শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

পরিস্থিতি দ্রুত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পুতিন-এরদোগানের ফোনালাপ

৯ ডিসেম্বর, রয়টার্স/বিবিসি/আল জাজিরা : সিরিয়ার আলেপ্পোর পরিস্থিতি নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোগান।
শহরটির বাসিন্দাদের সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে গত রোববারের এই ফোনালাপ হয় বলে এরদোগানের কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে।
ফোনালাপে এরদোগান ও পুতিন, মানবিক সহায়তার উদ্যোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সিরিয়া সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান অর্জনের ব্যাপারে জোর দেন।
কাজাখস্তানে সিরীয় সরকার ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারেও তারা পুনর্বার আলোচনা করেন বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত রোববার সকালে সিরিয়ার আলেপ্পোর ইদলিব শহরের কাছাকাছি পাঁচটি বাস পুড়িয়ে দেয় বন্দুকধারীরা। এসব বাস সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত কিন্তু বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ ফোয়াহ ও কেফ্রাইয়া নামের দুটি শিয়া প্রধান গ্রামের মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছিল।
সরকার পক্ষ ও বিদ্রোহীদের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার এই কার্যক্রম শুরু হয়।
ইদলিবে বাস পোড়ানোর ঘটনার জেরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রোববার রাত থেকে  পূর্ব আলেপ্পোর বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অংশ থেকে অবরুদ্ধ মানুষদের সরিয়ে নেওয়া ফের শুরু হয়েছে।
আলেপ্পো সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সর্বশেষ ঘাঁটি বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সিরিয়ার সরকারি বাহিনী পূর্ব আলেপ্পোর বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অধিকাংশ এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।
তবে শহরটির ওই অংশের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অংশ এখনও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে। মূলত বিদ্রোহীরা সেখানে আটকা পড়ে গেছে।
সরকারি পক্ষের ব্যাপক বোমাবর্ষণে এসব এলাকার বেসামরিক মানুষেরা আশ্রয় হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন।
খাবার ও চিকিৎসা বঞ্চিত এসব মানুষ ও অস্ত্র ত্যাগের মাধ্যমে বিদ্রোহী যোদ্ধারা ওই এলাকা ত্যাগ করতে পারবে বলে সরকার পক্ষ ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সমঝোতা হয়।
এদিকে সিরিয়ার আলেপ্পোর সর্বশেষ বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে গতকাল সোমবার নতুন করে ১ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে তারা পূর্ব আলেপ্পো থেকে পশ্চিম আলেপ্পোতে পৌঁছেছেন। আর এ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আলেপ্পো থেকে সরিয়ে নেওয়া মানুষের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। অবরুদ্ধদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা খবরটি নিশ্চিত করেছে। 
গত মঙ্গলবার আলেপ্পোতে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা আসে। যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠা ওই শহর ছেড়ে সবাইকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে চুক্তির কথা জানায় সরকার ও বিদ্রোহীরা। একদিনের মাথায় বুধবার আলেপ্পোবাসীর স্বপ্নকে স্বপ্নভঙ্গে পরিণত করে যুদ্ধবাজরা। ভেঙে পড়ে অস্ত্রবিরতি চুক্তি। দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হয়। আলেপ্পো ছেড়ে যেতে সক্ষম হন প্রায় ছয় হাজার বেসামরিক মানুষ। সক্ষম হন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরাও। একদিনের মাথায় শুক্রবার ওই চুক্তিটিও ভেঙে পড়ে। আলেপ্পো নগরী থেকে বেসামরিক নাগরিক ও বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করে সিরীয় সরকার। শনিবার তৃতীয় দফায় কার্যকর হয় অস্ত্রবিরতি। এদিন সিরীয় সরকার এবং বিদ্রোহীরা জানায়, নতুন করে অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয়েছে। শিগগিরই আবারও লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হবে।
বেশ কয়েক ঘণ্টা বিলম্বিত হওয়ার পর অবশেষে রবিবার মধ্যরাত থেকে আবারও লোকজনকে সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু হয়। গত রোববার মধ্যরাতের দিকে প্রথম দফায় পাঁচটি বাসে করে সাড়ে তিনশ মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর গতকাল সোমবার সকালে নারী ও শিশুসহ প্রায় ১২০০ মানুষ পশ্চিম আলেপ্পোতে পৌঁছায় বলে নিশ্চিত করেছেন অবরুদ্ধদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক আহমদ দাবিস। 
এদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, ইদলিব প্রদেশে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দুটি গ্রামে আটকা পড়াদের মধ্য থেকে ৫০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১০টি বাসে করে তাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সিরিয়ান অবজারভেটরি জানিয়েছে, রোগী, এতিম এবং বিভিন্ন পরিবারসহ প্রায় ৪ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হতে পারে। সিরিয়ান অবজারভেটরি অব হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে,রবিবার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আটকা পড়া মানুষদের নিয়ে আসার জন্য পাঠানো কয়েকটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। অন্তত পাঁচটি বাসে আগুন দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে সংগঠনটি।
ধারণা করা হচ্ছে, আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গি সংগঠন জাবাথ ফাতাহ আল-শাম এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। আসাদ বাহিনীর পক্ষে লড়াই করা লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, জাবাথ ফাতাহ আল-শাম এবং চুক্তির পক্ষে থাকা অপর একটি ইসলামি সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে আল-শাম জঙ্গিরা বাসে আগুন লাগিয়ে দেয়। মার্কিন সমর্থিত অপর বিদ্রোহী সংগঠন ফ্রি সিরিয়ান আর্মি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জানান, বাসে আগুন দেওয়ার পর আটকা পড়াদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম বেশ কিছুক্ষণ থমকে থাকে। পরে দু’পক্ষের সমঝোতায় আবারও আটকা পড়া মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়।
শহর পেরিয়ে অন্যত্র যাওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত বাসগুলোর জন্য এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন অবরুদ্ধ আলেপ্পোবাসী। অপেক্ষার এই অজানা ব্যাপ্তিই তাদের মনে শঙ্কা তৈরি করছে। এই সিরীয়দের মনে এখন প্রশ্ন, তারা পেরোতে পারবেন তো এই মৃত্যুপুরী? নাকি তার আগেই মৃত্যুর বার্তা নিয়ে হাজির হবে অস্ত্রবিরতি ভেস্তে যাওয়ার খবর? আবারও বিস্ফোরণে কেঁপে উঠবে নাতো আলেপ্পো?
এদিকে, সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত আলেপ্পো নগরীতে পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর বিষয়ে ভোটাভুটি করার কথা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৯টায় এ ভোটাভুটি হওয়ার কথা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ