বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২০
Online Edition

নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু নির্বাচন ‘অরণ্য রোদনে’ পরিণত হওয়ার আশংকা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: সরকার ও ইসির পক্ষ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার ইঙ্গিত ক্রমশ: দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, সরকারি দলের নেতারা নৌকার প্রার্থীই বিজয়ী হবে বলে আগেই নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। একইসাথে কাল বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণের দিন সকালেই কেন্দ্র দখলের পরোক্ষ ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী বলেছেন, ভোটগ্রহণের দিন সকাল ৮টার আগেই বিএনপি প্রার্থী নির্বাচন থেকে বসে পড়বেন। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, নাসিক নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে তিন শতাধিক দলীয় ক্যাডারকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার দেখে বিরোধী নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচেছ। স্থানীয় প্রশাসনের জ্ঞাতসারেই অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রস্তুতি চলছে। যার কারণে ভোটকে কেন্দ্র করে জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, আগের নির্বাচনগুলোর ন্যায় নাসিক নির্বাচনেও জোরপূর্বক ভোটকেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, ব্যালট ছিনতাই ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাসিক নির্বাচনের প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতিতেও। যদি এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হয় তাহলে ইসি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির চলমান সংলাপ আয়োজনও প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। এতে করে দেশের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির ইমেজ ক্ষুণœ হতে পারে। 

সূত্র মতে, দেশের সব ক’টি স্থানীয় নির্বাচনের আগে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কেন্দ্র দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা হবার তাই হয়েছে। ভোট শুরু হবার আগেই কেন্দ্র দখলে নিয়েছে সরকারি দল। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে একই কাজ করেছে ক্ষমতাসীনরা। রাজধানীতে হাজার হাজার মিডিয়া কর্মীর উপস্থিতিতে কেন্দ্র দখলে নিয়েছে আ’লীগ। প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হয়নি। অনেকটা ঘোষণা দিয়েই ভোট ডাকাতির মহোৎসব চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জেও তার ব্যতিক্রম হবেনা। ভোটের দিন সকালেই আগের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটানো হবে। 

অভিযোগে প্রকাশ, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন এখনো সবার জন্য লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরী করতে পারেনি। অভিযোগের পর তারা শুধু ‘তদন্ত’ করা হচ্ছে বলে পার পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যাতে প্রচারণা চালাতে না পারেন সেজন্য ৭২ ঘণ্টা আগেই প্রচারণার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যদিও আগে সেটি ছিল ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকেই। স্থানীয়রা বলছেন, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতাদের উপস্থিতি নাসিক নির্বাচনের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চারদিকে ধানের শীষের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এটা যেন নির্বাচনের আগে ভাটা পড়ে সে জন্য সরকার ৭২ ঘণ্টা আগেই বহিরাগতদের প্রচারণা নিষিদ্ধ করেছে। 

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে কালো টাকার বিস্তার ও প্রভাব খাটানো নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রার্থীরা। বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মানুষের মধ্যে একটা শঙ্কা দেখেছি, তাদের যেন প্রভাব বিস্তার করা না হয়। ভোটারদের যাতে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধার সৃষ্টি করা না হয়। তাদেরকে যাতে কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা না হয়, তারা যাতে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে সেটা নিশ্চিত করা হয়। এখনও পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয়নি অভিযোগ করে সাখাওয়াত বলেন, আমাদের কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজা হচ্ছে, ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমরা কয়েকটি অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি। সরকারি কর্মকর্তা, আনসার সদস্য এবং পর্যবেক্ষণের নামে কেউ যেন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে বিষয়ে কমিশনকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির প্রার্থী।

 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাসিক নির্বাচনে বিএনপি দলীয় সিটি মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকেই গ্রেফতার আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। মিথ্যা মামলা থাকায় অনেকেই ঠিকমত প্রচারণাও চালাতে পারেনি। শুধু তাই নয়, ২০ দল সমর্থিত প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাসায় বাসায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ নানাভাবে তাদের হয়রানি করছে। এর বিপরীতে সরকারি দলের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীরা নির্বিঘেœ প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর আনুকূল্যও লাভ করছেন। জানা গেছে, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা থাকায় বিএনপি সমর্থিত বেশিরভাগ নেতাকর্মী প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে পারছেন না। পাশাপাশি সরকারদলীয় ক্যাডাররাও ভয়-ভীতি সৃষ্টি করে প্রচারকার্যে বিঘœ ঘটাচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের থাকলেও বিষয়টি অরণ্য রোদনে পর্যবসিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন মুখে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছেনা। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিরোধী দলের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের বিমাতাসুলভ আচরণ অব্যাহত থাকলে নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কিনা, যে-কারও মনে এ সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে। 

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামীকাল বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে শেষ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন নিয়ে সবার মাঝে একটি উৎসবের আমেজ থাকলেও সরকারি দলের আচরণে ক্রমশ: তাতে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। সরকারি দলের লাগামহীন আচরণে বিধি লংঘনের ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশনের নিরবতা অনেকের মাঝে শংকার পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনিয়ম ও আইনভঙ্গের ঘটনা ব্যাপক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপির একাধিক নেতা জানান, অতীতের সব ক’টি স্থানীয় নির্বাচনে সরকারি দল আ’লীগ আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব চালিয়েছে। কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। এবারো তার ব্যতিক্রম হবেনা। সরকার যতই মুখে গণতন্ত্র আর সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলুক না কেন, তাদের নেতাদের আগাম ঘোষণা ফলফল যে নৌকার পক্ষে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সরকারি দল আ’লীগ নেতারা যেভাকে প্রকাশ্যে বক্তব্যের মাধ্যমে অনিয়ম ও হীনপন্থা অবলম্বন করছে তাতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় বাড়ছে। নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ‘ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হয়নি। তারা নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের আশা, সাম্প্রতিককালের পৌরসভা নির্বাচন অথবা চলতি বছরের তিন সিটি নির্বাচনের ন্যায় অভিযোগ যাতে উঠতে না পারে, সেজন্য কমিশন শতভাগ নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার পরিচয় দেবে। এটি সম্ভব না হলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি যে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন সেটি সমালোচনার মুখে পড়বে। 

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি ‘পরীক্ষা’ হলেও সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য তা ‘অগ্নিপরীক্ষা’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। এই সিটি নির্বাচনের ভোট সুষ্ঠু না হলে নারায়ণগঞ্জ থেকে ফের সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরুরও হুমকি দেন তিনি। সাবেক এ আইনমন্ত্রী বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আমাদের জন্য যেমন একটি পরীক্ষা, তেমনি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা দেখার জন্য দেশ-বিদেশের সব মানুষ এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে এই নারায়ণগঞ্জ থেকেই সেই আন্দোলনের সূচনা আবার হবে। মওদুদ অভিযোগ করে বলেন, অতীতের সব নির্বাচনে দেখেছি নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত সরকারের নেতারা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করার আশ্বাস দেন। তবে নির্বাচনের আগের দিন রাতে ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং অর্থ বিলিয়ে নানা রকমের অনিয়মের মাধ্যমে জোর করে নির্বাচনে জয় লাভের চেষ্টা করে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব ও নাসিক নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, ২২ ডিসেম্বরের নাসিক নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য অগ্নিপরীক্ষার সামিল। এই নির্বাচনেও যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে সরকারের ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না এবং সেই অবস্থায় দেশে নির্বাচনকেন্দ্রীক রাজনৈতিক সংকট আরো প্রকট হবে। তিনি বলেন, প্রার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী ভোটারদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নাসিক নির্বাচনে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসাবে সেনা মোতায়েন করা উচিত। কারণ সেনা মোতায়েন ছাড়া অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ