শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

রোহিঙ্গা সংকট ও আমাদের করণীয়

মোঃ আমান উল্লাহ্ : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এক সময় (দু’ শতাধিক বৎসরেরও পূর্বে) আরাকান নামের এক স্বাধীন রাজ্য ছিল। পরবর্তীতে বার্মার রাজা পেশী শক্তির বলে তা করায়ত্ত করে। যা হোক, মিয়ানমারের সেই রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সে দেশের সেনাবাহিনী যে নৃশংস ও নির্মম নির্যাতন তথা নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে তা শুধু মুসলমানদেরকেই নয় বরং দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বর্তমান বিশ্ব সভ্যতাকে আহত করেছে। জঙ্গী বিরোধী অভিযানের নাম করে সেনাবাহিনী যে অমানবিক অত্যাচার-অবিচার অব্যাহত রেখেছে তা কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যের বিষয় হলো মিয়ানমারের যে নেত্রী (অং সান সুচী) গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে নোবেল পুরষ্কার পেলেন তিনি আজ অদ্ভুত নীরব ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর পরিচালিত নির্বিচার গণহত্যা ও নির্যাতনের ব্যাপারে কানে তুলো আর মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন। ইতোমধ্যে তার প্রাপ্ত নোবেল পুরষ্কার বাতিল কিংবা ফেরত নেয়ার দাবী উঠেছে। এ দাবী বাস্তবতার আলোকে যুক্তিসঙ্গত, নৈতিকতার নিরীখে সঠিক। সুচী’র এ নিরবতা মুলত: তার ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাবেরই বহি:প্রকাশ। অবশ্য তার ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাবের দৃষ্টান্ত পূর্বেও প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে।
মিয়ানমার একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশ। বৌদ্ধ ধর্মের মূলকথা হিসেবে অহিংসা পরম ধর্ম, জীবহত্যা মহাপাপ- এই নীতিকথাগুলি আমরা অবগত আছি। তবে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এই নীতিকথাগুলি যেন উল্টে গিয়েছে। তাদের মাঝে হিংসার অনল যেন পরম ধর্ম হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে। আর জীব হত্যা মহাপাপ হলেও রোহিঙ্গা মুসলিম জনসাধারণকে আগুনে পুড়িয়ে, কাউকে কুপিয়ে আবার কাউকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে। প্রশ্ন জাগে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী কি জীবের সংজ্ঞায় পড়ে না? এরই নাম বুঝি অহিংসা পরম ধর্ম? এ প্রেক্ষিতে আমি বলব- আমাদের দেশে যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আছেন তাদেরও নৈতিক দায় রয়েছে এমন অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর। এমনিতে আমাদের দেশের সুশীল সমাজ, বামপন্থীগণ এবং মিডিয়া জগতের হর্তাকর্তাগণ মানবতা বিরোধী অপরাধের কথা বলে গলা ফাটিয়ে আওয়াজ তোলেন। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদেরকে আদৌ সজাগ ও তৎপর দেখা যাচ্ছে না কেন? কোথায় আজ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ফেরীওয়ালাগণ? বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহ মুষ্টিমেয় ইসলামপন্থী দল ব্যতিরেকে ডান বাম কোন দলেরই এ ব্যাপারে কোন সাড়া শব্দ নেই। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের দালাল কিছু বুদ্ধিজীবীগণ বলে বেড়াচ্ছেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিলে তাদের সাথে জঙ্গীরা একাকার হয়ে যাবে। তারা সরকারের মধ্যে এক ভীষণ জঙ্গীভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে আমি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকীর একটি লেখা থেকে কিছু উল্লেখ করবো। গত ১৩ ডিসেম্বর দৈনিক প্রতিদিনের উপ-সম্পাদকীয়তে তিনি এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সনে ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। তদুপরি ভারত আমাদের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী অনেক রাজ্যের জনসংখ্যার চেয়ে আমাদের শরণার্থী সংখ্যা বেশী ছিল।
রোহিঙ্গাদের অনেকেই আমাদের দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে গিয়ে থাকেন। তাদের দ্বারা আমাদের ভাবমূর্তি নাকি ক্ষুন্ন হয়। এ প্রসঙ্গে জনাব সিদ্দীকী বলেন, ১৯৭১ সনের যুদ্ধকালে ভারতের পাসপোর্ট ব্যবহার করে আমাদের দেশের যথেষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। সেটা তো কোন দোষের ছিল না। তিনি আরো বলেছেন, এ দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মুসলমানগণ যদি রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে খাওয়াতে পারে তাহলে দেশের সরকার কেন এসব ভুখা-নাঙ্গা মানুষদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবে না?
জনাব সিদ্দীকীর সাথে কন্ঠ মিলিয়ে আমরা বলতে চাই- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন। অনেক পুরষ্কারে ভুষিত হয়েছেন। অনেক বিষয় নিয়ে আপনি বিশ্ব দরবারে মডেল পেশ করেছেন। এবার নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাঁচার লড়াইয়ে আপনি একটুখানি কৃতিত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে দেখান যে- আপনি পারেন। যেমন, মালেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নাজিব রাজ্জাক গোটা পৃথিবীতে একটি নজীর স্থাপন করেছেন। তার দেশে লক্ষ জনতাকে নিয়ে তিনি সমাবেশ করেছেন। তার এই সময়োচিত সাহসী ভুমিকার জন্য সকল ভুল-ত্রুটি ঢাকা পড়ে গিয়ে তিনি পৌঁছে যাবেন এক অনন্য উচ্চতায়।
রোহিঙ্গা জনসাধারণ নির্যাতনের মুখে আজ ভিটে-মাটি হারা। তাদের জন্য পালিয়ে আশ্রয় নেয়ার জায়গাটুকুও নেই। এ প্রেক্ষিতে আমরা লক্ষ্য করছি- আমাদের দেশের যে বিজিবি ফেলানীর লাশ কাঁটা তারে ঝুলতে দেখার পরও কিছুই করতে পারে নি তারা এবং কোস্টগার্ড মিলে আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের নৌকা প্রতিদিন সমুদ্রে ফিরিয়ে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা ভাইদের জন্য তাদের মনে সামান্যতম দাগ কাটছে না। আমাদের ফেলানীর কথা একটি বার মনে করে হলেও তারা রোহিঙ্গাদেরকে একটু আশ্রয় দিতে পারে। যা হোক, এ প্রেক্ষিতে আমরা আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষভাবে আবেদন রাখব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাহায্যের প্রয়োজনে আপনি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে আর্থিক সাহায্য প্রদানের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। আমরা একান্তভাবে বিশ্বাস করি এ ব্যাপারে দেশের মানুষ অভুতপূর্ব সাড়া দেবেন।
পৃথিবীতে জাতিসংঘ নামে একটি সংস্থা রয়েছে। নির্যাতিত মুসলমানদের ব্যাপারে তাদের যেন কোন দায়-দায়িত্বই নেই, কোন করণীয়ও নেই। তবে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান একটি কমিশন গঠনপূর্বক মিয়ানমার পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসেছিলেন। তবে আমরা মনে করি জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিবকেই এই পরিদর্শনে আসা উচিত ছিল। যদিও কফি আনানের আগমণে মিয়ানমার সরকারকে বেশ অসন্তুষ্ট বলেই মনে হয়েছে। আমরা মনে করি মিয়ানমারে প্রয়োজনে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষীবাহিনী নিয়োজিত করা যেতে পারে। জাতিসংঘ পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার ব্যাপারে যেরূপ ভুমিকা রেখেছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাপারে সেইরূপ ভূমিকা রাখা কর্তব্য ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো কাশ্মীর, মিন্দানাও, বসনিয়া যেখানেই মুসলিমদের আধিক্য সেখানেই জাতিসংঘ সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে জাতিসংঘ তার নিরপেক্ষতা এমনকি মানবিক মূল্যবোধটুকো ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর শুধু জাতিসংঘকে দোষ দিয়ে কী লাভ? ইসলামী দেশগুলোর সংস্থা ওআইসি একটি বিবৃতি দিতে পর্যন্ত কুন্ঠা বোধ করে। এরূপ অকর্মণ্য সংস্থা থাকার চেয়ে না থাকাই ঢের ভালো। আমরা জানি, কুরআনুল কারীমে বিধৃত হয়েছে, নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরষ্পর ভাই ভাই। রাসূল (সা.) এর হাদীসে বিঘোষিত হয়েছে- এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কুরআন ও হাদীস যদি আমাদের জন্য সত্য ও অনুসরণীয় বিষয় হয়ে থাকে তাহলে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাহায্যে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে কোন কিছু কি আমাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? রোহিঙ্গা জনসাধারণ আজ খাদ্য, বস্ত্র আর বাসস্থানের অভাবে হাহাকার করছে। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবারো বলতে চাই, রোহিঙ্গাগণ নির্যাতিত মুসলিম। তারা আমাদের ভাই। তাদেরকে সহযেগিতাদানের কার্যসূচী শুরু করুন। গোটা বিশ্বের মুসলমানদের নিকট নজীর স্থাপন করুন। দেখিয়ে দিন এক মুসলমান আরেক মুসলমানের জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। এই মুহূর্তে এটাই হওয়া উচিৎ আপনার সরকারের মুখ্য করণীয়।
আমার আলোচ্য লেখার প্রতিপাদ্য মূলত: আমাদের করণীয় সম্পর্কে। তবে এ ব্যাপারে শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এটা আমাদের সার্বজনীন দায়িত্ব। যেমন, এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি এবং সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে যথেষ্ট ভুমিকা রাখতে পারে। জনসাধারণেরও চোখ-কান খোলা রেখে চলা উচিৎ এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করা উচিৎ। মানবাধিকার সংরক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোর আরো সোচ্চার ভুমিকা থাকা উচিৎ। সকল ধর্মের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করা উচিৎ। আমাদের মিডিয়া জগত যথেষ্ট প্রভাবশালী। কিন্তু নির্যাতিত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে না পারলে এই প্রভাবের কি কোন কানাকড়ি মূল্য রয়েছে? দেশের উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে আরো গঠনমূলক ও কার্যকরী ভুমিকা আমাদের প্রত্যাশিত ছিল। উপরোক্ত উপায়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ তার করণীয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারে।
তবে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আরো নির্দিষ্ট করে কিছু কথা বলা যায়। বর্তমান সময়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রধানত দরকার অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অন্নহীন ও ছন্ন ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী ও ঔষধ সামগ্রীর ব্যবস্থা করা আশু প্রয়োজন। আমরা জানতে পেরেছি মিয়ানমার সরকারী বাহিনী রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতেও বধা সাধছে। আমাদের দেশের সরকার প্রধানসহ সকল মুসলিম দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের উচিৎ জোর কুটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে মিয়ানমার সরকারকে নির্যাতন বন্ধ করতে এবং রোহিঙ্গাদেরকে তাদের আবাসভুমিতে নিরাপত্তার সাথে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা। বিশ্বব্যাপী নৈতিক সমর্থন তৈরী করতে পারলে মুক্তিকামী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে একটি শান্তিপূর্ণ উপায় অবশ্যই বের হয়ে আসবে।
পরিশেষে বলব, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমাদের জন্য সংকট হিসেবে গণ্য করা মোটেই মানবিক হবে না। বরং মুসলিম প্রতিবেশী হিসেবে গণ্য করে তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে আমরা যদি আমাদের করণীয় কার্য সম্পাদন না করি তাহলে তা হবে আমাদের ঈমানী দায়িত্বের চরম অবহেলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ