বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২০
Online Edition

৪৫ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪৪ শতাংশ

এইচ এম আকতার: স্বাধীনতার ৪৫ বছরে বেড়েছে অর্থনীতির পরিধি ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ৪৫ বছরে জিডিপির আকার বেড়েছে ৩৫ গুণ। শতকরা হারে তা বেড়েছে ১৪৪ শতাংশ। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে কৃষি,বনজ ও মৎস্য খাত। এগিয়ে রয়েছে শিল্প খাতও। অর্থনীতির এ গতিধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালে উন্নত দেশের সারিতে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

জানা গেছে, কৃষি ও বনজ খাতে ২০১০-১১ অর্থ বছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশে। ২০১১-১২ অর্থ বছরে আরও কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৪১ শতাংশে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৮১ শতাংশে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ০৭শতাংশ।

একইভাবে শস্য ও শাকসবজি খাতে গত পাঁচ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২০১০-১১ অর্থ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ,২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ,২০১২-১৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ। একাইভাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৩০ শতাংশ।

মৎস্য খাতে এ পাঁচ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল লক্ষ্য করার মত। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ,২০১১-১২ বছরে ছিল ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। একইভাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এখাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ।

একইভাবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে বেশি। গত পাঁচ বছর এখাতে প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ১০ শতাংশের বেশি। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ০১ শতাংশ, ২০১১-১২ বছরে ছিল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ। একইভাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এখাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে একই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, বৃহৎ মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে।

কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও সরকারের সহায়তা ছিল খুবই কম। একইভাবে মৎস্য খাতেও সরকারের বিনিয়োগ ছিল খুবই কম। কৃষির এ দু খাতেই ব্যক্তির উদ্যোগে প্রবৃদ্ধি এগিয়ে চলছে। এ দুখাতে সরকার যথাযথ সহায়তা পেলে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ছে। যা দেশকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। 

মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম বৃহৎ অর্থনীতি। চলতি মূল্যে এ অবস্থান ৪৫তম। অথচ ১৯৭২ সালে এ অবস্থা ধারণার মধ্যেই ছিল না। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে কেমন হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর কত কাছে থাকবে বাংলাদেশ, কতটা এগোবে বাংলাদেশ এ নিয়ে সে সময় পূর্বাভাস ছিল অকল্পনীয়।

যদিও সে অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ৪৫ বছরে জিডিপির আকার ৩৫ গুণ বড় হয়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অর্থনীতির এ অর্জনকে বিস্ময়কর বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ বা ’৭৩ সালে কল্পনাই করা যেত না ৪৫ বছর পর বাংলাদেশ কোথায় থাকবে। নানা ধরনের আশঙ্কাও করা হয়েছিল সে সময়। তবে সব ধরনের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে আজকের অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশ। এখন সাফল্যের বিভিন্ন ধরনের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশকে তুলনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কোনো ধরনের অবকাঠামো ছিল না। বড় কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শিক্ষার হার ছিল অনেক কম। দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় শতভাগ। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অবশ্যই অনেক চ্যালেঞ্জের। আর সেটা খুব ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ।

বহুজাতিক এ দাতা সংস্থাটির তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর প্রথম তিন বছর বাংলাদেশের জিডিপির আকার মোটামুটি দ্রত বাড়ে। মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিনিয়োগ করায় এটি অর্জন সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪৪৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর দুই বছর তা কমে ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ১৯৭৮ সাল থেকে আবার জিডিপির আকার বাড়তে শুরু করে। ১৯৮১ সালে তা ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৮২ ও ’৮৩ সালে আবার জিডিপির আকার হ্রাস পায়। এরপর থেকে নিয়মিতই বাড়ছে জিডিপি। তবে গতি ছিল কিছুটা মন্থর। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০০০ সালে এর আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।

২০০২ সালের পর থেকে জিডিপির আকার দ্রত বাড়তে শুরু করে। সে বছর এর পরিমাণ ছিল ৫৪ দশমিক ৭২৪ বিলিয়ন ডলার। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ দশমিক ৮১৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০০৯ সালে জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। আর মাত্র সাত বছরের মধ্যে তা দ্বিগুণের বেশি বাড়ে। ২০১৬ সালে জিডিপির আকার ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থানের পেছনে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। প্রথমটি ছিল কৃষিতে সবুজ বিপ্লব। দ্বিতীয়টি নীরব শিল্প বিপ্লব। পাশাপাশি শিল্পকে সহায়তা করতে সেবা খাতও প্রসারিত হয়েছে।

কৃষির সাফল্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কৃষি ছিল মূলত প্রকৃতিনির্ভর। শুষ্ক মওসুমে কোনো ফসল হতো না। অনাবৃষ্টিতে কোনো কোনো বছর দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও জেগে বসতো। এখন দেশের প্রায় সব জমি তিন ফসলিতে রূপান্তরিত হয়েছে। শুষ্ক মওসুমেও ফসল ফলছে। প্রতি বছর আবাদি জমি হ্রাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরও চালে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, ১৯৭২ সালে যা ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।

বাংলাদেশের শিল্প খাতের সাফল্যকে ব্রিটেনের প্রথম শিল্প বিপ্লবের সাফল্যের চেয়েও বড় বলে মনে করে ড. জাহিদ হোসেন। এর কারণ ব্যাখ্যায় দুই দেশের জিডিপিতে শিল্পের অবদান তুলনা করে তিনি বলেন, ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ সালে ব্রিটেনে প্রথম শিল্প বিপ্লব হয়। ওই সময় অর্থাৎ ৮০ বছরে দেশটিতে শিল্প খাতের অবদান বেড়েছিল ১১ শতাংশ। এর মধ্যে ১৭৬০ সালে ব্রিটেনের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২০ শতাংশ। ১৮৪০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ শতাংশে। আর ৪৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশ। এটা অবশ্যই শিল্প বিপ্লব।

অর্থনীতির এ গতিকে আরও উপরে তুলে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ। তবে এ পথে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বাধীনতার ৭০ বছরের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে দুটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, ৮-১০ শতাংশ হারে ১৫-২০ বছর প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির সুফলকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে বলে মনে করেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ