বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২০
Online Edition

হত্যাকাণ্ডে জড়িত অধরা চার খুনীর পেছনে ছুটছে পুলিশ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর পুরনো ঢাকার গোপীবাগের আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর নৃশংস ছয় খুনের তিন বছর পার হচ্ছে আজ ২১ ডিসেম্বর বুধবার। ২০১৩ সালের এ দিনটি ছিল শনিবার। সেদিন পরিকল্পিতভাবে বাসায় ঢুকে কথিত একজন পীরসহ ছয়জনকে হত্যা করার ঘটনায় তিন বছরে মাত্র দুই আসামীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া চার খুনির নাম জানা গেলেও দীর্ঘদিনেও তাদের শনাক্ত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ অবস্থায় নিহত লুৎফোরের পরিবারটি অস্বস্তিতে। আতঙ্কের কারণে গোটা পরিবারের বাদবাকীরা অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত তরিকুল ইসলাম ওরফে মিঠু ও আবদুল গাফফার নামে দু'জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে মাহফুজ, রনি, জাহিদ ও আতিক নামে আরও চারজনের নাম পাওয়া গেছে। ছয়জনই জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পুরনো অংশের কিলিং স্কোয়াডের সদস্য। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনটির ওই গ্রুপটিই ছয় খুনে অংশ নেয়। পলাতক চারজনকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। 

২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর গোপীবাগের ৬৪/৬ নম্বর বাড়ির দোতলায় খুন হন কথিত পীর লুৎফোর রহমান ফারুক। একই সময়ে একই কায়দায় তার ছেলে সারোয়ার ইসলাম ফারুক ওরফে মনির, লুৎফোরের অনুসারী মঞ্জুর আলম, মো. শাহিন, রাসেল ও মজিবর সরকারকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে বাসায় লুটপাট চালায় তারা। আজ বুধবার চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকান্ডের তিন বছর পার হচ্ছে। ওই ঘটনায় লুৎফোরের বেঁচে যাওয়া ছেলে আবদুল্লাহ আল ফারুক ওয়ারী থানায় মামলা করেন। ওই মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য জানিয়ে ডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, নিহত লুৎফোর নিজেকে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও পীর দাবি করতেন। তিনি ও তার অনুসারীরা ধর্মের প্রচলিত রীতিনীতি ও অনুশাসনের বাইরে নিজস্ব ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের চেষ্টা করতেন। তাদের নামায-রোজার সময় ও ধরন ছিল আলাদা। 'ধর্ম নিয়ে ভ্রান্তরীতি' প্রচার করায় পুরনো জেএমবির কিলিং স্কোয়াডের সদস্যরা ফারুক ও তার অনুসারীদের হত্যা করে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার সন্ধ্যায় জেএমবির জঙ্গি দলটি প্রথমে লুৎফোরের বাসায় ভক্ত সেজে ঢোকে। এরপর তার স্ত্রী ও পুত্রবধূকে পাশের কক্ষে আটকে রেখে ছয়জনকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত এখন পর্যন্ত ছয়জনের নাম পাওয়া গেছে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক কাজী গোলাম কবীর বলেন, ছয় খুনের ঘটনায় গত বছর জেএমবির কিলিং স্কোয়াডের সদস্য তরিকুল ও গাফফার নামে দু'জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে তরিকুল ছয় খুনের বিষয়ে অবগত ছিল জানিয়ে আদালতে জবানবন্দী দেয়। সে হত্যায় সরাসরি জড়িত জেএমবির আরও চার সদস্যের নাম জানায়। 

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তরিকুলের কাছ থেকে পাওয়া নামগুলো জঙ্গিদের ছদ্মনাম হতে পারে। ওই চারজন ছাড়া আরও কেউ হত্যায় জড়িত থাকতে পারে। জঙ্গিরা মূলত ছদ্মনাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নাশকতা চালানোয় তাদের শনাক্ত করতে সময় লাগে। তবে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া জেএমবির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও ওই চারজনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। 

ডিবির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্লু-বিহীন ওই ছয় খুন নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা শুরুর দিকে একেবারেই অন্ধকারে ছিলেন। তবে গত বছরের ৫ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও পীর খিজির হায়াত খান হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়েই মূলত ছয় খুন রহস্যের জট খুলতে শুরু করে। দুটি হত্যাকাণ্ড ও লুটপাটের ধরণ প্রায় একই ছিল। এতে খিজির খান হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার তরিকুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছয় খুনের বিষয়েও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পরে তাকে ছয় খুন মামলায় গ্রেফতার করে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গি গাফফারকে গ্রেফতার করা হয়। গত বছরের নবেম্বরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তরিকুল জানিয়েছিল, তাদের অন্য একটি গ্রুপের ওপর কথিত পীর লুৎফোরকে হত্যার নির্দেশ ছিল। সে তাদের নাম জানলেও ওই গ্রুপটিকে চেনে না। 

মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, শুরুর দিকে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আদৌ মামলার তদন্ত হচ্ছে কি-না বা কোন সংস্থা তদন্ত করছে তা তিনি জানেন না। দীর্ঘ তিন বছরে খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় পারিবারিকভাবে তারা এখনও আতঙ্কে থাকেন।

এই ছয় খুনের মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের মাতুব্বর তৎকালীন সময়ে জানিয়েছিলেন, তখন হত্যায় জড়িত সন্দেহে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে যা কিছু তথ্য পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী তদন্ত চলেছে।

আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ গোয়েন্দা পুলিশের দাবি অনুযায়ী, উগ্র মতবাদের লোকজন এই তিনজোড়া খুনের সাথে জড়িত। এ বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেলেও তদন্ত সূত্রের দাবি, খুনিরা কোনো টেকনিক্যালি ক্লু রাখেনি। তাই খুনিদের ধরতে বিলম্ব হচ্ছে। তাদের মতে, ‘খুনিদের ধরতে আমাদের এগুতে হচ্ছে ম্যানুয়ালি। কারণ, তারা এমন কোনো প্রমাণ রেখে যায়নি যা দিয়ে তাদের সনাক্ত করা যায়।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা আরো বলেন, কথিত পীর লুৎফর ১৯৯১ সাল থেকে এই (ভিন্ন মতবাদ) কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। তার আবাসস্থল ছিল যাত্রাবাড়ি, গেন্ডারিয়া এবং গোপীবাগে। বারবার বাসা পরিবর্তন করে এই এলাকাটুকুর ভেতরেই তার বসবাস ছিল। এ সময় তার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ হয়েছে, হামলা হয়েছে, মামলা হয়েছে। তিনি গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তখন কিছু লোক তাকে গ্রেফতারের জন্য বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিল। ঘটনার পরপর কয়েকজনকে আটক করেছিল সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। তাদের বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আটককৃত দুইজনকে আমিও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম। কিন্তু ‘দে আর নট ইনভলভ ইন দিস ম্যাটার’ (তারা এ ঘটনায় জড়িত নয়)।

ঘটনার দিন ২১ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় তারা বাসায় প্রবেশ করে লুৎফোরের সঙ্গে প্রথমে খোশ গল্প করে। পরে তারা মুড়ি খায়। এরপর তারা পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় ছয়জনকে গলাকেটে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, যে ছুরি দিয়ে খুনিরা ছয়জনকে হত্যা করেছে, ওই রক্তমাখা ছুরিটিও তারা নিয়ে গেছে। ঘটনার সময় বাড়ির কেয়ারটেকার মহাখালী এলাকায় ছিলেন। আর বাড়ির দারোয়ান খুনের ঘটনার সময় বাড়িটির নিচে বসা ছিলেন। একটি জনবহুল এলাকায় এত বড় নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে খুনিরা নির্বিঘেœ এলাকা ছেড়ে চলে গেলে তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়।

খুনের পর সাংবাদিকদের লুৎফরের স্ত্রী সালমা বেগম জানিয়েছিলেন, খুনিরা তাদের বাসায় একাধিকবার এসেছে। তারা বয়সে যুবক। তাদের নাম পরিচয় জানা নেই। তবে তাদের দেখলে তিনি চিনতে পারবেন বলে জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ