর সৃষ্টি হয় লেখকের মৃত্যুর পর; যে কাহিনী সে লিখে যেতে পারে না।


জোনাকি ও শেয়াল

অমানিশা।
চারদিকে যেমন নিñিদ্র অন্ধকার তেমনি সুনশান নীরবতা। ঝিঁঝিঁ পোকাদের ছন্দময় ডাক সে নীরবতাকে যেন আরও গহীন-রহস্যময় করে তুলছে। কখনও বা পেঁচার চিৎকারে তার ছন্দ পতন ঘটছে, ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে সুনশান নীরবতা।
পেঁচাটি ডেকে ওঠার পরেই একটি শেয়াল গর্ত থেকে মাথা বের করে। ডেকে ওঠে “হুক্কাহুয়া” বলে। পরপরই পাশের গর্ত থেকে একাধিক প্রতিধ্বনি শোনা যায়। নি¯প্রাণ গোরস্থানটি যেন মুহূর্তে প্রাণ ফিরে পায়।
ইতোমধ্যে শেয়ালগুলো বেরিয়ে এসেছে গর্ত থেকে। একটি নতুন কবরের চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরছে। একটি শিশুর কবর এটি। শিশুটি পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। গতকাল বিকেলে কবর হয়েছে।
শেয়ালগুলো এবার সামনের দু’পা দিয়ে কবরের মাটি আঁচড়াতে থাকে। দেখতে দেখতে মৃতের কাফন টেনে বের করে ফেলে। এরই মধ্যে জুটে যায় আরও কয়েকটি শিয়াল। ওরা ওদের পিছনে দাঁড়িয়ে আনন্দে “হুক্কাহুয়া” ধ্বনি করতে থাকে।
একে একে মৃত দেহটিকে থাবা বসাতে উদ্যত হয় তারা। ঠিক তখনই কিছু জোনাকি উড়ে আসে ওদের কাছে। জোনাকিগুলো ওদের আশে-পাশেই ছিল। কিন্তু শেয়ালগুলো উল্লাসে এতই মেতেছিল যে খেয়াল করে নি। জোনাকিরা শেয়ালগুলোর চারপাশ ঘিরে উড়তে থাকে। শেয়ালগুলো কী ভেবে কিছুক্ষণের জন্যে মৃত দেহটিকে থাবা বসানো থেকে বিরত থাকে।
কবরটির পাশেই ওরা বৃত্তাকার হয়ে বসে পড়ে। ক্রমাগত শিয়ালের সদস্য যেন গুণিতক হারে বাড়তে থাকে। ১৩টি শেয়াল যেন ২৬টি কিংবা ৩৯টিতে রূপান্তরিত হয়। তারা পরস্পরের মধ্যে মত বিনিময় করে।
জোনাকিরা ওদের আশ-পাশ দিয়েই উড়তে থাকে। ওদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি হয় না। ৭টি জোনাকি একটু দূর দূরেই যেন উড়তে থাকে শিশুটিকে ঘিরে।
এক সময় জোনাকিরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। ঝাঁকে ঝাঁকে তারা আলো জ্বালাত রাত্রিতে। কিন্তু এখন ক্রমাগত কমতে কমতে মাত্র ৭টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। কেউবা চলে গেছে গোরস্থান ছেড়ে কেউবা রূপান্তরিত হয়েছে শেয়াল কিংবা গুবরেপোকায়।
অথচ একদিন জোনাকিরাই দল বেঁধে শেয়ালগুলোকে তাড়া করেছিল। অবশ্য সেদিন শেয়ালদের সদস্য ছিল নিতান্তই কম।  দুটি কিংবা তিনটি। পেঁচারাও ভয়ে গাছের ডালে বসত না। লাখে-লাখে ঝাঁকে-ঝাঁকে জোনাকি সমস্ত গোরস্থানে তারার মতো মেলা বসাত।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন গোরস্থানের পবিত্রতা চলে গেছে শেয়াল, পেঁচা আর গুবরেপোকাদের দখলে। সংখ্যায়ও ওরা এখন অনেক বেশি। ক্রমাগত ওদের সংখ্যা বাড়ছে; অন্যদিকে জোনাকিরা কমছে।
শেয়ালেরা পরামর্শ শেষ করে পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত দেহটির উপর। মুহূর্তে তারা ছিঁড়ে-খুঁড়ে খেয়ে ফেলে শিশুটিকে। পড়ে থাকে শুধু শিশুটির কঙ্কাল। খাওয়া শেষে কেউবা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে “হুক্কাহুয়া” বলে। কেউবা জয় ঘোষণা করে।
জোনাকিরা বেশ দূরে দূরেই উড়তে থাকে। হয়ত কিছুটা ভীত হয়েই এতক্ষণ দেখতেছিল ওদের পৈশাচিক উল্লাস। ধীরে ধীরে তারা স্থান ত্যাগ করে। কেউবা উড়ে চলে যেতে চায় গোরস্থানের বাইরে। কিন্তু যেতে পারে না। কী এক অদৃশ্য মমতায় তারা গোরস্থানেই থেকে যায়। তবে সর্বত্র বিচরণ করতে নয়, দূর থেকে আলো জ্বেলে পথ দেখাতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ