শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

আদর্শ শিক্ষক অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী আব্দুর রশীদ

জিয়া হাবীব আহ্সান : ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী আব্দুল রশীদ স্যারের নাম সর্বজন বিদিত। তাঁর মতো এমন সৎ, সাহসী, যোগ্য কৃতী শিক্ষক ও প্রশাসক খুবই বিরল। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে ও পরিচালনায় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এক সুন্দর পরিবেশে জ্ঞানের আলো অবগাহনে ও আদানপ্রদানে কৃতার্থ হন। স্যারের নাম শুনলে এখনো শ্রদ্ধায় চিত্ত অবনত হয়। ফিসিক্স এর শিক্ষক হলেও কলেজের দক্ষ প্রশাসক হিসাবে সকল বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা তাঁর নীতি আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের সাথে সু-পরিচিত ছিলেন। ক্ষণজন্মা আদর্শ শিক্ষক প্রফেসর কাজী আব্দুর রশীদ স্যার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩০ সালে মুর্শিদাবাদের শমশেরগঞ্জ গ্রামে (পোস্ট অফিস-  ধুলীয়ান, জঙ্গীপুর)। পিতা কাজী আজাহার আলী, (ব্যবসায়ী) মাতা-পাঞ্চী বেগম। শৈশবে পিতৃহারা হন কাজী আব্দুর রশীদ। এই অবস্থায় তিনি ১৯৪৫ সালে জঙ্গীপুর মহকুমার অন্তর্গত কাঞ্চনতরা এজ ডি কে ইনস্টিটিউশন এ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজশাহী কলেজ হতে ইন্টারমেডিয়েট পাস করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে রাজশাহী কলেজ হতে বিএসসি অনার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে এমএসসি সম্পন্ন করেন। পাস করার পর সিএসপি ক্যাডার হিসেবে রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এরপর ৮ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে চিটাগাং কলেজে (চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ) লেকচারার পদে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে ১০০ দিনের জন্য সিলেট এম সি কলেজে ছিলেন। ১৯৭১ সালে পুনরায় চিটাগাং কলেজে ফিরে আসেন।
১৯৭৮ সালে মে মাসের ৩ তারিখে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সরকারি কলেজ হিসেবে প্রথম অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ২ বছরের জন্য সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে পুনরায় চিটাগাং কলেজে যোগদান করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন অত্যন্ত সুনামের সাথে শেষ করে তিনি ১ অক্টোবর ১৯৮৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে সাবেক মন্ত্রী ডাক্তার আফসারুল আমিনের বারংবার অনুরোধে হালিশহরে তাঁর মা-বাবার নামে ডা. ফজলুল হাজেরা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ ১৪ বছর কাজ করার পর সরকার বদল হলে অত্যন্ত দুঃখের সাথে তাঁকে নিয়মের বাইরে বিদায় নিতে হয়। তার বর্ণাঢ্য শিক্ষকতাজীবনের সাফল্য এখানে লিখে শেষ করা যাবে না। এদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি তাঁর ৫০ বছরের কর্মজীবনে (১৯৫৩-২০০২) দীর্ঘ ৩০ বছর শিক্ষকতা ও ২০ বছর প্রশাসনে কাটিয়েছেন। তিনি হালিশহর কলেজে বেতন নেননি যেহেতু তখন অবসর ভাতা চালু ছিল; তবে মিস ফান্ড থেকে তাকে সম্মানী দেওয়া হত। সিটি কলেজের নৈশ- বিভাগের ৩ বছরের টাকা নাকি এখনো বাকি। চট্টগ্রাম কলেজ বার্ষিকী অন্বেষা’য় চট্টগ্রাম কলেজ ইতিহাসের কিছু কথায় শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ অধ্যাপক অর্ধেন্দু বিকাশ রুদ্র বলেন: প্রফেসর কাজী আব্দুর রশীদ এই কলেজের অধ্যক্ষের পদগ্রহণ করার পূর্বে তাঁর কর্ম জীবনের দীর্ঘকাল এই কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। এই কলেজের উন্নয়নের নানা কর্মকা-ে তাঁরও অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কার্যকালে তাঁর বিচক্ষণ পরিচালনায় কলেজে শিক্ষাগত পরিবেশ যথেষ্ট উন্নত হয়। কলেজের শিক্ষাগত ও সু-শৃঙ্খল পরিবেশ বিবেচনায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১লা এপ্রিল ১৯৮৭ ইং তারিখে প্রথম বারের মত দেশের শ্রেষ্ঠ কলেজ রূপে চট্টগ্রাম কলেজকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এই উপলক্ষে কলেজের পক্ষ থেকে তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী আব্দুর রশীদ স্যার সরকারের কাছ থেকে সম্মান সূচক সনদপত্র, গৌরব ট্রফি ও উপটৌকন হিসাবে একটি রঙ্গীন টেলিভিশন ও ১ সেট (৩৩টি) এন সাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকা গ্রহণ করেছেন। শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে এই স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে চট্টগ্রাম কলেজের ইতিহাসে একটি গৌরব স্মরণিকাও প্রকাশ করা হয়। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে ফিজিক্সে-এর এ ব্যক্তিত্ববান প্রফেসরকে দেখেছি অত্যন্ত মার্জিত আচরণের সজ্জন মানুষ ও প্রিয় শিক্ষক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। 
তার আপসহীন ভূমিকার জন্য ১৯৮৩ সালে নানা ষড়যন্ত্রের মুখে তাঁকে চট্টগ্রাম ছেড়ে সিরাজগঞ্জ কলেজে যেতে হয়। তখন সিরাজগঞ্জ ছিল মহকুমা। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় নেই, মেডিকেল নেই। তার সন্তানেরা কোথায় পড়বে কিছু জানা ছিলো না। তখন ছেলে মোহাম্মদ আমিনুর রহমান পরীক্ষা দেবে বিকম (অনার্স), মেয়ে দেবে এমএসসি ফাইনাল। তিনজন শিক্ষক নিয়ে একটি চক্র ছিল। তারা অনেক চক্রান্ত করেছেন কোনওটাই টেকেনি। তারা ভেবেছিলেন সিরাজগঞ্জ কলেজে কারসাজি করে পাঠালে তিনি আর চট্টগ্রাম আসতে পারবেন না। তারা শিক্ষা সচিবের কাছে সশরীরে হাজির হয়ে জানান কাজী আব্দুল রশীদকে চিটাগং কলেজে না আনার জন্য। যতটুকু জানতে পেয়েছি সম্ভবত শিক্ষা সচিব ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আল-মতি শরফুদ্দিন সাহেব। তিনি ১৯৫৮ সালে ফিজিক্সের প্রফেসর হিসেবে চিটাগাং কলেজে ছিলেন। ডিপিআই ছিলেন ফেরদৌস খান, তিনিও উক্ত কলেজে ১৯৫১ সালের পূর্বে ফিজিক্সের শিক্ষক। অতএব তাদের কুচক্রান্ত সৎ নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমী সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী আব্দুর রশীদ স্যারকে বিপদে ফেলতে পারেনি। কোনও ষড়যন্ত্র স্যারের কাছে টিকে নেই। তারা জানতেন না কাজী আব্দুল রশীদ সাহেবের আত্মীয়-স্বজন ঢাকায় বসবাস করেন। তখন ছিল এরশাদ শাহীর আমল, মার্শাল ল থাকায় জেডএমএলএ ছিল বিগ্রেডিয়ার রুহুল আলম। তিনিও ছিলেন চিটাগাং কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। কাজী আব্দুল রশীদ স্যার এর কিছু ছাত্র এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতেন। বন্ধু মহলে আলাপকালে ব্রিগেডিয়ার রুহুল আলমের কর্ণগোচর হয়। তখন ব্রিগেডিয়ার আলম শিক্ষা সচিবকে ফোন করে স্যারের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ ও আপত্তি জানান এবং অনতিবিলম্বে সিরাজগঞ্জ থেকে তাঁকে চট্টগ্রাম আনার কথা বলেন। তারপর ২/৩ দিনের মধ্যে চিটাগাং কলেজের জন্য তাঁর বদলী অর্ডার হয় এবং ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে সেখানে জয়েন করে, বাকি আড়াই অধ্যক্ষ হিসাবে কাটিয়ে ১৯৮৭ এর ১ লা অক্টোবরে অবসরে যান। তারপরও মন্ত্রী দিয়ে চক্রান্তকারীরা আপোসহীন এ মানুষটিকে কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তাঁরা সফল হয়নি। সেদিন দেখলাম কলেজ ম্যাগাজিনে এক ছাত্র পরীক্ষার ফল ভাল হওয়ায় স্মৃতিচারণ করেছে। শ্রদ্ধেয় আব্দুর রশীদ স্যারের কথা খুবই মনে পড়ছে। অত্যন্ত গুরু গম্ভীর এবং প্রচন্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি পদার্থবিদ্যার এই অধ্যক্ষ কঠোর নিয়ম শৃংখলা মধ্যে শিক্ষা দান করতেন। রশীদ স্যারের ৫০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কে এত সহজে লিখা শেষ করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে তিনি অত্যন্ত সজ্জন, সৎ ও মহৎপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর শ্বশুর নারায়ণগঞ্জের ১নং মজিদখানপুরের বাসিন্দা জনাব দরবার আলী একজন সরকারি প্রকৌশলী ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী মিসেস আম্বিয়া রশীদও ১৯৫১ সালের চট্টগ্রাম কলেজ হতে গ্র্যাজুয়েশান করেন।
১৯৫৩ সালে কাজী আব্দুর রশীদ সংসার জীবন শুরু করেন। তাঁদের একমাত্র পুত্রসন্তান মোহাম্মদ আমিনুর রহমান একজন বিশিষ্ট ব্যাংকার ও সমাজসেবক। ব্যাংকিং সেক্টরে তাঁর প্রভূত সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। বর্তমানে তিনি আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিঃ এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আগ্রবাদ শাখার শাখা প্রধানের দায়িত্বরত আছেন। মরহুম কাজী আব্দুর রশীদ স্যারের ৩ কন্যা সন্তানের সকলেই উচ্চশিক্ষিত এবং তারা সামাজিকভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রফেসর কাজী আব্দুর রশীদ স্যার সারাটি জীবন কঠোর শ্রম, সাধনা ও ন্যায়নীতির সাথে জীবনযাপন করেন। কখনো অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। তিনি ২০০৬ এর ১৪ই জুলাই ৮০ বছর বয়সে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সত্যের প্রতি তিনি অবিচল থেকে পৃথিবী থেকে চলে গেলেও আদর্শ শিক্ষকের নামের তালিকায় স্মৃতিতে স্মরণে তাঁর নাম দেদীপ্যমান হয়ে থাকবে। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁর ছাত্র ও সহকর্মীরা এখনও তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। পরম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন এ মহৎপ্রাণ মানুষটিকে জান্নাতুল ফেরদৌসে দাখিল করেন। আমীন।  
লেখক আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ