মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ফররুখ-চর্চায় মুহম্মদ মতিউর রহমান

ডক্টর সদরুদ্দিন আহমেদ : প্রখ্যাত ইংরাজ কবি টি.এস. এলিয়ট লিখেছেন : “People are often inclined to disparage poetry which appears to have no bearing on the situation of today.” ফররুখ আহমদ তাঁর সময়কে অস্বীকার করেন নি। বস্তুত তাঁর কাব্যে বিশেষ করে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’তে তাঁর সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে প্রকাশ পেয়েছে। তাই তাঁর কাব্য পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছিল এবং তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কিন্তু রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপেক্ষিত হন এবং তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে অবজ্ঞা, অবহেলা এবং অস্বচ্ছলতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাঁর কাব্য শুধু মুহূর্তের কাব্য ছিল না; তাঁর মধ্যে চিরন্তন মূল্য আছে। এটা বুঝতে হলে তাঁর কাব্যের চর্চা হওয়া উচিৎ। এই কাজে যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে মুহম্মদ মতিউর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় তিনি ‘ফররুখ একাডেমী’ (পরবর্তীতে ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’ নামে রেজিস্ট্রিকৃত) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে প্রতি বছর কবির জš§ ও মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয়। এ উপলক্ষে বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকরা কবির জীবন ও কর্মের উপর বক্তব্য রাখেন। কিন্তু ‘ফররুখ একাডেমী’র কর্মকা- শুধু কবির জš§ ও মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপনের মধ্যে সীমিত নয়। এ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফররুখ আহমদের একটি কাব্যগ্রন্থ (সিরাজাম মুনীরা), ফররুখ আহমদের উল্লেখযোগ্য ৩৬টি কবিতার ইংরাজি অনুবাদ (কবি আব্দুর রশিদ খান অনূদিত) ও ফররুখ আহমদের উপর কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করা ছাড়াও তাঁর সম্পাদনায় ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা’ নামে একটি মূল্যবান পত্রিকা প্রকাশ হয়ে থাকে। কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবস উপলক্ষে বছরে দু’বার এটি প্রকাশিত হয়ে থাকে। এ সংকলনে শুধু ফররুখকে নিয়ে লেখালেখি স্থান পায়।
আমার জানা মতে, এ ধরনের একটি পত্রিকা এদেশের অন্য কোন কবি বা লেখককে নিয়ে প্রকাশিত হয় না। এই কাজটা খুব সহজ নয়। লেখা যোগাড় করা বাস্তবিকই কঠিন। কারণ শুধু ফররুখ-বিশেষজ্ঞ ছাড়া অন্য কেউ তাঁর উপর লিখতে চান না বা পারেন না। আর ফররুখ-বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা খুব বেশী নেই। লেখা যোগাড় করতে হলে লেখকদের বার বার তাগাদা দিতে হয়। অনেক সময় লেখা দেবেন বলে ওয়াদা করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত লেখা পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় সম্পাদকের হতাশা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। কিন্তু মুহম্মদ মতিউর রহমান নাছোড়। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তিনি যেমন করে হোক লেখা আদায় করে ছাড়েন। আমি নিজে ফররুখের ৮/১০টি কবিতার বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা লিখেছি তার পত্রিকায়। বার বার তাগাদা না দিলে এ প্রবন্ধগুলো হয়তো কোন দিন লেখা হতো না। এভাবে ফররুখ-চর্চায় তিনি আমাকে যেমন উদ্বুদ্ধ করেছেন, আমার বিশ্বাস অন্যদেরকেও তেমনিভাবে তিনি উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। এর ফলে ফররুখ-চর্চার ক্ষেত্রে একটা মূল্যবান মাত্রা যোগ হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ প্রাতিষ্ঠানিক ফররুখ-চর্চার ক্ষেত্রে মুহম্মদ মতিউর রহমানের অবদান অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।
ফররুখ একাডেমীর তরফ থেকে যে সব পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, এর মধ্যে মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্র ‘বাংলা কাব্যে ফররুখ আহমদ : তাঁর শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের স্বরূপ’ এবং শাহাবুদ্দীন আহমদের ‘উপমা-শোভিত ফররুখ’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, মুহম্মদ মতিউর রহমান ফররুখ আহমদের অমর কাব্য ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্যটি ফররুখ একাডেমীর পক্ষ থেকে পুনর্মুদ্রণ করেছেন। এছাড়া, তাঁর সহযোগিতায় আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী লেখিকা ইয়াসমিন ফারুক ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ ও ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্য দু’টির ইংরাজি অনুবাদ করে তা প্রকাশ করেছেন। তাঁর আন্তরিক চেষ্টা ও আর্থিক সহযোগিতা না পেলে এ বইগুলো কোনদিন প্রকাশিত হতো কিনা সন্দেহ। তিনি যে শুধু অন্যের লেখা প্রকাশ করেছেন তাই না, নিজেও ফররুখের উপর অক্লান্তভাবে লিখে চলেছেন। ১৯৯১ সালে তিনি ‘ফররুখ প্রতিভা’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এ বইতে তিনি ফররুখের জীবন ও কাব্যের উপর আলোচনা করেন। ফররুখের ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থ তিনি পৃথকভাবে প্রকাশ করেন ২০০০ সালে। এর সঙ্গে তিনি একটি পান্ডিত্যপূর্ণ ভূমিকা সংযোজন করেন। তাছাড়া, তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ফররুখের উপর অনেক মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর ফররুখ-চর্চার অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন হিসাবে ২০০৮ সালের জুন মাসে কবির আশিতম জন্মদিবস উপলক্ষে তাঁর লেখা ‘ফররুখ প্রতিভা’র দ্বিতীয় সংস্করণ (৪৩২ পৃষ্ঠা) প্রকাশিত হয়। কলেবরের দিক থেকে যেমন এটি সমৃদ্ধ, উৎকর্ষতার বিচারেও এ গ্রন্থটির অবদান অপরিসীম।
এ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোকে মূলত দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ১) তথ্যমূলক, ২) সমালোচনামূলক।
যেকোন কবি সম্পর্কে তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ সম্পর্কে টি.এস. এলিয়ট লিখেছেন : "...any book, any essay, any note in Notes and queries, which produces a fact even of the lowest order about a work of art is a better piece of work than nine-tenths of the most pretentions critical journalism, in journals and books.”
ফররুখ সম্পর্কে যেসব তথ্য মুহম্মদ মতিউর রহমানের বইতে স্থান পেয়েছে সেগুলো ফররুখকে বুঝতে বা মূল্যায়ন করতে সহায়ক হতে পারে। সমালোচনার কাজ হচ্ছে elucidation of the works of art অর্থাৎ শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। মুহম্মদ মতিউর রহমান বইটির সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলোতে তাই করেছেন। তিনি ফররুখের প্রত্যেকটি কাব্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করেছেন। কোন কোন কবিতার সঙ্গে অন্য কবির কবিতার তুলনামূলক সমালোচনা করেছেন। যেমন ফররুখের ‘বৈশাখ’ কবিতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘বৈশাখ’ কবিতার তুলনা করেছেন। তাছাড়া, তিনি ফররুখের প্রত্যেকটি কাব্যের অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর বিষয়বস্তু আলোচনা করেছেন এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। এসব লেখায় তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি, তীক্ষè বিশ্লেষণ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। বস্তুত ফররুখের কাছে পৌঁছাবার একটি সেতু তিনি রচনা করেছেন এ বইটির মাধ্যমে। তিনি নিজে দীর্ঘকাল ধরে একনিষ্ঠভাবে ফররুখ চর্চায় নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট লেখক-গবেষকদেরকেও ফররুখ চর্চায় যথারীতি উদ্বুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর সুসম্পাদিত ‘ফররুখ একাডেমি পত্রিকা’য় প্রকাশিত বিশিষ্ট লেখকদের লেখা নিয়ে তিনি ‘ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য’ শীর্ষক একটি গ্রন্থের প্রথম খ- সম্পাদনাকারে প্রকাশ করেছেন ফেব্রুয়ারী ২০১৫ সালে (৬৫৬ পৃষ্ঠা)। গ্রন্থটির দ্বিতীয় খ- প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। ফররুখ চর্চার ক্ষেত্রে এ দু’টি গ্রন্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। তাঁর নিরলস ফররুখ চর্চা এদেশে এক বিরল দৃষ্টান্ত ও সাহিত্য-গবেষকদের জন্য নিঃসন্দেহে এক মহৎ অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।  
ফররুখ আহমদ আমাদের অন্যতম বড় কবি। তাঁর লেখায় আমাদের জীবনের সমগ্র রূপ প্রকাশ পেয়েছে : আমাদের আশা-আকাক্সক্ষা, আমাদের মানবতাবাদের আদর্শ, আমাদের সমাজের গ্লানি ও কদর্যতা। আর এ প্রকাশ অনবদ্য, অনন্য। এমন একজন কবির সামগ্রিক পরিচয় ও মূল্যায়নের লক্ষ্যে মুহম্মদ মতিউর রহমান নিরলসভাবে যে কাজ করেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এ কাজে তিনি শুধু একাই আত্মনিয়োগ করেন নি, ফররুখ একাডেমী (নিবন্ধীকৃত নাম : ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’) গঠন করে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ফররুখ চর্চার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার ধারণা। একজন ব্যক্তির কর্মপ্রয়াস সমষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার এবং এভাবে এক মহৎ কর্মোৎযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার এ দৃষ্টান্ত সমাজে, বিশেষত বাংলাদেশে অতি দুর্লভ। মুহম্মদ মতিউর রহমান এ দুর্লভ কাজে নিজেকে নিরন্তর ব্যস্ত রেখেছেন সম্পূর্ণ স্বতঃপ্রণোদিত ও নিঃস্বার্থভাবে। তাঁর আশিতম জন্মদিবস উপলক্ষে তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর সফল দীর্ঘায়ূ কামনা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ