বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২০
Online Edition

কাল নাসিক নির্বাচন

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : আগামীকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচন। এরই মধ্যে প্রচারণা শেষ হয়েছে। ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে বাড়ছে নির্বাচনী আমেজ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও মেয়র প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সহিংশতার কোন আশঙ্কা না থাকলে কাউন্সিলর প্রার্থীসহ তাদের সমর্থকদের মধ্যে বড় ধরনের সহিংশতার আশঙ্কা। নাসিক নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীর বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসী ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা রয়েছে। বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জ ও সদরে কয়েকটি ওয়ার্ডের বিএনপি প্রার্থীসহ সাধারণ প্রার্থীর মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। তারা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে। ইতিপূর্বে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ঘটেছে বিচ্ছিন্ন মারামারির ঘটনা। ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার প্রত্যাশা করলেও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের সংশয়। তবে নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার নুরুজ্জামান তালুকদার বলেছেন, যেখানে সহিংশতা ঘটবে সেখানে ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে কোন ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। 

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের পছন্দকৃত বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছে। তাদেরকে নির্বাচিত করতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের এমপি শামীম ওসমানের কঠোর নির্দেশ রয়েছে। আর তার পছন্দকৃত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে শামীম ওসমান কেন্দ্রীয় আওয়া লীগের নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করলেও সারা পায়নি। তার পরও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর জন্য শামীম ওসমানপন্থি নেতারা তেমন কোন ভূমিকা না রাখলেও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে এলাকায় মহড়াসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ সরকারি দলের ক্যাডাররা। 

এদিকে অভিযোগ উঠেছে নির্বাচনে সরকারি দলের প্রভাব খাটাতে পারে এবং ভোট কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ সমর্থকদের উপর হানা দিতে পারে এমন কাউন্সিলর প্রার্থীরা হলো ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হাজী আব্দুর রহিম মিয়া, ৩ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী শাহ জালাল বাদল, ৪ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী আরিফুল হক হাসান, ৬ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী মতিউর রহমান মতি, ৭ নং ওয়ার্ড প্রার্থী আলী হোসেন আলা, ১০ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী ইফতেখার আলম খোকন, ১৩ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী রবিউল হোসেন, ১৪ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী শফিউদ্দিন প্রধান, ১৬ নং ওয়ার্ডের নাজমুল আলম সজল, ১৭ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী আব্দুল করিম বাবু, ১৮ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী কামরুল হাসান মুন্না, ২০ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী শাহেন শাহ আলম, গোলাম নবী মুরাদ, ২১ নং ওয়ার্ডের হান্নান সরকার অন্যতম। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ সরকারি দলের প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তারা নির্বাচনে বিজয়ী হতে সব ধরনের পদক্ষেপসহ সহিংশতা ঘটনা ঘটাতে পারে বলে সাধারণ ভোটাররা এমন আশঙ্কা করছেন। 

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৭ টি ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৫৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ জন এবং নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯ জন।

গুলী করার নির্দেশ : নাসিক নির্বাচনী মালামাল রক্ষা ও নির্বাচনে পরিবেশ সুষ্ঠুতার রক্ষার্থে গুলী করার জন্য আপোস না করার জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জেন ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। গতকাল ফতুল্লার মাসদাইরস্থ নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনসে নাসিক নির্বাচন নিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি এমন নির্দেশ দেন। তিনি বলেছেন, নাসিক নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুতার লক্ষ্যে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ভোট কেন্দ্রে কোন ধরনের সহিংশতার চেষ্টা করা হলে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা যেন গুলী করতে কোন ধরনের আপোষ না করে । আর যদি আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের গাফলতির অভিযোগ পাওয়া যায় তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন সু-শৃংখলভাবে ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন আইনশৃংখলা বাহিনী সর্বদা সতর্ক থাকার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে এবং কেন্দ্রের আশেপাশে কেউ যেন বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য আইনশৃংখলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। 

প্রচার প্রচারণা শেষ : গতকাল রাত বারটার পরই প্রচার-প্রচরণা শেষ হয়েছে । নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট আর প্রার্থীদের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় মশগুল নগরবাসী। ভোটের মাত্র একদিন বাকী থাকলেও সর্বত্রই চলছে ভোটের আমেজ। বিজয়ী হবেন কে আইভী না সাখাওয়াত। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সব জায়গায় চলে নৌকা আর ধানের শীষের প্রার্থী নিয়ে আলোচনা। তাদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে প্রার্থীদের দেয়া নানা প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর দেয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এদিকে নির্বাচনে আইনশৃংখলা বাহিনী কঠোর সতর্কাবস্থায় রয়েছেন। ২৭ টি ওয়ার্ডে ২৭ জন ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে একাধিক র‌্যাব, পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে টহল দিচ্ছে। আর ভোটারদের উৎসাহিত করছেন। 

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নগর উন্নয়নে ২১টি পরিকল্পনাসহ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে বিগত দিনে যে ধরনের উন্নয়ন কার্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জনগণকে আস্থা রাখতে বলেছেন তিনি। অন্যদিকে নাসিক নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান হোল্ডিং টেক্স কমানোসহ নগরবাসীর উন্নয়নে নির্বাচনী ইশতেহারে ২৫টি উন্নয়ন পরিকল্পনায় নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সব ধর্মের লোকদের সমন্বয়ে উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠন, শীতলক্ষ্যা সেতু বাস্তবায়ন, যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস নির্মাণ, আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, শিক্ষা বৃত্তি চালু, পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ৩৬ দিন নাসিকের পরিবেশ ভাল ছিল। আগামী দুই দিন গত ৩৬ দিনের তুলনায় আরো পরিবেশ ভাল হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কোন ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। নিরপাত্তায় পুলিশের ৪ হাজার সদস্য, র‌্যাবের ২৬শ, আনসারের ৩ হাজার ও বিজিবির ২২ প্লাটুনসহ আইনশৃঙ্খলা বহিনীর প্রায় সাড়ে ৯ হাজার সদস্য মাঠে রয়েছে । এছাড়া র‌্যাবের ৩১ টি মোবাইল টীম, ২৭ টি ওয়ার্ডে ২৭ জন ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে টহল দিচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে একাধিট মোবাইল টিম কাজ করছে। প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। 

নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১ এর কমান্ডিং অফিসার এএসপি আলেপউদ্দিন জানান, নাসিকের ৩ টি থানা এলাকায় ৩ টি ভাগে ভাগ করে ২৭ টি ওয়ার্ডে শতাধিক টিম কাজ করছে। একই সাথে সাদা পোশাকে প্রতিটি কেন্দ্রে আগাম নিরাপত্তা কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। সোমবার সকাল থেকেই প্রতিটি কেন্দ্রে র‌্যাবের টহল চলছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়াও চিহ্নিত তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার করা হবে। বহিরাগতরা র‌্যাবের নজরদারিতে রয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ