বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভূমিকম্প : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

আখতার হামিদ খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
যেসব বিল্ডিং অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়েছে সেগুলোকে ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর আর্থকুয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানুয়েল অনুসারে ভূমিকম্প প্রতিরোধী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
যেসব বিল্ডিং ভূমিকম্পের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয় সেগুলোকে একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে স্ট্রাকচারাল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি এগুলো সঠিক ভূমিকম্পরোধক পরিকল্পনামাফিক তৈরি না-হয়ে থাকে তাহলে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
এরকম বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং এর উদাহরণ নিচে দেয়া হল-
* পুরোনা URM ভবন, ফাটলবিশিষ্ট দেওয়াল এবং কাঠের বিমের উপর ছাদ
* ৫ ইঞ্চি বিশিষ্ট দেওয়ালের URM ভবন
* অনিয়মিত লিনটেল বিশিষ্ট বহুতল URM ভবন
* যেসব RCF বহুতল ভবনের নীচতলায় খোলা পার্কিং ব্যবস্থা আছে
* যেসব বহুতল ভবনে বড়/ ভারী ক্যানটিলিভার আছে
* অনিয়মিত আকৃতির বহুতল ভবন
* ভর ও কাঠিন্যের অসম বণ্টন বিশিষ্ট ভবন
* ফ্ল্যাট প্লেট/ ফ্ল্যাট স্লাব বিশিষ্ট ভবন
* সরু উঁচু ভবন
* যে সব ভবনের ছাদে সুইমিংপুল আছে
* যেসব ভবন ভরাট করা অপেক্ষাকৃত নরম মাটির ওপর অবস্থিত
যখন ভূমিকম্প ঘটে : ভূমিকম্পের সময় দেয়ালের প্লাস্টার খসে, দেয়াল পড়ে, ছাদ কিংবা ভারী নানা রকম জিনিস পড়ে মানুষ আহত কিংবা নিহত হতে পারে। বিল্ডিং ধসে পড়ার জন্য এবং ব্যাপক ঝাঁকুনীর ফলে সর্ট-সার্কিট থেকে আগুন ধরে যেতে পারে। তাছাড়া গ্যাস, স্টোভ ইত্যাদি থেকেও আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে সৃষ্টি হয় ভয়ংকর আতঙ্ক ও উদ্বেগ।
ঘরের ভিতর অবস্থান করলে-এ সময় থাকতে হবে শান্ত। নীচতলায় থাকলে অতি দ্রুত (৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে) খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসতে হবে। এমন জায়গায় দাঁড়াতে হবে যেখানে কোনো বিল্ডিং কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটি না থাকে। সাধারণত ভূমিকম্প ১ মিনিটের কম সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই যদি বেরিয়ে আসার সুযোগ-না থাকে তাহলে ঘরের ভিতর এমন জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে যেখানে অপেক্ষাকৃত শক্ত কলাম আছে অথবা ছোট ঘর যেখানে দুদিকের দেয়াল কাছাকাছি আছে। বারান্দা, বেলকনি, বাহিরের দেয়াল, দরজা, জানালা ইত্যাদি থেকে দূরে অবস্থান নিতে হবে। পারলে কোনো শক্ত টেবিলের নীচে অবস্থান নিলে উপর থেকে কিছু পড়ে আহত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আলমারি, আয়না, কাচের জানালা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে। ভাঙা কোনো কিছুর দিকে যাওয়া ঠিক হবে না।
ঘরের বাইরে অবস্থান করলে : নিকটস্থ খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে। উঁচু চিমনি, ঘরবাড়ি, বেলকনি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকেও দূরে থাকতে হবে কারণ এগুলো শরীরের উপর পড়তে পারে।
ভূমিকম্পের পরবর্তী সময়ে : টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি বন্ধ রাখতে হবে। গ্যাস বন্ধ রাখতে হবে। মোবাইল ফোন, ব্যাটারিচালিত একটা রেডিও কাছে রাখলে ভালো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভিড় জমানো ঠিক নয়। জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য রাস্তাঘাট ফাঁকা রাখা দরকার। এ সময় পানি অপচয় করা উচিত নয়। আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে, তাছাড়া মুমূর্ষু ব্যক্তিদের জন্য ডাক্তার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, এবং অসুস্থ মানুষের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তাছাড়া ভূমিকম্পোত্তর পরিস্থিতিতে আরো ভূ-কম্পন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে।
শেষ কথা : অর্থনীতি তথা সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ভূমিকম্প একটা মারাত্মক হুমকি। কারণ এ সময় হাজার হাজার ঘর-বাড়ি ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়; জীবনহানি ঘটে অগণিত মানুষের। তাই ভূমিকম্প-ঝুঁকির বিষয়টাকে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নিরূপণ করতে হবে। পরে যতদূর সম্ভব এটা থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে হবে।
তাই কালক্ষেপণ না করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের জন্য ব্যাপক ও সুষ্ঠু ভূমিকম্প দুুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এবং তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের পথে এগোতে হবে। ভূমিকম্প প্রকৌশল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের উপরে জোর দেয়া দরকার, যার মাধ্যমে এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য দক্ষ কারিগরি সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা/ প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিল্ডিং কোড নবায়ন ও উন্নয়ন করতে হবে। দক্ষ পেশাজীবীদের সাথে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আর এই ধরনের কর্মকান্ডের সফলতা নির্ভর করছে কারিগরি ও রাজনৈতিক সমাধানের উপর যা সত্যিকার অর্থে অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি এড়াতে ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। বিভিন্ন সরকারি, বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, একাডেমিক ইনস্টিটিউট, কম্যুনিটি লিডারশিপ এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে যার মাধ্যমে আমাদের সর্বোচ্চ কাক্সিক্ষত ফলাফর অর্জন সম্ভব হয়।
প্রধান প্রধান শহরের ভূমিকম্পের ঝুঁকি : ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটিতে অনুভূত ভূমিকম্প বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের শহর ও গ্রামগুলোর “ভূমিকম্প প্রতিরোধহীনতার” দুর্বলতা তুলে ধরেছে। ১৮৯৭ সালে ৮.০ মাত্রার ভূমিকম্প ভারতের (বাংলাদেশসহ) উত্তরপূর্ব অঞ্চলের দালানকোঠার বিপুল ক্ষতি সাধন করে, এতে প্রাণ হারায় ১৫৪২ জন মানুষ। সম্প্রতি বিলহাম প্রমুখ (২০০১) হিমালয় অঞ্চলে এই এলাকায় শক্তি সঞ্চয় এবং ঐতিহাসিক ভূমিকম্প সংঘটনের ভিত্তিতে এখানে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার বিরাট আশঙ্কার কথা বলেছেন। বর্তমানে এই অঞ্চলের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ১৮৯৭ সালের তুলনায় অন্তত ৫০গুণ। ঢাকা, কাঠমাণ্ডু, গৌহাটির মতো শহরগুলোর জনসংখ্যা কয়েক গুণ হবে বলে আশংকা করা হয়। ইউনাইটেড নেশনস আইএনডিআর-রেডিয়াস ইনিশিয়েটিভ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা ও তেহরান সর্বোচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকি-প্রবণ শহর বলে শনাক্ত হয়েছে (কারডোনা প্রমুখ, ১৯৯৯)। ব্যাপক ভূমিকম্প সংঘটিত হলে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোয় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের বিনাশস ঘটতে পারে। বর্তমান গবেষণাকালে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহরের ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয় পর্যালোচনা করা হয় ও মাটির উপাত্ত ও ভূতত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষুদ্র এলাকাভিত্তিক মানচিত্র গঠন করা হয়। জিআইএসভিত্তিক এইসব মানচিত্র প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, সরকারি কর্মকর্তা ও কোনও বিশেষ এলাকার ভূমিকম্পজনিত সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ভাবিত ব্যক্তিবিশেষের কাজে উপযোগী।
ভূমিকম্পের ক্ষতি : ঐতিহাসিক ক্ষতি : সারণি- ১
মাত্রা, প্রাবল্য ও মূলকেন্দ্র থেকে দূরত্বসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক ভূমিকম্প তুলে ধরেছে।
মাত্রা, প্রাবল্য ও মূলকেন্দ্র থেকে দূরত্বসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক ভূমিকম্প
সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি : সারণি- ২
মাত্রা, ফোকাল গভীরতা ও মূলকেন্দ্রের সর্বোচ্চ প্রাবল্যসহ কয়েকটি সাম্প্রতিক ভূমিকম্প দেখাচ্ছে।
মাত্রা, ফোকাল গভীরতা ও মূলকেন্দ্রে সর্বোচ্চ প্রাবল্যসহ কয়েকটি প্রধান ভূমিকম্প
ভূমিকম্পের বিপর্যয় : আনসারি ও শরফুদ্দীন (২০০২) এর মতে বাংলাদেশের ৪২টি এলাকায় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির অনুমান করার ক্ষেত্রে দুগ্গাল প্রস্তাবিত পলিমাটির ক্ষয়বিধি প্রয়োগ করা হয়েছে। কোনও নির্দিষ্ট এলাকায ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয়ের বিবর্তন কেবল সেই বিশেষ এলাকায় (২০০ কিমি ব্যাসার্ধ) ভূমিকম্পের সংখ্যা ১০-এর বেশি ও তল-তরঙ্গ মাত্রা ৪.০ এর সমান বা বেশি হলেই সংঘটিত হয়ে থাকে। ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতির মানচিত্রসমূহ ৫০, ১০০, ২০০ বছরের প্রত্যাবর্তন কাল এবং ৫০ বছরের জীবনকালে ১০% বৃদ্ধির সম্ভাবনার ভিত্তিতে আনুভূমিক পিক গ্রাউন্ড অ্যাক্সালেরাশন (পিজিএ) কনটোর ম্যাপ-এ তুলে ধরা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে একটি নতুন জোনিং ম্যাপ প্রস্তাব করা হয়েছে।
নূর প্রমুখ (২০০৫) অনুযায়ী সাতটি এলাকা উৎস নিয়ে বাংলাদেশের জন্যে ০.৩ ডিগ্রি গ্রিড বিরতিসহ বিভিন্ন অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের বিপর্যয় লেখচিত্র গঠন করা হয়েছে। বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে ভূমিকম্পের উৎসস্থল শনাক্ত করার জন্যে সমান বা বৃহত্তর মাত্রার ভূমিকম্পকে বিবেচনা করা হয়েছে। সমান সম্ভাবনা প্রত্যেকটি অঞ্চলে প্রয়োগ করা হয়েছে এই বিবেচনায় যে কোনও উৎস এলাকার যেকোনও অবস্থানে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সমান সম্ভাবনা রয়েছে। উৎসসমূহকে উপাদানের সীমাবদ্ধ সংখ্যায় ভাগ করা হয়েছে।
ক্ষয়বিধি ও জোরালো গতিত্বরণ লেখচিত্র :
বিপর্যয় বিশ্লেষণের জন্যে প্রাবল্য ও পিজিএ মূল্যভিত্তিক আঞ্চলিক ক্ষয়বিধি আবশ্যক। সাবরি (২০০২) বাংলাদেশ ও আশপাশের এলাকার জন্যে ২৫টি ভূমিকম্প ও ৯৩ জোড়া উপাত্তভিত্তিক প্রাবল্যভিত্তিক ক্ষয়বিধির প্রস্তাব করেছেন (সমীকরণ- ১)।
I = ৬.৭০২ + ১.২৫৪ (Ms)- ০.০০১৪ (R)- ৩.৯৬৬ (logR) +/- ০.৯২P
যেখানে জ কিমি-তে হাইপোসেন্ট্রল দূরত্ব, Ms তলতরঙ্গ মাত্রা এবং I হচ্ছে প্রাবল্য। ২০০৩ সাল পর্যন্ত ভূমিকম্প পরিমাপের জন্যে বাংলাদেশের কোনও স্ট্রং মোশন অ্যাক্সোলেরোগ্রাফ বা অ্যাক্সালেরোমিটার ছিল না। যমুনা বহুমুখি সেতু কর্তৃপক্ষ (জেএমবিএ) দেশে প্রথমবারের মতো সাতটি ফিল্ড সাইট ও সেতুপৃষ্ঠে অ্যাক্সালেরোমিটার স্থাপন করে। বুয়েটও বর্তমান লেখকের নেতৃত্বে ২০০৬ সালে সারা দেশে পিডব্লুডির অফিসসমূহে ৩৫টি স্ট্রং মোশন অ্যাক্সলেরোগ্রাফ (এসএমএ) স্থাপন করেছিল।
সারণি- ৩
এ পদ্ধতিতে ধারণকৃত ভূমিকম্পের সারাংশ তুলে ধরেছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উপাত্ত সংগ্রহের পর বাংলাদেশের জন্যে পিজিএ-ভিত্তিক ক্ষয়বিধি উদ্ভাবন করা হবে।
সারণি- ৩
কেইস স্টাডি
১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৭ সালের ভেতর বাংলাদেশে যথাক্রমে ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার, এই সাতটি শহরের মাইক্রোজোনেশন ম্যাপ গড়ে তোলা হয়।
সারণি- ৪
এইসব ম্যাপ গড়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত উপাত্তসমূহের সারাংশ তুলে ধরেছে।
সারণি- ৪
সাতটি শহরের সারাংশ
প্রসঙ্গ ভূমিকম্প: ভবনের উচ্চতা ও সঠিক প্রযুক্তি :বাসস্থান প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি। তবে বাসস্থান কেবল ইট, সিমেন্ট, বালির একটি কাঠামো নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অসংখ্য স্মৃতি। একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাসস্থান প্রত্যেক মানুষেরই আকাঙ্খা। তবে নগরায়ণের তীব্র স্রোতে খোলামেলা জমিতে নিজের একটি বাড়ি এমন একটি স্বপ্ন হয়তো ঢাকার মতো দ্রুতবর্ধনশীল শহরে একটু বেশিই হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে বর্তমান ঢাকার এ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতিতে রাস্তার জন্য জায়গা না ছেড়ে গায়ে-গা ঘেঁষে গড়ে-ওঠা বহুতল ইমারতের যে দমবন্ধ-করা চিত্র দেখা যায় তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ কেবল অপরিকল্পিত নগরায়ণেরই প্রতিচ্ছবি।
বেশ কয়েক বছর হল ঢাকা শহর একটি মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, টোকিও বা নিউইয়র্ক মেগাসিটির মতো পরিকল্পিতভাবে এই শহরটি গড়ে ওঠেনি। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে উদ্ভুত বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত আজ সমস্ত ঢাকা শহর। অপর্যাপ্ত আবাসন, ক্রমনিম্নগামী ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বিপর্যস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ব্যাপক দূষণ এবং দুঃসহ ট্রাফিক জ্যাম-দীর্ঘদিন এসবের ভিতর থেকে ঢাকাবাসী যেন নগরায়ণের ফলে গড়ে-ওঠা ইমারত একদিকে যেমন ঢাকাকে কংক্রিটের বস্তিতে পরিণত করেছে এবং এতে বসবাসকারীদের আলো, বাতাসবিহীন এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য করছে তেমনি অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট পুরো শহরকে এক ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এসব অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট কোথাও কোথাও এতটাই সরু যে গাড়ি তো দূরের কথা রিক্সা চলাচলের উপযোগীও নয়। ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিস-এর গাড়ি এসব রাস্তায় প্রবেশের জন্য একেবারেই অনুপযোগী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
অপরদিকে দুর্ঘটনাজনিত কারণে ধসে-পড়া কোনো ইমারত-এর ধ্বংসাবশেষ সরানো এবং উদ্ধার তৎপরতায় আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের কারিগরি জ্ঞান, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কতটা পুরাতন এবং অপ্রতুল তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি স্পেকট্রা গার্মেন্টস ও ফিনিক্স ভবন ধসে পড়া-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার সময়। এমনকি সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা সত্ত্বেও উদ্ধারকাজ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ধীর এবং অকার্যকর। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে বহুতল ইমারতের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পজনিত একটা ভীতি কাজ করে। কিন্তু বহুতল ভবনে ভূমিকম্পজনিত নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যেত তবে চীন, জাপান, হংকংসহ পশ্চিমের যেসব দেশ তীব্র ভূমিকম্প অথবা সাইক্লোন এলাকার অন্তর্গত সেইসব দেশে ৭০/৮০ তলা বা তার চাইতেও উঁচু গড়ে উঠত না। গত কয়েক বছর যাবৎ ভূমিকম্প নিয়ে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গবেষণা এবং লেখালেখি হচ্ছে। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি। এছাড়াও বুয়েট এবং অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকম্প-বিষয়ক গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি সেমিনার আয়োজন করছে। একজন পুরকৌশলী এবং স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার হিসাবে আমার ৩১ বছরের নির্মাণশিল্পে অভিজ্ঞতার আলোকে আমি যা বুঝেছি তা হল যথাযথ কম্পিউটার সফ্টওয়্যার-এর সাহায্যে লোড এনালাইসিস, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ভূমিকম্প সম্পর্কিত রিইনফোর্সমেন্ট ডিটেইলিং এবং সর্বোপরি দক্ষ ও যোগ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিষয়গুলোর যে কোনো একটিতে ভবনের ভূমিকম্পজনিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। উল্লেখিত বিষয়গুলোর যে কোনো একটিতে ত্রুটি সমগ্র ভবনের জন্য বিপদজনক হতে পারে। তাই বিল্ডিং এর উচ্চতা নিয়ে অমূলক ভয় না পেয়ে বরং কিভাবে বিল্ডিং এর ডিজাইন এবং নির্মাণকাজ সঠিক মানসম্পন্ন করা যায় সেদিকে প্রকৌশলীসহ নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দেয়া উচিত। মনে রাখা দরকার বহুতল ইমারত এখন সময়ের চাহিদা।
সঠিকভাবে এনালাইসিসের পর প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ডিজাইন এবং তার ডিটেইলিং হওয়া দরকার। ডিজাইন এবং ডিটেইলিং এর মূল লক্ষ্য হবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যতটুকু সম্ভব অর্থের সাশ্রয়। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ