বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

লুই কানের নকশা ও আমাদের গন্তব্য

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : জাতীয় সংসদের নয়নাভিরাম স্থাপনা এবং এর নকশাকার বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। টেনে-হেঁচড়ে বিষয়টি সরকারই আলোচনার পাদপীঠে এনেছে। সরকারের বক্তব্য হলো, জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সের মধ্যে স্থপতি লুই কানের নকশা বহির্ভূত কোন স্থাপনা রাখা হবে না। কারণ, অবৈধ এসব স্থাপনা সংসদ কমপ্লেক্সের সৌন্দর্য হানি করেছে। তাই সংসদ চত্বরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতেই লুই কানের নকশা বহির্ভূত সবকিছুই অপসারণ করা হবে এবং মূল নকশায় যা ছিল পুরোপুরিই বাস্তবায়ন করে সংসদ কমপ্লেক্সকে ‘শনির আছর মুক্ত’ করা হবে। সরকারের বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা এখন বেশ তুঙ্গে। উল্লেখ্য, সংসদ চত্বরেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার কমপ্লেক্সও রয়েছে। যা লুই আই কানের নকশায় ছিল না।
শুধু তাই নয় লুই আই কানের নকশাবহির্ভূত সংসদ ভবন এলাকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরসহ বেশ কয়েকজনকে বিশিষ্ট ব্যক্তির কবর রয়েছে। নকশাবহির্ভূত বিরাট বিরাট ন্যাম ফ্ল্যাট তৈরি করে সংসদ সচিবালয়কে দেয়া হয়েছে। মূলত ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগারগাঁও শেরেবাংলা নগর এলাকায় শুরু হয় নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স। যা স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য সাধারণ।
লাল সিরামিকের ইটের দালান দিয়ে শুরু হয় জাতীয় সংসদ ভবনের অভিযাত্রা। কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে শহীদ জিয়ার মাজারসহ প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক স্থাপনা। যেসব স্থাপনার কথা স্থপতি লুই কানের মূল নকশায় ছিল না। সরকার পক্ষ দাবি করছে, সংসদ কমপ্লেক্সে নকশাবহির্ভূত যেসব স্থাপনা স্থাপিত হয়েছে তার সবগুলোই অবৈধ স্থাপনা। তাই এই স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করেই সংসদকে কলঙ্কমুক্ত করা হবে। অবশ্য সরকারের দাবি মতে এর আগেই জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হয়েছে। এখন শুধু ধোয়া-মোছার কাজ চলছে।
তাই সঙ্গত কারণেই অপসারণ প্রকল্প থেকে মাজার কমপ্লেক্সও বাদ যাচ্ছে বলে মনে হয় না। আবার কেউ বলছেন, লুই কানের ‘কান’ নিয়ে টানা-হেঁচড়ার আসল উদ্দেশ্যই হলো শহীদ জিয়ার কবর অপসারণ। আর সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কথাবার্তায় এমনটা মনে করার সঙ্গত কারণও আছে বলে মনে হয়। বিএনপি’র পক্ষেও এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে বেশ জোরেশোরেই। তারা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সরকার প্রধানের হিংসাশ্রয়ী আচরণ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
মূলত লুই কানের নকশা প্রণীত হয়েছিল ষাটের দশকে। আর জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। তাই নকশা প্রণয়নের বিষয়টি পাঁচ দশকের পুরনো। তাই সংসদ ভবনের সৌন্দর্য রক্ষায় লুই কানের নকশা বাস্তবায়নের যে ‘আষাঢ়ে গল্প’ শোনানো হচেছ, যুক্তির মানদ-ে তা কোনভাবেই প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। কারণ, বিগত পঞ্চাশ বছরে মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, স্থাপত্য-প্রকৌশল, বোধ-বিশ্বাস, সৌন্দর্য-রুচিবোধ অনেকটাই পাল্টে গেছে। সবকিছুতেই আধুনিকতা ও গতিশীলতার ছোঁয়া গেলেছে। অতীতের সবকিছুই এখন সেকেলে হিসাবে আখ্যা পাচ্ছে। অতীতকে পেছনে নতুনকে বরণ করায় যখন কর্তব্য হয়ে দেখা দিয়েছে তখন আমাদের এই পশ্চাদপদতা বেদনাদায়ক না বলে কোন উপায় থাকে না। আর এতে কোন কল্যাণ আছে বলেও মনে হয় না।
পালের হাওয়ায় রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রেই পুরনো দিনের অবকাঠামোগুলোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সময়ের সাথে খাপ খাওয়াতে এসেছে অনেক পরিবর্তন। পাঁচ দশক আগে বিশ্ব অবয়ব যেমন ছিল তেমনটা তো এখন আর নেই। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু আমাদের জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স। এই কমপ্লেক্সকে সেই সনাতনী অবয়বেই রাখার জন্য সরকার আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে। মূলত জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সের সৌন্দর্য অটুট রাখতে পাঁচ দশক আগে প্রণীত নকশা পুনঃস্থাপন কেন জরুরি হয়ে পড়লো তা মোটেই বোধগম্য নয়। বরং এই জাতীয় স্থাপনাকে অধিকতর নয়নাভিরাম করার জন্য তো সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন নকশা প্রণয়নের মাধ্যম সর্বাধুনিক স্থাপত্যশৈলী সংযোজিত হওয়া দরকার। কিন্তু তা না করে উল্টোপথে হাাঁ শুধু দুঃখজনকই নয় বরং অনভিপ্রেত বলা যায়।
নকশা কোন ঐশী প্রত্যাদেশ নয় যে তা কোনভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। মাত্র চার দশকেই তো আমাদের দেশের সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়েছে। তা আবার সময়ের প্রয়োজনেই এবং গণমানুষের কল্যাণেই। মূলত ষাটের দশকে লুই কান সংসদ ভবনের নকশা প্রণয়ন করার আগে সংসদ এলাকার একটা নকশা তো ছিলই। লুই কান সে নকশার পরিবর্তন করেই নতুন নকশা প্রণয়ন করেছেন। এখন যদি কেউ দাবি করে যে, লুই কান আগের নকশাকে বিকৃত করে নতুন নকশা ও স্থাপনার মাধ্যমে শেরেবাংলা নগরের অতীতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করেছেন, তাহলে তো সংসদ ভবনই অপসারণ করার দাবি উঠতে পারে। কিন্তু সরকার বোধহয় বুদ্ধিবৃত্তির আশ্রয় না নিয়ে অনেকটা আবেগতাড়িত হয়ে এবং রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কারণেই পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। এর সাথে জাতীয় স্বার্থের কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।
আমাদের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররামের নকশা প্রণয়ন করেছিলেন প্রখ্যাত স্থপতি আবুল হোসেন থারিয়ানী। কিন্তু মি. থারিয়ানীর মূল নকশার উপর কি জাতীয় মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে? সংস্কার কাজ তো প্রতিনিয়তই চলছে। মূল নকশার দক্ষিণ গেইটের নয়নাভিরাম পানির ফোয়ারা ও লেক আর শোভা পায় না। সেখানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করে জাতীয় মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়ানো হয়েছে। যমুনা সেতুর মূল নকশায় তো রেলসেতু ছিল না। কিন্তু জাতীয় স্বার্থেই যমুনা সেতুতে নকশাবহির্ভূতভাবে রেলসেতু সংযুক্ত করা হয়েছে। এখন যমুনা সেতুকে মুল নকশায় ফিরিয়ে আনতে হলে রেলসেতু অপসারণ করতে হবে। শুধু বাংলাদেশ কেন বিশ্বের প্রায় সকল স্থাপনায় বোধহয় সনাতনী অবকাঠামোই নেই। তাই মূল নকশার কথা বলে যা করা হচ্ছে তা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশাকার ছিলেন স্থপতি মইনুল হোসেন। কিন্তু স্মৃতিসৌধ এখন মূল নকশার উপর নেই। পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও সংস্কার হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। সে ধারা এখনও অব্যাহত আছে। আর এটি চলমান প্রক্রিয়া। সকল ক্ষেত্রেই পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কেউ এসব স্থাপনাকে মূল নকশার দিকে ফিরিয়ে আনার দাবি তোলেনি। আর তা যৌক্তিকও নয় বরং পশ্চাদমুখিতারই নামান্তর।
পশ্চাদমুখিতাই আমাদের দেশ ও জাতিসত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। পুরো বিশ্বই যখন সামনের দিকে এগিয়ে চলছে, তখন আমাদের উল্টোপথে পদচারণা সত্যিই দুর্ভাবনার। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সকল জাতি-রাষ্ট্রে দুর্বার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনও আমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শনে ব্যস্ত। কথায় আছে, ভূতের পা নাকি উল্টো দিকে। তারা কখনো সামনের দিকে চলতে পারে না। আমরাও বোধহয় সেই অশরীরী ভূতের মতই সামনের দিকে চলতে ভুলে গেছি। সৃজনশীলতার পরিবর্তে ধ্বংসশীলতাকেই নিজেদের ধ্যান-জ্ঞান বানিয়েছি। বিশ্বের অপরাপর জাতি যখন উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করছে, তখন জাতি হিসাবে আমাদের এই পশ্চাদপদতা নিঃসন্দেহে আতঙ্কের। কিন্তু আমরা এ বৃত্ত থেকে সহসাই বেরিয়ে আসতে পারবো এমন কোন সুলক্ষণ অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের রাজনীতি এখনো পুরোপুরি গণমুখী হয়ে উঠতে পারেনি। নেতিবাচক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি আমাদের জাতীয় জীবনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। রাজনীতি সেবামূলক কাজ হলেও এখন তা অনেকাংশেই ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করেছে। এক শ্রেণির রাজনীতিক রাজনীতিকে আত্মস্বার্থ, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থসিদ্ধির মোক্ষম হাতিয়ার বানিয়েছে। ক্ষমতাচর্চা আর স্বার্থসিদ্ধিই রাজনীতির মুখ্য বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে, তখন জনসেবার বিষয়টি হয়ে উঠেছে পুরোপুরি গৌণ। সেবার মাধ্যমে সুবিধাভোগ নয় বরং স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে যতখানি সেবা দেয়া সম্ভব জনগণ কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু পাচ্ছে না।
ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও স্বার্থসিদ্ধির অপরাজনীতি অতীতে কখনো সুফল বয়ে আনেনি, এখনো আনছে না; আর ভবিষ্যতটা আরও বেশি অন্ধকার বলেই মনে হয়। আমরা মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র মহাসমরের কথা শুনেছি। এই মহাসমর সংঘটিত হয়েছিল অতি নিকটাত্মীয় কৌরব ও পা-ব পক্ষের মধ্যে। আর ক্ষমতার প্রভাব বলয় বিস্তারই ছিল মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই মহাসমর। যা পৌরাণিক কাহিনী হিসাবে মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।
যুদ্ধের ভয়াবহতা এমনই নির্মম ছিল যে, যুদ্ধ শেষে পঞ্চ পা-বের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ছিলেন। যে ক্ষমতার জন্য এই প্রাণঘাতী মহাসমর যুদ্ধ শেষে সে ক্ষমতা প্রয়োগের কোন জায়গা বা উপলক্ষ অবশিষ্ট রইলো না। একমাত্র জীবিত ব্যক্তি হিমালয়ের গাত্র ধরে সশরীরে স্বর্গারোহণ করলেন। স্বর্গই যদি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের গন্তব্য হবে তবে মর্ত্যলোকের ক্ষমতার জন্য এই আত্মঘাতী ও প্রাণঘাতী লড়াইয়ের যৌক্তিকতা কোথায়?
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরা ক্রমেই সেই মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র মহাসমরের দিকেই অগ্রসর হচ্ছি। সবকিছুতেই সংহারী ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও স্বার্থান্ধ রাজনীতি আমাদেরকে এমনভাবে আছন্ন করে ফেলেছে যে আমরা সে বৃত্ত থেকে কোনভাবেই বেেিয় আসতে পারছি না। বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা আমাদের জাতিসত্তাকে ক্রমেই হীনবল করে ফেলছে। জানা গেছে, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার সৌন্দর্য বহাল রাখতে মূল নকশায় নেই এমন স্থাপনা সরিয়ে ফেলতে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাতীয় সংসদের মূল নকশা সংগ্রহ করেছে সরকার।
বিশ্ববিখ্যাত আর্কিটেক্ট লুই আই কানের তৈরি করা জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশাগুলো গত ১ ডিসেম্বর পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। এই মূল নকশাবহির্ভূত আওয়ামী লীগ সরকারই কোটি কোটি টাকা খরচ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভবন নির্মাণ করলেও লুই কানের নকশা বাস্তবায়ন করলে আরো কোটি কোটি টাকা খরচ করে এগুলো ভাঙতে হবে। তবে মূল নকশাবহির্ভূত স্থাপনা অপসারণের নামে সরকারের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে মাজার কমপ্লেক্স এখান থেকে উচ্ছেদ করা এমনটিই আশঙ্কা করছেন অনেকেই। সরকার নিশ্চিত করে কিছু না বললে হাবভাব দেখে তেমনটিই মনে হচ্ছে।
পাকিস্তান আমলে জাতীয় সংসদে স্পিকার শাহেদ আলী হত্যাকা-ের পর একটি আধুনিক জাতীয় পরিষদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রেডিডেন্ট আইয়ুব খানের উদ্যোগে বিশ্বখ্যাত আর্কিটেক্ট লুই আই কানের করা নকশার আলোকে ১৯৬১ সালে জাতীয় সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। মূলত লুই আই কানের মূল নকশার প্রথম ধাপ ছিল ২০৮ একর জায়গার ওপর জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ। যার সামনে ও পেছনে থাকবে বিস্তৃর্ণ সবুজ খোলা মাঠ। চারদিকে আট লেনের সড়ক ও মাঝখানে লেক।
দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ। এছাড়া বাকি জায়গায় সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতালসহ প্রশাসনিক এবং সাংস্কৃতিক বলয়। ১৯৭৪ সালে লুই আইকান যখন মূল নকশাটি করেন তখন ২৭টি মন্ত্রণালয়ের জন্য এ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেসব নকশায় মসজিদ ছিল, মাঝে বাগান ছিল, চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনে লেক ছিল, এরপর সংসদ ভবন ছিল। ২০৮ একর জায়গার ওপর জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের নকশা করা হয় প্রথম ধাপে। এর সামনে ও পেছনে বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ। চারদিকে আট লেনের সড়ক, মাঝখানে লেক।
দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের পরিকল্পনা করা হয়। বাকি জায়গায় সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতাল ও সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার কথা। কিন্তু নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে মধ্যবর্তী এলাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই গড়ে তোলা হয়েছে অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রকল্প। নকশা উপেক্ষা করে সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে সংসদ সদস্যের বাসভবন (ন্যাম ভবন) এবং সংসদ ভবনের চারপাশে লোহার প্রাচীর। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে কেন্দ্র করে বিরাট নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ২০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র।
জাতীয় সংসদ সংলগ্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আবাসিক এলাকা। গড়ে তোলা হয়েছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ২-এর অফিস। সংসদ ভবন চত্বরে করা হয়েছে ছোটখাটো অনেক অবৈধ স্থাপনা। সংসদ ভবনের সামনে সবচেয়ে সৌন্দর্যময় স্থান ছিল মানিক মিয়া এভিনিউ। সকাল-বিকালের বেড়ানো ও সৌন্দর্য দর্শনসহ রাজনৈতিক দলগুলো বড় সমাবেশও এখানে করত। গত আওয়ামী লীগ সরকার মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে ঢাকা নগরীর বিস্তৃত এ সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়েছে। চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার মাজারকেন্দ্রিক মনোমুগ্ধকর স্থাপনা তৈরি করা হলেও গণভবনের নিরাপত্তা বেষ্টনীর নামে লুইকানের নকশাবহির্ভূত অনেক স্থাপনা ও যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে।
শেরেবাংলা নগর এলাকায় লুই কানের ওই নকশার বাইরে লাল ইটের বদলে এখন গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। সংসদ সচিবালয়ের দাবি মতে, লুই কানের মূল নকশা না থাকার কারণে সংসদ ভবন এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম আটকে যায়। নকশাবহির্ভূত স্থাপনা অপসারণের পর সেখানে জাতীয় সংসদের লাইব্রেরি, জাদুঘর ও প্রশাসনিক সচিবালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।
এছাড়া সংসদ জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নকাজের নামে মূল নকশাবহির্ভূত স্থাপনা অপসারণ নিয়ে। ১৯৮২ সালের পর থেকে সব সরকারই লুইকানে মূল নকশাবহির্ভূত স্থাপনা করেছে। অনেক স্থাপনা সময়ের প্রয়োজনেই হয়েছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ করে এগুলো নির্মাণ আবার এখন সেগুলো অপসারণের উদ্দেশ্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত এবং কল্যাণমূলক? তাই এখন আলোচনার মূলত বিষয়।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী লুই কানের নকশা ধরে নকশাবহির্ভূত স্থাপনা অপসারণ করতে হলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন, সংসদ সদস্যের বাসভবন (ন্যাম ভবন), সংসদ ভবনের চারপাশে লোহার প্রাচীর, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে কেন্দ্র করে বিরাট নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ২০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র অপসারণ করতে হবে। একই সাথে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরসহ বেশ কয়েকজনকে বিশিষ্ট ব্যক্তির কবরও অপসারণ করতে হবে। তবে বাস্তবে এতো কিছু অপসারণ করা সম্ভব হবে কিনা বা হলে তা বাস্তবসম্মত কিনা তাও বারবার ভেবে দেখা দরকার।
তবে জনশ্রুতি সৃষ্টি হয়েছে যে, লুই কানের নকশা বাস্তবায়ন আসল কথা নয় বরং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর অপসারণই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু সরকার এ ধরনের দাবি বরাবরই অস্বীকার করছে। বাস্তবে কি হতে যাচ্ছে তা এখনও দিব্যি দিয়ে বলার সুযোগ আসেনি। তবে কারো কবর অপসারণই নকশা বাস্তবায়নের প্রধান উপজীব্য হয় তাহলে তা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকই হবে এবং দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। হিংসাত্মক রাজনীতির পরিসর বৃদ্ধি পাবে। এর প্রতিক্রিয়াও হবে দীর্ঘ মেয়াদি। আর এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের গন্তব্যও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়বে। আসলে হাতে ক্ষমতা থাকলে অনেক কিছুই করা যায়। কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে যে, আবু হোসেনের নবাবী কিন্তু কোন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। তাই দেশের মানুষ সরকারের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।
[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ